"সারপ্রাইজ গিফ্ট"


(১)

রাতের রাউন্ডটা শেষ করে ডক্টর্স রুমে গিয়ে বসে অরুষাগ্নি ৷ কিছুদিন আগেই ও এই সরকারি মেডিক্যাল কলেজ -হাসপাতালে পেডিয়াট্রিসিয়ান হিসেবে জয়েন করেছে .....সেদিক থেকে ও একান্তই নবাগত ৷ তবে এই অল্প ক'দিনেই সৌম্যকান্তি তরুণ চিকিৎসকটি সকলের কাছে বেশ পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন ৷ রূপে কার্ত্তিকেয়,গুণে ধ্বন্বন্তরির ন্যায় হলেও ওর সুমিষ্ট ব্যবহার সকলকে সবচেয়ে বেশী আকর্ষণ করে ৷ আগুণের ন্যায় প্রভাময় হয়েও যেন কোনো তেজ নেই....একেবারে সার্থকনামা!

রাত বারোটা বাজতে এখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি আছে....একটু পরেই সোশ্যাল মিডিয়াতে জন্মদিনের শুভেচ্ছার ঢেউ আছড়ে পড়বে ৷ প্রথম প্রথম এসব খুব ভালোই লাগতো ওর ....কিন্তু এখন যেন সবই নিষ্প্রাণ বলে মনে হয় ৷ সেজন্যই চুপি চুপি ডিউটি সেরে নির্জন ডক্টর্স রুমের চেয়ারটিতে এসে বসেছে নিজের মতো করেই 'বার্থ-ডে'টা পালন করবে বলে ৷ অন্ততঃ আজকের দিনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিমতা থেকে ও বেরিয়ে আসতে চায় ৷ ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ক্রমশ বীতস্পৃহ হয়ে উঠছিল ও.... ওর মনে হয়,আজকাল 'সোশ্যাল মিডিয়া' আছে তাই এতসব সম্পর্ক, এতসব শুভেচ্ছার ছড়াছড়ি.... অন্যথায় এসব কারুর মনেই থাকে না ! তাই সর্বাগ্রে ফেসবুক থেকে নিজের জন্ম তারিখটি 'পাবলিক' থেকে 'ওনলি মি' করে দিল ৷ তারপর ছোটো বড়ো মোমবাতি গুলো দিয়ে সুন্দর করে টেবিলটি সাজালো ৷ যদিও হস্পিটাল চত্বরে সচরাচর লোডশেডিং হয় না....তবুও ঝড়-বৃষ্টির রাতে কখন কি হবে বলা যায় না....তাই ক'দিন আগে বেশ কয়েকটা মোমবাতি কিনে রেখেছিল ৷ আজ ওগুলোর সদ্ব্যবহার হবে ৷ বাইরের ঝমঝম বৃষ্টি,মেঘের গুরু-গম্ভীর গর্জন,রুমের মধ্যে মোমবাতির আবছা আলো ....সব মিলিয়ে এক মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে ৷ সাতাশ বছর আগের সেই মায়াবী রাত যেন আবার ফিরে এসেছে....এমনই এক দুর্যোগের রাতই নাকি ওর প্রাণ বাঁচিয়েছিল! তখনও ওদের গ্রামে কারেণ্ট আসেনি....এরকম মোমবাতি কিংবা কেরোসিন লণ্ঠনই ছিল সেদিনের ভরসা ৷ এতবছর পর এমন একটি দিনের সত্যিই সমাপতন ঘটলো! এই স্নিগ্ধ মোমবাতির আলো মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেন তার জীবন থেকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া কাউকে ডেকে আনার জন্য আজ প্ল্যানচেট-এ বসেছে ও ৷ কখনওবা মনে হচ্ছে,এরা সেই মিছিলের মোমবাতি.....নির্ভয়াদের প্রতীক ৷ যেন ওরা মুখাগ্নির মাধ্যমে আজ মুখশুদ্ধি করছে আর গলিত মোম বমনের মাধ্যমে নিঃশব্দে সমাজের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে ৷

