"করোনা যুদ্ধে জিতবে কে?" #COVID-19

©মোহন গায়েন

/ Watch the video at the end of the article /


বিগত কয়েকমাস ধরে যে যুদ্ধের ভয়াবহতায় সমস্ত বিশ্ববাসী ত্রস্ত এবং অসহায় ...তাকে "তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ" হিসাবে আখ্যায়িত করলে হয়তো অত্যুক্তি হবে না....তবে মানুষে-মানুষে এই যুদ্ধ নয়,মানুষের সাথে আপাতভাবে অদৃশ্য এক জৈবকণার আমৃত্যু সংগ্রাম । মানুষের বিপক্ষে থাকা এই জৈবকণাকে "করোনা" নামে অভিহিত করা হয়েছে । তবে এটাই প্রথমবার নয়....ইনি যুগে যুগে মনুষ্যকুলকে শায়েস্তা করার জন্য নানানরকম রূপ পরিগ্রহ করেছেন । ইতঃপূর্বে ২০০২ সালে SARS(Severe Acute Respiratory Syndrome) এবং ২০১২ সালে MERS(Middle East Respiratory Syndrome) নামে ইনি আবির্ভূত হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু সেবার সমস্ত বিশ্ববাসীকে একযোগে সঙ্কটাপন্ন করতে পারেননি, তাই এবার তিনি COVID-19(Coronavirus disease-2019) নামক বিধ্বংসী অবতার গ্রহণ করেছেন । চিনের হুবেই প্রদেশের উহান শহর এই ভাইরাসের গর্ভগৃহ এবং ২০১৯ সালের ৩১শে ডিসেম্বর প্রথম আত্মপ্রকাশ...তারপর ধীরে ধীরে সমগ্র ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বব্যাপী প্রসারলাভ । তবে আমাদের দেশে পৌঁছাতে প্রায় একমাস সময় লেগে যায় (First case in India, reported on Jan 30 in Thrissur, Kerala)। এরপর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ১১ই মার্চ এই রোগকে "Pandemic" হিসাবে ঘোষণা করে । যাহোক,এবার আমরা করোনাসুরের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানবো....কি তার রুচি-প্রকৃতি,কারা কারা তার শিকার হতে পারেন,কারা কারা নিরাপদ থাকতে পারেন এবং কিভাবে এই অসম লড়াইয়ে আমরা জয়লাভ করতে পারবো, এসব নিয়েই আজকের আলোচনা.... প্রথমেই বলি,COVID-19-এ মৃত্যুহার(4 to 5%) পূর্বসূরী SARS(≈10%) কিংবা MERS(≈34%)-এর তুলনায় কম হলেও স্বল্প সময়ে এর ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা অনেকগুণ বেশী । তাই যত দিন যাচ্ছে ততই এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা গুণোত্তর প্রগতিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে । ১)কিভাবে এই রোগ ছড়ায়? •প্রধানত হাঁচি,কাশির মাধ্যমে এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে সুস্থ ব্যক্তিতে সংক্রামিত হয় । ভাইরাস শরীরে প্রবেশ করার ২ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে এই রোগের রোগ লক্ষণ প্রকাশ পায় । তবে রোগ লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার আগে থেকেই ভাইরাস অন্য ব্যক্তিতে সংক্রামিত হতে শুরু করে । ২)কিভাবে প্রাথমিক রোগলক্ষণগুলি (জ্বর,কাশি,শ্বাসকষ্ট) প্রকাশিত হয়? •প্রাথমিকভাবে করোনা ভাইরাস রোগীর ফুসফুসকে আক্রমণ করে এবং ফুসফুসের কার্যকরী একক অ্যালভিওলাসের কোশকে (Type-I&Type-II Pneumocyte)ধ্বংস করে (binds with ACE-II Receptors of Type-II Pneumocyte & enters into the cell)। কোশের ভিতরে প্রবেশের পর নিজের +ssRNA এবং পরিপোষক কোশের(Host cell) রাইবোজোম ও বিভিন্ন উৎসেচকের সহায়তায় অসংখ্য নতুন ভাইরাস সৃষ্টি করে এবং নতুন কোশকে আক্রমণ করে । Type-II Pneumocyte থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন Mediators ম্যাক্রোফাজকে উদ্দীপিত করে । এরপর ম্যাক্রোফাজ থেকে নিঃসৃত সাইটোকাইনগুলি(IL-1,IL-6,TNF-α) রক্তজালককে ভেদ্য করে তোলে ....