উনবিংশ শতাব্দীর অনার কিলিং - সতীদাহ (পর্ব - ২)



কেরীসাহেবের পণ্ডিত ছিলেন মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। ব্রাহ্মণ সমাজে পণ্ডিত হিসাবে তাঁর নামডাক প্রচুর৷ লর্ড ওয়েলেসলীর প্রতিষ্ঠিত কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে একসঙ্গে পড়াতেন কেরী সাহেব আর মৃত্যুঞ্জয় পণ্ডিত। সেইখান থেকেই পণ্ডিতের শ্রীরামপুরে আগমন ও কেরীর সাহচর্য। কেরীর অনুরোধে সতীদাহর মত বর্বর প্রথা রোধ করতে লেগে পড়েন মৃত্যুঞ্জয়ও। সারাদিন পুঁথি ও শাস্ত্র ঘেঁটে খুঁজে বের করবার চেষ্টা করতেন শাস্ত্রে সতীদাহের বিরুদ্ধমত। রামমোহন রায়ের সতীদাহ বিরোধী মুভমেন্টের অনেক আগেই সমস্ত শাস্ত্রবিধি ঘেঁটে ব্যাখ্যা বার করেছিলেন মৃত্যুঞ্জয়। ১৮১৭ সালে সদর দেওয়ানি আদালতের প্রধান বিচারপতির অনুরোধে তিনিই প্রথম সতীদাহ প্রথার শাস্ত্রবিরোধী দিকটি ব্যাখ্যার মাধ্যমে জনসমক্ষে তুলে ধরেন।