ধূসর স্মৃতির পাতায় কত কথাই আজ ভেসে উঠছে ....এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না! তবে কি হিজড়ার কথাটা সত্যি হলো!? লোকে বলে, হিজড়ারা যা বলে তা নাকি ফলে যায়...তাই ওদেরকে উত্যক্ত করতে নেই। কিন্তু ওর যুক্তিবাদী মন এসব গুজবে কান দেয় না। তাছাড়া ও তো কাউকে উত্যক্ত করেনি কখনও...বরং সেবার এক বৃহন্নলা অরুষাগ্নিকে আগ বাড়িয়ে দু'টো কটূকথা শুনিয়ে দিয়েছিল।

ওরা দু'জন ভিক্টোরিয়া ঘুরতে গিয়েছিলো সেবছর...রাস্তা আটকে দাঁড়ালো একদল বৃহন্নলা। মাথাপিছু একশো করে দিতে হবে! যাহোক,অরুষাগ্নির দেওয়া টাকায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি ওরা... অকস্মাৎ ধেয়ে আসলো বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এক মর্মভেদী কথা ,

"পুরোটা দিলি না তো ! ব্রেক-আপ হয়ে যাক তোদের।"


"যা ছিলো দিয়ে দিলেই তো পারতে",ছলছল চোখে বলে উঠলো অদ্রিকা।

–তারপর?বাড়ি ফিরতে না? হাতে টাকাও তো নেই বেশি।

–কিন্তু ঐ হৃদয়বিদারক কথাটা তো আর শুনতে হতো না!

–শোনো,আমাদের কোনো দোষ নেই এতে...আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দিয়েছি । তাই ওসব অভিশাপ আমাদের লাগবে না। তাছাড়া যা চাইবে তা দিতেই হবে...এমনটি কে বলেছে!

রিলেশনশিপে যাওয়ার পর ওদের এটাই ছিলো প্রথমবার একসাথে ঘুরতে যাওয়া।

তাই এসব সান্ত্বনা সত্ত্বেও এই একটা কথা পুরো দিনটা নষ্ট করতেই যথেষ্ট ছিলো।

আজ এত বছর পর হঠাৎ এই ঘটনাটা কেন মনে এলো ওর! আসলে বেশ কিছুদিন হলো ওদের সম্পর্কে একটু একটু করে যেন চিড় ধরতে শুরু করেছে!

এই তো ক'দিন আগেই যে মেয়েটা সারাক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ট্রু-কলারে ওর লাস্ট সিন চেক করতো...এখন কল তো দূর অস্ত আজ তার প্রোফাইল পিকচারটাও দেখতে পায়না অরুষাগ্নি।

অদ্রিকার আচরণের এ হেন আকস্মিক পরিবর্তনের কোনো কারণ এখনো পর্যন্ত ও খুঁজে পায়নি।

তবে কি সব প্রতিশ্রুতিই টাইম-বাউন্ড!


(২)

আজ গোলুর কথাটা খুব মনে পড়ছে।আদর করে সবাই গোলু বলে ডাকলেও ওর ভালো নাম ছিলো শান্তা....অরুষাগ্নির দেওয়া এই নামটিই অ্যাডমিশন টিকিটে ব্যবহৃত হতো। বিগত ছ'মাস ধরে যাকে না দেখে একদিনও থাকতে পারতো না ও...সেও চোখের আড়াল হয়েছে!

কয়েকদিন আগেই অন্নপ্রাশনের পর ওকে বিদায় জানিয়েছেন হস্পিটাল কর্তৃপক্ষ । ছ'মাসের বেশি কোনো illegitimate child-কে রাখার নিয়ম নেই যে এখানে! 'এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং' এর জন্য ছ'মাস এ ধরনের বাচ্চাকে দিদিমণিদের তত্ত্বাবধানে হস্পিটালের SNCU-তে রাখা হয়...তারপর একটা বিশেষ দিন দেখে কোনো হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওয়ার্ডে এরকম অনেক বাচ্চা থাকলেও গোলুর প্রতি ওর আলাদা একটা টান ছিল। ও যেদিন এই হস্পিটালে জয়েন করেছিলো, সেদিন গোলুরও আগমন ঘটেছিল এখানে। আদিবাসী রমণীরা নাকি জঙ্গলে কাঠ কুড়াতে গিয়ে নবজাত শিশুটিকে পেয়েছিল...তারপর তারা ওকে এখানে দিয়ে গিয়েছিল।

