"হে মাতঃ!প্রণমি তব পদে"

★দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে বিশেষ অনুষ্ঠান...

#মহালয়া_২০২০

★ভাষ্যরচনা,ভাষ্যপাঠ ও শ্লোকপাঠে: মোহন গায়েন

🎧Click here to listen in YouTube👇

https://youtu.be/kBmbOecmSOU


★Click here to listen(#mp3_version) in #Pratilipi_FM👇

https://pratilipifm.page.link/dKdrueqTfREZnZZdA

"হে মাতঃ!প্রণমি তব পদে"

©মোহন গায়েন

★★★★★★★★★★★★★★★★★

"হঠাৎ যখন আজ প্রভাতে,ঘুম ভাঙারই সাথে সাথে,

লাগলো হাওয়া মনের পালে

অনিমিখি আমার আঁখি,সোনালী রোদ গায়ে মাখি,

নেচে উঠি ঢাকের তালে ৷

দখিন্ হাওয়ায় উজান টানি,সাদা পালের নৌকাখানি,

আকাশ গাঙে দিচ্ছে পাড়ি

বিবাগী মন কি যেন চায়,দিগন্তে তাই একছুটে যায়,

বদ্ধ ঘরের আগল ছাড়ি ৷

শুভ্রঝুঁটি মাথায় করে,পথের ধারে সারে সারে,

দোলায় মাথা কাশের বন

কাটলো আঁধার অমা-নিশির,শরৎ ভোরের শিউলি-শিশির,

হাসছে ওরাও দু'ভাই-বোন ৷

শারদপ্রাতে শুদ্ধচিতে, মহালয়ার মধুর গীতে,

শিহরিত হই সারাক্ষণ

জগৎ আজি আনন্দময়,কেমনে বলো শান্ত রয়,

পরিযায়ী আমার মন !"


পিতৃপক্ষের অবসানকল্পে ও দেবীপক্ষের শুভ সূচনালগ্নে আকাশে-বাতাসে ধ্বনিত হচ্ছে জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমনী সুর....চরাচর বিশ্বপ্রকৃতিও আজ অপরূপ সাজে সজ্জিতা ৷ নীল আকাশে সাদা মেঘের পাল তোলা নৌকা, কাশের বনে ওঠা আনন্দ হিল্লোল, টুপটাপ শিউলি বৃষ্টি,মিষ্টি বাতাসে আনমনা মন,পাদ্যার্ঘ্য রূপে ঝরে পড়া শিশির কণা ....এই সন্ধিক্ষণকে করে তুলেছে অনির্বচনীয়া ।

পুরাণ মতে, এই শুভদিনেই অশুভ শক্তির বিনাশার্থে শুভ শক্তির প্রতীক স্বরূপ দেবতাদের শরীরজ মহাতেজ পুঞ্জীভূত হয়ে মহাশক্তির মূলাধার স্বরূপ দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে।

'মহালয়' বলতে বোঝায় 'মহান যে আলয় বা আশ্রয়' | এখানে দেবী দুর্গাকে সেই মহান আশ্রয় বা পরম আশ্রয় বলা হচ্ছে | যেমন আমাদের সকলের মা আমাদের পরম আশ্রয়...তেমনি মাতৃরূপে এই প্রকৃতি সমগ্র মহাজগতের আশ্রয় |

বঙ্গভূমি,বিশ্বজননীকে ঘরের মেয়ে রূপে আপন করে নিয়েছে । মর্ত্যভূমির দুঃখ-দুর্দশা দূরীভূত করার জন্য প্রতিবছর নিয়ম করে তাঁর শুভাগমন ঘটে এই পুণ্যতিথিতে। অমাবস্যার ঘোর অন্ধকারকে অপসারণ করে সমগ্র জগৎবাসী আজ সেই অমৃতজ্যোতিঃ স্বরূপিণী জগত্তারিণি দেবী দুর্গার আগমনের প্রতিক্ষায় ....