সতীদাহ প্রথা হিন্দু সমাজে তখন নতুন নয়। সময়টা খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৩০০ বছর আগে। গ্রীক বীর আলাকজান্ডার যখন ভারতবিজয়ে এসেছিলেন, তাঁর সঙ্গী ছিলেন ঐতিহাসিক এরিস্টোবুলুস। তৎকালীন ট্যাক্সিলা বা তক্ষশীলা শহরে ঘটে যাওয়া একটি সতীদাহের ঘটনা উঠে এসেছিল তাঁর কলমে। হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী নাড়াচাড়া করলেও সতীদাহের উল্লেখ মেলে মহাভারত বা রামায়ণে। হস্তিনাপুর সম্রাট চক্রবর্তী রাজা পাণ্ডুর মৃত্যুর কথা কে না জানে। আর পাণ্ডুর অকালমৃত্যুর কথা এলেই যে প্রসঙ্গ আবশ্যিক ভাবে উঠে আসে তা হল রানী মাদ্রীর স্বেচ্ছায় সহমরণে যাওয়ার কাহিনী। পাণ্ডুর মৃত্যুর জন্য নিজেকে আগাগোড়া দোষী ঠাওরে স্বামীর চিতায় আরোহন করেন এই ভারতমহিষী। সুতরাং সতীদাহ কোনো আকস্মিক গজিয়ে ওঠা রীতি তো নয়ই। বরং সনাতন হিন্দু সমাজে বহুদিন ধরে সযত্নে লালিত হওয়া এক লৌকিক প্রথা। বৈদিক যুগের ভারতবর্ষে গার্গী বা মৈত্রেয়ীর মত বিদুষী নারীরাই কিভাবে আধুনিক ভারতবর্ষে মৃত স্বামীর চিতার আগুনে স্বেচ্ছায় চড়ে বসতে পারে, তা আজও গবেষকদের অবাক করে বৈকি। ঋগ্বেদ বিধবা স্ত্রীর বেঁচে থাকবার সম্পূর্ণ অধিকার দেয়। এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পর দেবরের সাথে বিবাহের নিদর্শনও স্পষ্ট। যে মহাভারত স্বেচ্ছায় মাদ্রীর সহমরণের কথা বলে সেই মহাভারতেই আবার স্বামী বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর পটরানী অম্বালিকা শ্বাশুড়িমা সত্যবতীর নির্দেশে ব্যাসদেবের সাথে মিলিত হয়ে রাজকুমার পাণ্ডুর জন্মদান করেন। আগাগোড়াই সতীদাহ কোনো জোর করে ঘটানো হত্যাকাণ্ড নয়। ছিলও না। কিন্তু আধুনিক ভারত যা নিজের চোখে দেখে এসেছে, তা এককথায় অস্বীকার করবে কিভাবে। কলকাতা শহর যখন একটু একটু করে মহানগরীর চেহারা নিচ্ছে, তখন ঢাকঢোল পিটিয়ে তরুণী বিধবার হাত পা বেঁধে পিটিয়ে তুলে দেয়া হচ্ছে স্বামীর জ্বলন্ত চিতায়। কী তার ইচ্ছে? সে নিয়ে আর ভাবছে কে? বৈদিক যুগের গার্গীরা তখন মুখ লুকিয়েছেন গঙ্গার শত শত ঘাটের পাষাণে। চেষ্টা যে কেউ করেন নি তাও নয়। এক্ষেত্রে মোঘল সম্রাটদের কথা বলতেই হয়। সতীদাহ বন্ধ করবার জন্য সম্রাট হুমায়ুন সচেষ্ট হন প্রথম। এই নারকীয় প্রথার বিরুদ্ধে রাজহুকুম এনে বিধবাদের সতী হবার বিষয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা দানের চেষ্টা করেন তিনি। তাঁর সুযোগ্য পুত্র ভারতসম্রাট আকবর সতীদাহ বন্ধের সরকারি আইন প্রণয়নও করেন। কিন্তু হিন্দু লৌকিকতার ওপর মুসলিম আগ্রাসনকে কোনোদিনই ভালোভাবে নেয় নি দেশের হিন্দু নাগরিক। রাজকর্মচারীদের ধরে করে ও ঘুষ দিয়ে হলেও বহালতবিয়তে চলেছিল বিধবা পুড়িয়ে মারার একের পর এক ঘটনা। সতীদাহর ব্যাপারে রাজকর্মচারী ও প্রশাসনের ওপর সম্পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করেন উদার ধর্মীয় নীতির রূপকার শাহেনশাহ আকবর। রাজপ্রশাসনের অনুমতি ভিন্ন সতীদাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। এমনকি দাহ করবার আবেদন ইচ্ছেমতো বিলম্বিত করবার ক্ষমতাও পায় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ সুবেদাররা। কিন্তু কোথায় কী। চোখে ধুলো দেবার কাজ যথারীতিই চলছিল। সম্রাট শাহজাহানও নিয়ম করেন সতীদাহর বিরুদ্ধে। শিশুসন্তান আছে এমন নারীকে দাহ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু রাজা রামমোহন রায়ের আগে কেউ কখনো জীবন বাজি রেখে ঝাঁপিয়ে পড়েন নি শর্তহীন ভাবে সমস্ত সতীর দাহ রদ করবার মনোবাঞ্ছা নিয়ে। একজন বিধবাকে বাঁচাতে কেউ নিয়ম করে নিজে ছুটে বেড়ায় নি প্রতিটি গঙ্গার ঘাটে ঘাটে।