যাহোক,এসব নিষ্ঠুর ঘটনা এ যুগের আমদানি নয়...প্রাচীন ভারতের ইতিহাসেও কামোন্মত্ত যুবক-যুবতীর ক্ষণিকের কামনা জাত এমন সন্তানদের অসংখ্য উদাহরণ আছে । শকুন্তলা,কর্ণ, কৃপ,কৃপি,শান্তা,সত্যবতী এরা সকলেই ছিলেন জন্মদাতা-জন্মদাত্রী পিতা-মাতা কর্তৃক উপেক্ষিত বা উপেক্ষিতা। এই নামগুলোর মধ্যে 'শান্তা' নামটি একটু মডার্ণ টাইপের মনে হয়েছিল ওর। তাছাড়া শান্তা ছিলো রামায়ণের এক উপেক্ষিতা চরিত্র। রাজা দশরথের কন্যা তথা রামচন্দ্রের বড়ো বোন হওয়া সত্ত্বেও তিনি লালিত-পালিত হয়েছিলেন অন্যগৃহে। তাই এই উপেক্ষিতা চরিত্রের নামেই গোলুর নামকরণ করেছিল অরুষাগ্নি।

গোলুর কথাটা অদ্রিকাকে জানিয়েছিল ও... কিন্তু অদ্রিকা এ ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ দেখায়নি তখন। বরং এসব শুনে ওর ভবিষ্যত পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেছিল,"আমরা বিয়ের পর একটা অনাথ আশ্রম খুলবো। তোমার গোলুর মতো এরকম অনেক বাচ্চাকেই তখন আমরা রাখবো।" অদ্রিকার এ হেন আপ্তবাক্যে সেদিন বিশেষ খুশি হতে পারেনি ও। কাল করবো বলে কোনো কাজ ফেলে রাখলে,সেসব আর কখনোই করা হয়ে ওঠেনা..এটা ভালো করেই জানে।

এখন ও বেশ বুঝতে পারে, এই দুনিয়া মায়াময়... বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অনন্ত পথে এই পৃথিবীর পান্থশালায় ক্ষণিকের বিশ্রাম...তারপর আবার একা একাই পাড়ি দিতে হবে অনন্ত পথে। অদ্রিকা কিংবা গোলুও ছিল এমনই এক ক্ষণিকের সফরসঙ্গী! এভাবেই ধীরে ধীরে কঠিন বাস্তবকে মেনে নিতে শুরু করেছিল ও।

ছোট্টো গোলুর মধ্যেই অরুষাগ্নি খুঁজে পেয়েছিল তার জীবনের প্রথম পর্বকে। সেও এক বংশমর্যাদাহীন নিঃসন্তান দম্পতির ঘরেই পালিত হয়েছে পরম যত্নে। বড়ো হয়ে মায়ের কাছে শুনেছে,এক ঝড়বৃষ্টির রাতে নাকি সদ্য জন্মানো শিশুপূত্রটিকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন তাঁরা! এর আগে হাজার রকম মানত করেছেন, সন্তান কামনায় মাথা ঠুকেছেন মন্দিরে মন্দিরে...যে যত রকম দাওয়াই-টোটকা বলেছে, সবই প্রয়োগ করেছেন... কিন্তু কোনো কিছুতেই লাভ হয়নি। সেবার তাঁরা এক মন্দির থেকে পুজো দিয়ে ফেরার পথে ঝড়বৃষ্টির কবলে পড়ে আশ্রয় নেন এক পোড়ো বাড়িতে। সেখানেই শিশুপূত্রটিকে খুঁজে পান ঐ নিঃসন্তান দম্পতি। মন্দিরে হোমাগ্নিতে আহুতি দিয়ে দেবতাদের বার্তাবাহক অগ্নির কাছে সন্তান কামনা করেছিলেন তাঁরা। তাই তাঁদের বিশ্বাস, হয়তো ভগবান অগ্নিদেবের মাধ্যমে তাঁর প্রার্থনা শুনেছেন এবং মনের অভিলাষ পূর্ণ করেছেন। অনেক বিবেচনা করে শিশুর নাম রাখলেন 'অরুষাগ্নি'... অর্থাৎ যে আগুন রুষ্ট নয়... যে আগুন ধ্বংসাত্মক নয়... যে আগুন সকল সৃষ্টির উৎস। অগ্নি যেমন দেবতাদের মুখ বলে বিবেচিত হন, তেমনি তাঁদের বিশ্বাস ছিলো, এই শিশুই বড়ো হয়ে একদিন সমাজের মুখ হয়ে উঠবে...দেবতা জ্ঞানে মনুষ্যকূলকে প্রতিপালন করবে। যাহোক,এতদিনে তার পালক পিতা-মাতার স্বপ্ন সত্যি হয়েছে। কলেজের পর্ব শেষ করে সে একজন নামী চিকিৎসক..এক ডাকেই সকলে তাকে চেনে। তবে তার এই পরিচয়ের বাইরে সাহিত্যচর্চাতেও যথেষ্ট সুনাম আছে।