"নমস্তে শরণ্যে শিবে সানুকম্পে

নমস্তে জগদ্ব্যাপিকে বিশ্বরূপে।

নমস্তে জগদ্বন্দ্য-পাদারবিন্দে

নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে।।


নমস্তে জগচ্চিন্ত্যমানস্বরূপে

নমস্তে মহাযোগিনী জ্ঞানরূপে।

নমস্তে সদানন্দনন্দস্বরূপে

নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে।।


অনাথস্য দীনস্য তৃষ্ণাতুরস্য

ক্ষুধার্তস্য ভীতস্য বদ্ধস্য জন্তুোঃ।

ত্বমেকা গতির্দেবী নিস্তারকর্ত্রী,

নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে।।


অরণ্যে রণে দারুণে শত্রুমধ্যে

অনলে সাগরে প্রান্তরে রাজগেহে।

ত্বমেকা গতির্দেবী নিস্তারহেতুঃ

নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে।।


অপারে মহাদুস্তরেহত্যন্তঘোরে

বিপৎসাগরে মজ্জতাং দেহভাজাম্।

ত্বমেকা গতির্দেবী নিস্তারনৌকা,

নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে।।


নমশ্চণ্ডিকে চণ্ডদোর্দণ্ডলীলা-

সমুৎখণ্ডিতাখণ্ডলাশেষভীতে।

ত্বমেকা গতির্বিঘ্নসন্দোহহন্ত্রী,

নমস্তে জগত্তারিণি ত্রাহি দুর্গে।।"


ত্রেতাযুগে শরতের শুক্লষষ্ঠীর এক মহালগ্নে শুভক্তির জাগরণ ও অশুভ শক্তির বিনাশহেতু পত্নীবিরহে কাতর নিরুপায় শ্রীরামচন্দ্র সমগ্র জগতের আশ্রয়স্বরূপা চৈতন্যময়ী ভগবতীর শরণাপন্ন হলেন এবং অসময়ে সেই মহাশক্তির জাগরণের নিমিত্ত তাঁর স্ব-হস্তে নির্মিত মৃন্ময়ী মূর্তিকে স্তব মন্ত্রে করলেন উদ্বোধিত...


"নমস্তে ত্রিজগদ্বন্দ্যে সংগ্রামে জয়দায়িনী

প্রসীদ বিজয়ং দেহি কাত্যায়নি নমোহস্তুতে।।"

সর্বশক্তিময়ে দুষ্ট-শক্তি মর্দ্দন-কারিণি।

দুষ্টজৃম্ভিণি সংগ্রামে জয়ং দেহি নমোঽস্তু তে ॥

ত্বমেকা পরমাশক্তিঃ সর্বভূতেষ্ববস্থিতা ।

দুষ্টহন্ত্রী চ সংগ্রামে জয়ং দেহি নমোঽস্তু তে ॥

রণপ্রিয়ে রক্তভক্ষে মাংসভক্ষণকারিণি ।

প্রপন্নার্তিহরে যুদ্ধে জয়ং দেহি নমোঽস্তু তে ॥"


শ্রীরামের ভক্তিপূর্ণ আহ্বানে জগজ্জননী প্রসন্না হলেন... মৃন্ময়ী মূর্তিতে সঞ্চারিত হলো প্রাণ...অসুর দলনী মায়ের আবির্ভাবে জাগ্রত হলো শুভশক্তি ।

বিশ্বময়ি দুর্গার আশীর্বাদকে শিরোধার্য করে মহানবমী তিথিতে শ্রীরামচন্দ্র দশাননকে নিধন করলেন এবং পরদিন দশমীতে পালিত হলো বিজয়োৎসব।

আসুন আমরাও মহালয়ার পুণ্য লগ্নে আপনহৃদয়ভ্যন্তরে অঘোরে নিদ্রিত দেব-সুলভ মানবসত্তার জাগরণে তৎপর হই এবং এই মায়াময় পরিবেশের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শকে হৃদয়ঙ্গম করে, অসীমা পরমাপ্রকৃতিতে আত্মস্থ হই ...