সহমরণ প্রচলিত ছিল সারা ভারত জুড়েই। কিন্তু এই বাংলায় যেন তার বেশি রমরমা। একটু চোখ বোলানো যাক সেযুগে ম্যাজিস্ট্রেটের নথিতে। ১৮১৫ সাল থেকে ১৮২৬ সাল পর্যন্ত যেখানে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সীতে সতী হবার সংখ্যাটা ২৮৭ টি, বোম্বাই প্রেসিডেন্সীতে ২৮৪ টি, সেখানে শুধুমাত্র বেঙ্গল প্রেসিডেন্সীতেই ৭১৫৪ টি। কলকাতা ও তৎসংলগ্ন ঘাটগুলোতে তখন প্রায়ই সতী হবার হুড়োহুড়ি। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১৮১৯ সালে বাংলার বিভিন্ন স্থানে সতীর সংখ্যা এইরকম - বর্ধমানে ৭৫, হুগলী ১১৫, নদিয়া ৪৭, কলকাতা ও আশপাশের এলাকায় ৫২, কটক ৩৩, যশোর ১৬, মেদিনীপুর ১৩। স্বামীর চিতায় সরাসরি স্বর্গপ্রাপ্তি দেখবার ভিড়ও নেহাৎ কম নয়। সতীদাহ দেখে গঙ্গাস্নান সেরে বাড়ি ফিরে যাবার পূণ্যসঞ্চয়ের হাতছানিই টেনে আনত আমজনতাকে। এদিকে তীর্যক দৃষ্টিতে তখন সতীদের সংখ্যা গুনছে ইংরেজ সরকার বাহাদুর। কিন্তু তখনও সরাসরি দেশীয় প্রজাদের সঙ্গে ধর্মীয় স্পর্শকাতর লড়াইটা লড়বার উদ্দেশ্যে ময়দানে নামার সাহস সঞ্চয় করতে পারেন নি স্বয়ং বড়লাট সাহেবও। সতীদাহ প্রথার আলোচনা করতে গিয়ে আমরা যদি আরো কয়েকদিন পিছিয়ে যাই তবে একবার গিয়ে দাঁড়াতে হয় নবাবী আমলে বাংলায় শিক্ষার পীঠস্থান নবদ্বীপে। সেই সময় নবদ্বীপই সনাতন হিন্দু সমাজের ধর্মীয় রাজধানী। ঠিক তখন নবদ্বীপের গৌরব শ্রেষ্ঠ স্মার্ত পণ্ডিত রঘুনন্দন রচিত 'অষ্টাবিংশতিতত্ত্ব' নবস্মৃতি গ্রন্থে সতীদাহ প্রথার গুণকীর্তন করা হল উদাত্তকণ্ঠে। হিন্দু সমাজের গোঁড়া পণ্ডিতেরা দেখালেন রঘুনন্দনের টীকা। ঘরে ঘরে ছেয়ে গেল হিন্দু রমণীর অবশ্য কর্তব্য স্বামীর চিতায় সহমরণের কথা। কিন্তু কেন এমন বললেন স্মৃতিশিরোমণি রঘুনন্দনের মতো পণ্ডিত? যিনি বিভিন্ন দেশভ্রমণের পর মাত্র ২৫ বছর বয়সে এই স্মৃতিগ্রন্থটি রচনা করেন। যাঁর অগাধ পাণ্ডিত্যের ফল আজও প্রতিফলিত হয় দূর্গাপুজোর আচার পদ্ধতিতে। ধারণা করা যায় তৎকালীন বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম শাসনে হিন্দুদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত রঘুনন্দন এমন ভাবেই গ্রন্থ রচনা করেন ও লৌকিক উপাচার আরোপ করেন যাতে সনাতন স্বার্থ রক্ষাই প্রধান দিক হিসাবে বিবেচিত হয়। সেক্ষেত্রে যবনের হাতে বিধবার ধর্মনাশ হবার চেয়ে ঢের ভালো স্বামীর চিতায় স্বর্গযাত্রী হওয়া। আমরা রাজপুতানায় নারীর সম্ভ্রম রক্ষায় স্বেচ্ছায় জহরব্রতর কথাও শুনেছি। যবন শাসকের আগ্রাসন থেকে বাঁচতে অসংখ্য নারী অন্দরমহলে অনায়াসে ঝাঁপ দিত জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে। আগুন এক চিরউপাস্য দৈব-উপকরণ। এর গ্রাসে সমস্ত শরীর জুড়িয়ে গেলে আর থাকেনা ধর্মনাশের চোখরাঙানি। রঘুনন্দনের পুঁথি যে ঠিক তাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

7 views0 comments

Recent Posts

See All

রবিবারের সন্ধে। পরিবারের সকলের মুখে হাসি। গল্পগাছা আর আড্ডাবাজি। সাথে যদি থাকে মুচমুচে সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর এই স্ন্যাকস তাহলে জমজমাট হয়ে যায় প্রতিটি মুহূর্ত। ঘরে অনেকদিন মিইয়ে পড়ে থাকা বালিতে ভাজা কিছ