(৩)

অদ্রিকার সাথে পরিচয় কলেজে পড়াকালীন...একটু অন্যরকমভাবেই। এক ম্যাগাজিনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়েই দু'জনের প্রাথমিক পরিচয় হয়েছিল। হয়তো আলাপটা এখানেই শেষ হয়ে যেতে পারতো, কিন্তু বিধিলিপিকে খন্ডন করবে কে! সে বছর ম্যাগাজিন কমিটি প্রত্যেকের ঠিকানায় সৌজন্য-সংখ্যা ও একটি করে সৌজন্য-চিঠি পাঠিয়েছিলো... কুরিয়ারে পাঠানো পার্সেলটি খুলেই অদ্রিকার চক্ষু চড়কগাছ! এ যে "মেঘ না চাইতেই জল" ...অরুষাগ্নিকে লেখা চিঠিটি তার পার্সেলের মধ্যেই চলে এসেছে ভুল করে... নাম,ঠিকানা,ফোন নাম্বার সবই আছে। মনে মনে হয়তো এটাই চেয়েছিলো ও... কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারেনি সেদিন। যাহোক অনেক সাত-পাঁচ ভাবার পর একটু ইতস্তত করতে করতে একদিন ফোনটা করেই বসলো অদ্রিকা।

অদ্রিকা তখন কম্পিউটার সায়েন্সের ছাত্রী। পড়াশুনার পাশাপাশি লেখালেখিটা ও নেশা হিসেবেই বেছে নিয়েছিলো। তবে অরুষাগ্নির সাথে পরিচয়ের পর সাহিত্যচর্চার গতিটা আরেকটু ত্বরান্বিত হয়। একসময় ওদের রচিত কাহিনীর নায়ক-নায়িকারা নিজেদের মনের কথা বলতে শুরু করে। কোনো কোনো ম্যাগাজিনে সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতভাবেই ওদের দু'জনের লেখা পাশাপাশি ছাপা হতো। হয়তো ওদের জীবন বীণার তারে ওঠা একই সুরের ঝঙ্কার দক্ষ এডিটরের চোখ এড়িয়ে যেত না। ক্রমশ ওদের এই সম্পর্ক ঘনীভূত হতে হতে প্রেমবারি বর্ষণকারী মেঘমালায় পরিণত হয়... যা এই দুই যুবক-যুবতীর প্রণয়াঙ্কুরকে বিকশিত করে তোলে।

দু'জনেই তাদের এই সম্পর্কের কথা একসময় বাড়িতে জানিয়ে দেয়। অরুষাগ্নির বাড়ির দিক থেকে কোনো সমস্যা ছিলো না... কিন্তু বাধ সাধলো অদ্রিকার পরিবার। একদিন কথায় কথায় অদ্রিকা জিগ্যেস করে বসে,

"আচ্ছা,তোমরা কোন জাতি?"

এমন অনাকাঙ্ক্ষিত কথা অদ্রিকার মুখ থেকে শুনবে বলে কখনও আশা করেনি ও। তাই সে একধাপ এগিয়েই বললো,

"Indian.আর Religion...Hinduism,as I was brought up in a Hindu family."

–না না...আমি বলছি...

–ও আচ্ছা!Caste?...Doctor.

–না,আসলে আমার বাড়ি থেকে জানতে চাইছিলো। তুমি বলছিলে না, তোমাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন তোমার বাবা মা। আমরা Higher Caste-এর ...তাই তোমার জন্মদাতা পিতার যদি অন্য ধর্ম বা অন্য কাস্ট হয়..তাহলে হয়তো আমাদের সম্পর্কটা বাড়ির কেউ মেনে নেবে না অত সহজে।

এসব অযাচিত ভাবে শুনে অগ্নিতে যেন ঘৃতাহুতি পড়লো... তার মনের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ যেন দাবাগ্নির মতো জ্বলে উঠলো। মনে হলো, তার এই ক্রোধানল সমস্ত সম্পর্কের বেড়াজালকে এক নিমেষে ভস্ম করে দিতে পারে!