ফলে রক্ত থেকে প্লাজমা আলাদা হয়ে বায়ুথলিগুলির মধ্যবর্তী স্থানে জমা হয় । এছাড়া Neutrophils থেকে নিঃসৃত বিভিন্ন উৎসেচকের(Proteases,ROS etc) প্রভাবে অ্যালভিওলাসের কোশগুলি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। অন্যদিকে Surfactant(↓Surface tension) নিঃসরণকারী Type-II Pneumocyte কোশ ধ্বংস হয়ে যাওয়ার ফলে অ্যালভিওলাসের Surface tension বেড়ে যায় । ফলে অ্যালভিওলাসগুলি চুপসে(collapse) যায় ‌এবং অ্যালভিওলাসের ভিতরে উক্ত কোশ ও ভাইরাসের মিশ্রণ(Consolidation) তৈরী হয়। ফলে ফুসফুসের গ্যাসের আদান-প্রদান সম্পূর্ণরূপে ব্যাহত হয় । শুরু হয় শ্বাসকষ্ট এবং কাশি । আবার ম্যাক্রোফাজ থেকে নিঃসৃত সাইটোকাইনগুলির প্রভাবে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের হাইপোথ্যালামাস উদ্দীপিত হওয়ায় দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় ও জ্বর অনুভূত হয় । কোনো কোনো ক্ষেত্রে গলাব্যথা,ডায়ারিয়া ইত্যাদি লক্ষণ ও দেখা দেয়। ৩)রোগ ভয়ানক আকার ধারণ করলে কী কী হতে পারে? •রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতি হওয়ার ফলে রোগীর হার্টরেট্ (Hypoxia→Chemoreceptors→Triggers Sympathetic Nervous System→↑HR),রেসপিরেটরি রেট্ বেড়ে যায় । রক্ত থেকে প্লাজমা আলাদা হয়ে যাওয়ার ফলে রক্তের আয়তন কমে যায় এবং রক্তচাপ হ্রাস পায় । যার ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিতে রক্ত সঞ্চালন কমে যায় এবং অবশেষে Multi System Organ Failure হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে । ৪)কিভাবে এই রোগ নির্ণয় (Diagnosis) করা হয় ? •প্রাথমিক রোগলক্ষণগুলি দেখে এবং কিছু ল্যাবরেটরি টেস্টের মাধ্যমে এই রোগ নির্ণয় করা হয় । প্রথমেই পেশেন্টের কাছ থেকে Nasopharyngeal Swab সংগ্রহ করা হয় ...তারপর Real Time Reverse transcription polymerase chain reaction (RT-PCR) করা হয় । •এছাড়া CT-Scan,X-Ray,USG-এর মাধ্যমেও এই রোগ সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যেতে পারে । X-Ray ও CT-Scan-এ 'Ground glass opacity','Consolidation'এবং CT-Scan-এ 'Crazy paving pattern' এগুলি দেখা যেতে পারে। •এছাড়া রক্ত পরীক্ষাতেও কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যেতে পারে। (Lymphopenia,↑BUN,↑Cr,↑ESR,↑CRP,↑ALT,↑AST,↑LDH, ↑Ferritin,↑D-Dimer level etc.) ৫)কাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী? •যে কোনো বয়সের মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন...তবে যাঁরা আগে থেকে অন্যান্য রোগে ভুগছেন এবং যাদের অনাক্রম্যতা(Immunity) কম(যেমন, বয়স্ক মানুষরা যাঁরা অ্যাজমা,উচ্চ রক্তচাপ,ডায়াবেটিস কিংবা ক্যান্সারে ভুগছেন)...তাঁদের ক্ষেত্রে এই রোগ জটিল আকার ধারণ করতে পারে । ৬)এই রোগের চিকিৎসা কী? •প্রথমেই বলে রাখা ভালো,এই রোগের জন্য নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষেধক ভ্যাকসিন এখনও প্রচলিত হয়নি(নতুন ভ্যাকসিন সফলভাবে বাজারে আসতে ২০২১ সাল চলে আসবে)...তাই Supportive treatment-ই একমাত্র ভরসা। এছাড়া রোগীর শরীরে তরলের ভারসাম্য ও অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখা,কৃত্রিমভাবে শ্বাসকার্য পরিচালনার জন্য ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করা...এসব দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে । সম্প্রতি অন্যান্য রোগে ব্যবহৃত কিছু ওষুধ COVID-19 এর চিকিৎসার জন্য Study করে কিছুটা সাফল্য পাওয়া গেছে ।