"ত্বং স্বাহা ত্বং স্বধা ত্বং হি বষট্‌কারঃ স্বরাত্মিকা।

সুধা ত্বমক্ষরে নিত্যে ত্রিধা মাত্রাত্মিকা স্থিতা।।

অর্ধমাত্রা স্থিতা নিত্যা যানুচ্চার্যা বিশেষতঃ।

ত্বমেব সা ত্বং সাবিত্রী ত্বং দেবজননী পরা।।

ত্বয়ৈব ধার্যতে সর্বং ত্বয়ৈতৎ সৃজ্যতে জগৎ।

ত্বয়ৈতৎ পাল্যতে দেবি ত্বমৎস্যন্তে চ সর্বদা।।

বিসৃষ্টৌ সৃষ্টিরূপা ত্বং স্থিতিরূপা চ পালনে।

তথা সংহৃতিরূপান্তে জগতোঽস্য জগন্ময়ে।।

মহাবিদ্যা মহামায়া মহামেধা মহাস্মৃতিঃ ।

মহামোহা চ ভবতী মহাদেবী মহাসুরী ।।

প্রকৃতিস্ত্বং হি সর্বস্য গুণত্রয়বিভাবিনী । কালরাত্রির্মহারাত্রির্মোহরাত্রিশ্চ দারুণা ।।

ত্বং শ্রীস্ত্বমীশ্বরী ত্বং হ্রীস্ত্বং বুদ্ধির্বোধলক্ষণা ।

লজ্জা পুষ্টিস্তথা তুষ্টিস্ত্বং শান্তিঃ ক্ষান্তিরেব চ ।।

খড়্গিনী শূলিনী ঘোরা গদিনী

চক্রিণী তথা ।

শঙ্খিনী চাপিনী বাণভুসণ্ডীপরিঘায়ুধা ।। সৌম্যাসৌম্যতরাশেষসৌম্যেভ্যস্ত্বতিসুন্দরী ।

পরা পরাণাং পরমা ত্বমেব পরমেশ্বরী ।।"


বিপদাপন্ন ছোট্টশিশুর কাতর আহ্বানে তার জন্মদাত্রী জননী যেমনি করে সাড়া দেন ...ঠিক তেমনি করেই যুগে যুগে অসুরপীড়িত স্বর্গচ্যূত দেবগণকর্ত্তৃক সেই জগৎপ্রসবিনী পরমাপ্রকৃতি আহূত হয়ে দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনের মাধ্যমে জগতের স্থিতিশীলতা রক্ষা করেন।

এ প্রসঙ্গে দেবীর চিরন্তন অঙ্গীকার,

"ইত্থং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি।

তদা তদাবতীর্যাহং করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম্।।"


দিনের শেষে ঠিক যেমনভাবে শ্রান্ত শিশু মাতৃক্রোড়ে নিদ্রা যায়, তেমনিভাবেই সেই আধারস্বরূপিণী মহাশক্তির প্রভাবে সমগ্র জীবজগৎ মহাপ্রলয় কালে সেই সূক্ষ্ম তত্ত্বেই বিলীন হয় ৷ প্রকৃতপক্ষে সেই জন্ম-মৃত্যু-রহিতা সনাতনী মহামায়াই সৃষ্টি-স্থিতি-প্রলয়রূপ মহাচক্রের একমাত্র নিয়ন্তা ...সকল কারণের কারণ ...'আব্রহ্ম স্তম্ব পর্যন্ত' সকল জীবের কুলকুণ্ডলিণী শক্তি। আবার তিনিই মহাপ্রলয়ান্তে মহাজগতের বীজরূপে সৃষ্ট্যাদি কার্য পরিচালনা করেন৷


"প্রলয় পয়োধি জলে

জগৎ যখন রসাতলে

সৃজন-পালন-সংহারকারী

তোর কোলে মা পড়লো ঢলে ৷


মহারাত্রির অবসানে

বলিস ধাতার কানে কানে

'জাগরে খোকা,ভোর হলো যে

দেখবো তোরে নতুন সাজে ৷'


বহুরূপেই দেখি তোরে

তবু আমি রই বেঘোরে

বুঝি না তোর লীলাখেলা

কোন্ মোহিনী যাদুর বলে ৷


কর্ম চঞ্চলা

করিস এ কোন্ খেলা

যেথা বিধাতারও আসন টলে....