–What do you mean by higher caste?....কী দেখে তোমার মনে এই ভাবনাটা এলো! তুমি আমার চেয়ে কতটা Higher !? তোমার কি অতিরিক্ত কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ রয়েছে! নাকি ঈশ্বর প্রদত্ত অতিরিক্ত কোনো ক্ষমতার অধিকারী!?

কই,আমরা চিকিৎসকরা তো কারুর রং দেখে চিকিৎসা করিনা...প্রথম দিনেই আমাদেরকে শপথ নিতে হয়,"I will provide care to all patients regardless of sex, race, creed, sexual preference, lifestyle or economic status."

–রাগ কোরো না প্লিজ। এতে আমার কোনো দোষ নেই...ছোটোবেলা থেকে এসব দেখেই বড়ো হয়েছি...তাই 'Slip of tongue' হয়ে গেছে।

–তুমি নাকি উচ্চ শিক্ষিতা! ছি! শেষপর্যন্ত তুমি কিনা মনের মধ্যে এই রকম সন্দেহ জিইয়ে রেখেছিলে! আমার ভাবতেই কেমন লাগছে...আমি কার সাথে এতদিন সম্পর্ক রেখেছিলাম!

–সরি। ভুল বুঝো না প্লিজ। আমরা কুলীন ব্রাহ্মন...তাই এতদিন ব্রাহ্মন পরিবারের মধ্যেই বিয়ে হতো আমাদের বংশে।

–তোমার এত সমস্যা থাকলে প্রথমদিনেই তো বলে দিতে পারতে! "পেটে নেই ভাত,

ধুয়ে খাবে জাত!"

–আসলে তোমার ছোটোবেলার ঐ ঘটনাটা বাড়িতে জানাতেই সবাই বেঁকে বসেছে...

–আচ্ছা,তোমার বাড়ির লোকের সাথে তুমিও এই So-called বংশ-মর্যাদাকে আঁকড়ে বসে থাকো...তবে এটা জেনে রাখো, গুণ ও কর্ম অনুসারেই এই সব বর্ণবিভাগ। আর কাস্ট নির্ধারিত হয় পেশার ভিত্তিতে। জন্মগতভাবে সবাই মানুষ হয়েই পৃথিবীতে আসে.. সুতরাং আমার বংশ গৌরব যাই হোক, এখন আমার একটাই পরিচয়..I'm a Doctor....এটাই আমার পেশা,এটাই আমার কাস্ট।

এক নিঃশ্বাসে এত কথা বলার পর স্বগতোক্তি করতে থাকে অরুষাগ্নি,

"হায়!ভূমিষ্ঠ হওয়ামাত্রই নামগোত্রহীন নিষ্পাপ শিশুকে এই সমাজ এ কি বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে! It should be abolished from India as soon as possible.Its killing India day by day.Its a kind of slow poison."

সেদিনের পর থেকে অরুষাগ্নি অদ্রিকার সাথে আর কোনো যোগাযোগ করেনি।

হয়তো দু'জনের ভুল বোঝাবুঝিতেই সম্পর্কটা এভাবেই শেষ হয়ে গেল! কিন্তু ও মন থেকে কিছুতেই ব্যাপারটি মেনে নিতে পারছিলো না। সত্যিই কি অদ্রিকার মনে এরকম প্রচ্ছন্ন অহংকারের বিষ লুকিয়ে ছিলো এতদিন...নাকি ও নিজেই একটু বেশি রিয়্যাক্ট করে ফেলেছে! এসব ভেবেই একরাশ শূন্যতা বুকে নিয়ে ওর চোখ দু'টি অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে।


(৪)

ডক্টর্স রুমের দেওয়ালে টাঙানো ঘড়ির কাঁটার ঢং ঢং শব্দে ওর সম্বিত ফিরলো। সাথে সাথেই কারা যেন কোরাসে গেয়ে উঠলো,"হ্যাপি বার্থ ডে টু ইউ ড.অরুষাগ্নি!" প্রথমটাতে ও একটু হকচকিয়ে গেল। আরে এ যে দেখছি SNCU-এর সিস্টাররা সবাই টেবিলের চারদিকে দাঁড়িয়ে! সামনে রাখা আছে একটা Heart-shaped জন্মদিনের কেক। রুমটাও Well-Decorated ... কিন্তু এতসব করলো কে! সিস্টারদের মধ্যে একজন বলে উঠলেন,"কী এত ভাবছেন ডাক্তারবাবু! কাটুন কেক টা...আমাদের তো জিভে জল এসে যাচ্ছে!"