যেমন,Hydroxychloroquine(Inhibits virus entry to Type-II Pneumocytes of alveoli),Ritonavir(Inhibits Proteinases),Remdesivir(Inhibits RNA dependent RNA polymerase),Tocilizumab(Inhibits Cytokines released by macrophages)etc.। যাহোক, এই ওষুধগুলি বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত (Adverse effects) এবং কোনোটিই সম্পূর্ণরূপে COVID-19-কে আটকাতে সক্ষম নয় । তাই ডাক্তারবাবুর পরামর্শ ছাড়া কোনোটিই ব্যবহার করা নিরাপদ হবে না । ৭)এই রোগ প্রতিরোধের(Prevention) উপায় কী? •"Prevention is better than cure" কথাটি করোনার ক্ষেত্রে যথাযথ। একমাত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া আমাদের কাছে অন্য কোনো উপায় এই মুহূর্তে নেই । এ যেন এক অভিনব কুরুক্ষেত্রের ময়দান! যেখানে আমাদের কাছে অস্ত্র-শস্ত্র সংখ্যা সীমিত এবং একমাত্র কৌশলই ভরসা । এই লড়াই ঘরে থেকে করার লড়াই...এবং প্রতিটা মানুষই এই জৈবযুদ্ধের সৈনিক। •We can break the chain of transmission only by staying at home......সুতরাং অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বেরোনো থেকে বিরত থাকুন। •নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোওয়ার অভ্যাস করুন....পারলে হালকা গরম জলে ধুতে পারেন(Hand washing properly with soap at least for 20 seconds) •জনাকীর্ণ স্থান এড়িয়ে চলুন ....Maintain Physical (Social)distancing •রোগীর থেকে কমপক্ষে ছয়ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন এবং আলাদা শৌচাগার ব্যবহার করুন •নিয়মিত মাস্ক ব্যবহার করুন(N-95 mask is recommended) •চোখ,মুখ ও নাকে হাত দেওয়ার অভ্যাস বর্জন করুন(Avoid touching T-zone) ✓Note:এই ভাইরাস মানুষের থেকে কুকুরের শরীরে সংক্রামিত হতে পারে কিন্তু কুকুরের থেকে মানুষে সংক্রামিত হওয়ার কোনো প্রমাণ এখনও পর্যন্ত নেই। ৮)N-95 mask Vs Surgical Mask •কোনো মাস্ক ১০০% সুরক্ষা দেয় না । তবে সঠিক পদ্ধতিতে পরিহিত N-95 মাস্কের ৯৫% airborne particles (0.3micron) আটকানোর ক্ষমতা আছে । প্রকৃতপক্ষে, tight fitting N-95 mask, airborne particles প্রবেশে বাধা দেয় এবং তুলনামূলকভাবে loose fitting Surgical mask রোগীর শরীর থেকে নির্গত particles পরিবেশে ছড়িয়ে পড়া রোধ করে। ✓তবে একটি মাস্ক একবারই ব্যবহার করা উচিত এবং একটানা একটি মাস্ক ৮ ঘন্টার বেশী ব্যবহার করা উচিত নয় । ৯)আশার কথা: •আমাদের দেশ তথা রাজ্যের জন্য এই এপ্রিল মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । হয়তো আরেকটু সচেতন হলেই আমরা করোনা ভাইরাসকে "এপ্রিল-ফুল(April fool)" বানাতে পারবো । প্রকৃতিও আমাদের সহায় আছে । এই সময় থেকে তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের জলীয় বাষ্পের পরিমাণ ক্রমশ বাড়তে থাকে ....যা ভাইরাসের বেঁচে থাকা ও সংক্রামিত হওয়ার পক্ষে প্রতিকূল । তাই যদি একটু সম্মিলিত ভাবে আমরা প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি, তাহলে কিছুদিনের মধ্যে আমরা হয়তো এই অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবো । ১০)উপসংহার: •মনে রাখবেন, আমাদের চারপাশে আপাত সুস্থ(Undiagnosed cases) মানুষের সংখ্যা অনেক বেশী.....যতজন মানুষের মধ্যে রোগ লক্ষণ দেখা যাচ্ছে তা "Tip of the iceberg" ছাড়া কিছুই নয়। তাই Self Quarantine আর Lock Down-ই আমাদের বাঁচার একমাত্র উপায় । অন্ততঃ এই ক'টা দিন "ঘরকুনো বাঙালি" অপবাদটা সত্যি হলে ক্ষতি নেই...বরং লাভই আছে। যাহোক,অযথা ভীত হবেন না । মনে বল রেখে দৃঢ় পণে যুদ্ধ করলে অবশ্যই আমরা সফল হবো । আশা রাখুন, "একদিন ঝড় থেমে যাবে, পৃথিবী আবার শান্ত হবে। বসতি আবার উঠবে গড়ে, আকাশ আলোয় উঠবে ভরে...।" —:সমাপ্ত:—

Watch the video on this topic here:




https://youtu.be/iKBUQaiBzVo

51 views

Subscribe to Our Newsletter

  • White Facebook Icon

© 2023 Powered by Maiti Infomedia Pvt Ltd.