প্রলয় পয়োধি জলে ৷"


হে মাতঃ! মহাস্বপ্ন স্বরূপ এই অনিত্য মহাজগতাভ্যন্তরে তুমিই একমাত্র পরমপূর্ণা বা স্বয়ংসম্পূর্ণা সত্তা... শাশ্বত পরমাত্মা। তুমি ত্রিগুণাতীতা,তুমি নিত্যা...আদি-অন্ত-রহিত আদ্যাশক্তি...বাক্য ও মনের অগোচর একমাত্র পরম সত্য তত্ত্ব।

তুমি স্বরূপত এক ... কিন্তু গুণ ও কর্মভেদে তোমার প্রকাশ বিভিন্ন । ভর ও শক্তি যেমন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত...তেমনি সেই মহাশক্তিরূপা তুমিও কখনও সাকারা আবার কখনও নিরাকারা ... কখনও প্রকৃতিরূপা, কখনওবা পুরুষরূপে প্রকাশমানা ...আবার অজ্ঞানরূপ দেহ ও মনের আগল অপসৃত হলেই সেই অদ্বৈতভাবই তোমার পরম রূপ।

সমগ্র উপনিষদ ও পুরাণ শাস্ত্রেই সেই অক্ষয় অদ্বৈত বাণীই ধ্বনিত হয়েছে,

"একৈবাহং জগত্যত্র,দ্বিতীয়া কা মমাপরা" অর্থাৎ "একা মাত্র আমিই এ জগতে বিরাজিতা। আমি ছাড়া দ্বিতীয় আর কে আছে?"

এই সচেতন বিশ্বসংসার যদি হয় একটি জাজ্বল্যমান প্রদীপশিখা....তাহলে সেখানে অফুরান তৈল সঞ্চারকারিণী পরিপোষক শক্তিই হলেন সেই মহামায়া ৷ সেই অনন্ত বিভূতিময় চালিকাশক্তির প্রভাবেই অনন্তকোটী ব্রহ্মাণ্ড এই দৃশ্যমান জগতের ন্যায় আপন ছন্দে কর্তব্যরত ৷

হে বিশ্বরূপে!এই পরিদৃশ্যমান ভূমন্ডলে যা কিছু বিদ্যমান আছে সবই তোমার স্থূলকায়া।

হে মাতঃ!হে সর্বব্যাপ্ত পরা-প্রকৃতি, সর্বশক্তিময়ী অনন্তে! তুমি প্রসন্ন হও....


"দেবি প্রপন্নার্তিহরে প্রসীদ

প্রসীদ মাতর্জগতোঽখিলস্য ৷

প্রসীদ বিশ্বেশ্বরি পাহি বিশ্বং

ত্বমীশ্বরী দেবি চরাচরস্য ৷৷

আধারভূতা জগতস্ত্বমেকা

মহীস্বরূপেণ যতঃ স্থিতাসি ৷

অপাং স্বরূপস্থিতয়া ত্বয়ৈত-

দাপ্যায়তে কৃৎস্নমলঙ্ঘ্যবীর্যে ৷৷

ত্বং বৈষ্ণবীশক্তিরনন্তবীর্যা

বিশ্বস্য বীজং পরমাসি মায়া ৷

সম্মোহিতং দেবি সমস্তমেতৎ

ত্বং বৈ প্রসন্না ভুবি মুক্তিহেতুঃ ৷৷

বিদ্যাঃ সমস্তাস্তব দেবি ভেদাঃ

স্ত্রিয়ঃ সমস্তাঃ সকলা জগৎসু ৷

ত্বয়ৈকয়া পূরিতমম্বয়ৈতৎ

কা তে স্তুতিঃ স্তব্যপরাপরোক্তিঃ ৷৷

সর্বভূতা যদা দেবী স্বর্গমুক্তিপ্রদায়িনী ৷

ত্বং স্তুতা স্তুতয়ে কা বা ভবন্তু পরমোক্তয়ঃ ৷৷

সর্বস্য বুদ্ধিরূপেণ জনস্য হৃদি সংস্থিতে ৷

স্বর্গাপবর্গদে দেবি নারায়ণি নমোঽস্তু তে ৷৷

কলাকাষ্ঠাদিরূপেণ পরিণামপ্রদায়িনি ৷

বিশ্বস্যোপরতৌ শক্তে নারায়ণি নমোঽস্তু তে ৷৷

সর্বমঙ্গলমাঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে ৷

শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরি নারায়ণি নমোঽস্তু তে ৷৷

সৃষ্টিস্থিতিবিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনি ৷

গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণি নমোঽস্তু তে ৷৷

শরণাগতদীনার্তপরিত্রাণপরায়ণে ৷

সর্বস্যার্তিহরে দেবি নারায়ণি নমোঽস্তু তে ৷৷

হংসয়ুক্তবিমানস্থে ব্রহ্মাণীরূপধারিণি ৷