আরেকজন কৌতূক সুরে বললেন,"আরে দিদি! আপনার তো জিভে জল এসে যাচ্ছে...দেখছেন না,ডাক্তারবাবুর চোখে জল...বেচারা ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কি দুঃস্বপ্নই না দেখছিল এতক্ষণ!"

অরুষাগ্নি মনে মনে ভাবলো, দুঃস্বপ্নই বটে! কিন্তু এই কেকটা Heart-shaped কেন! এমনিতেই হার্টে ছুরিকাঘাত করে একজন চলে গেছে...তাই ও এই হার্টের প্রতীকে প্রথমে ছুরি বসাতে একটু ইতস্তত করলেও পরক্ষণে নিজেকে সামলে নিয়ে কেক কাটতে উদ্যত হলো। কেকের প্রথম টুকরোটি হাতে নিয়ে সামনে তাকিয়ে দেখলো,একজন মুখ হাঁ করে তার সামনে দাঁড়িয়ে!

–অদ্রিকা!!!!!! আরে তুমি কখন এলে!

তাহলে কি অদ্রিকার সাথে ঐ মনমালিন্যের সব ঘটনা স্বপ্ন ছিলো!

"এই রে!ডাক্তারবাবু আমাদের কথা এবার ভুলেই গেলেন....আমাদেরকে কেক খাইয়ে এবার বিদায় করুন দেখি, তারপর দু'জন সারারাত ধরে প্রেমালাপ করবেন," সিস্টারের কথা শুনে অরুষাগ্নি এবার একটু লজ্জা পেলো। ডাক্তারবাবুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে সিস্টাররা চলে যাওয়ার পর অদ্রিকা অরুষাগ্নির চোখ মুছিয়ে দিয়ে বললো,"পাগল একটা...ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে এতক্ষণ কাঁদছিলো! আমি সেই সন্ধ্যে থেকে এই মুহুর্তটার জন্য অপেক্ষা করে বসে আছি।"

–রুমটা কখন সাজালে? মোমবাতির আবছা আলোয় খেয়াল করিনি ...তাছাড়া মনটাও ভালো ছিলো না।

–তুমি হস্পিটালে আসার আগেই দিদিমণিদের কাছে পারমিশন নিয়ে এসব করে রেখেছিলাম...তাছাড়া এই রুমের ছিটকিনিটা খারাপ,তাই জানতাম তুমি ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করতে পারবে না। যাহোক,এখন মন ভালো হয়েছে তো?

–কিন্তু তুমি লাস্ট এক সপ্তাহ এরকম ভাবে ইগনোর করছিলে কেন! ব্লক করে দিয়েছিলে বুঝি!!

–জানোই তো,"First repulsion is the sign of attraction." তাছাড়া একটা বিশেষ কাজে ব্যস্ত ছিলাম।

–কাজ?

–ঐ একটু আইনগত ঝামেলা ছিলো।

–মানে! তুমি কি কোনো ক্রাইম করে বসলেন নাকি?

–তোমার জন্য আমি সব করতেই পারি।

–একটু পরিস্কার করে বলো তো!

–তোমার জন্য সারপ্রাইজ গিফ্ট এনেছি।

–কই দেখাও দেখাও...

টেবিলে রাখা কলিং বেলটিতে আওয়াজ করতেই দিদিমণি একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন।

"আরে গোলুউউউ," চেয়ার থেকে লাফিয়ে উঠে দিদিমণির কাছ থেকে গোলুকে কোলে নিলো অরুষাগ্নি।

"আজ থেকে ও আমাদের কাছেই থাকবে, হোম থেকে সমস্ত আইনগত ঝামেলা মিটিয়ে ওকে দত্তক নিয়েছি আমি।" অদ্রিকার মুখে এই কথা শুনে অরুষাগ্নির দু'গাল বেয়ে আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়লো...মনে হলো গোলুও তার নতুন বাবা-মাকে পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছে।


(সমাপ্ত)

©মোহন








11 views0 comments

Recent Posts

See All

Subscribe to Our Newsletter

  • White Facebook Icon

© 2023 Powered by Maiti Infomedia Pvt Ltd.