অথেনটিক এঁচোড় চিংড়ি আর ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতি


এঁচোড়-চিংড়ি আর বাংলার হেঁশেল -- কম্বিনেশনটা ঠিক মা সন্তানের মতো, একজন আরেকজন ছাড়া অসম্পূর্ণ। এমন কোনো বাঙালি নেই যিনি রবীন্দ্রনাথ সত্যজিৎ নিয়ে গলা ফাটাননি, যিনি ইস্টবেঙ্গল মোহনবাগান নিয়ে রাতের পর রাত লড়েননি, ঠিক সেইরকমই দাবদাহের গ্রীষ্মে কচি গাছপাঠা আর চিংড়ির এই লোভনীয় পদে রবিবার দুপুরে কব্জি ডোবাননি এমন ঘর এই বাংলায় নেই,বাংলার বাইরের প্রবাসী বাংলার ঘরেও নেই

আজ আষাঢ়ের রবিদুপুরে তাই নিয়ে চলে এলাম এঁচোড় চিংড়ি। চলুন গল্প করতে করতে রান্নাটা সেরে ফেলি। এই রান্নাটার সাথে স্পেশালি জড়িয়ে আছে আমার স্বর্গত পিশিশাশুড়ীর গমগমে কণ্ঠস্বর আর খানিকটা রক্তের ইতিহাস। না না,ভয় পাবেন না 😃 আমি কোনো রাজবংশের উত্তরসূরী নই আর রক্ত মানে খুনখারাপি নয় একদমই। বাকিটা পরে বলছি। আপাতত উপকরণগুলো গুছিয়ে নিই ,

রান্নাটা করতে আমাদের লাগছে

একটি এঁচোড়

পরিমাণমতো আলু ( এঁচোড়ের পরিমাণ অনুযায়ী 1-3 ভাগ আলু)

বাগদা চিংড়ি

আদা

পেঁয়াজ

রসুন

টমেটো

কাঁচালংকা

জিরেবাটা

শুকনো লাললংকাবাটা

গরমমশলাবাটা

সরষের তেল

ঘি

ফোড়নের জন্য -- গোটা জিরে,তেজপাতা, এলাচ লবঙ্গ দারচিনি

এবার রান্নার পদ্ধতি--

প্রথমে এঁচোড় কেটে ধুয়ে, একটা বড় পাত্রে বেশ খানিকটা জল নিয়ে অন্তত দশ মিনিট সময় নিয়ে সেদ্ধ করতে হবে, ৬০% এর বেশি সেদ্ধ যেন না হয় সেদিকে একটু নজর দেয়া দরকার। তো যে গল্পটা বলছিলাম আমার পিশিশাশুড়ী, যিনি একজন রাশভারি গোছের মহিলা। সাত্ত্বিক নিরামিষভোজী। ধর্মপ্রাণা এদিকে চরম বইপোকা সাথে উত্তম রাঁধুনি, কেউ তার কাছে ঘেঁষার সুযোগ পায় না ভয়ে এতটাই তাঁর ব্যক্তিত্ব। তা, বিয়ে হয়ে আসার পরদিনই তিঁনি চলে এসেছেন আমি যে ঘরে বসে আছি সেখানে, হাতে একটা ওয়াকিং স্টিক। একজন নতুন বৌয়ের অবস্থা তখন কেমন হতে পারে সেটা সহজেই অনুমেয়। আমার ছোট্ট এক ননদ তাঁর সম্পর্কে আমায় আগেই বলে রেখেছিল। বাঙালি বাড়ির বিবাহ রিচুয়ালে 'বউভাত' বলে একটি নিয়ম আছে যেখানে নববিবাহিতাকে তাঁর স্বামী 'ভাতকাপড়' তুলে দেন সাথে সাথে সেই বৌটিও সেদিন দুপুরে বাড়ির গুরুজনদের পাতে ঘিভাত পরিবেশন করেন। এত পর্যন্ত তো আমরা অনেকেই জানি কিন্তু আমার পিসি শাশুড়ি করলেন কি তিনি আমাকে এসে বললেন যে," আজ তোমাকে ইচোর চিংড়ি রাঁধতে হবে"-- আমি তো শুনেই থ' যেটা স্বাভাবিক ভাবেই হয়। ভয় পেয়ে তখন আমার গা থেকে জল পড়ছে যেন স্নান করে গেছি, মুহূর্তের মধ্যেই ওঁর গমগমে গলার আওয়াজ মিইয়ে গিয়ে শান্ত একটি নদীর মতন হয়ে গেল। বললেন "আমি তোমায় শিখিয়ে দেবো তুমি সকলের জন্য এঁচোড়চিংড়ি রান্না করবে এবং সেটা এবেলাই। তাই শাড়ি পাল্টে তুমি রান্নাঘরে চলে এসো", বাকিটা বলছি। আগে রান্নাটা সেরে নিই।

সেদ্ধ করা এঁচোড় জল ঝরিয়ে একদিকে রেখে দিয়ে গ্যাস ওভেনে কড়াই বসান। পর্যাপ্ত পরিমাণে সর্ষের তেল দিন। আলু ভাজুন লাল করে। চিংড়িমাছ ভেজে নিন নুন হলুদ দিয়ে। মনে রাখতে হবে এই মাছ একদমই কড়া করে ভাজা চলে না। তাতে ছিবড়ে হয়ে যাবার আশংকা থাকে। যাস্ট তেলে ফেলে স্যতে করে নেওয়া আর কি। এইসময় কেটে রাখা পেঁয়াজ থেকে এক ভাগ নিয়ে তার সাথে রসুন আদা কাঁচালংকা সব মিশিয়ে শিলে বেটে নিন বা মিক্সিতে একটা স্মুদ পেস্ট তৈরি করে নিন। এবার পরের স্টেপ। আবার কিছুটা তেল দিন কড়াইতে, গরম হলে ফোড়নে দুটো তেজপাতা দুটো ফাটানো এলাচ দু'টুকরো দারচিনি একটা লবঙ্গ অল্প গোটা জিরে এবং অবশ্যই কয়েক দানা চিনি। গন্ধ বেরোতে শুরু হলে কেটে রাখা পেঁয়াজ, পেঁয়াজ বাদামী রঙ হতে শুরু করলে বানিয়ে রাখা পেঁয়াজ-আদা-রসুনের পেস্টটা দিয়ে দিন। অল্প কষিয়ে তেল বেরোতে শুরু করলে দিয়ে দিন জিরেবাটা এবং শুকনো লংকাবাটা। গ্যাস কমিয়ে দিন, আস্তেধীরে কষুক,এই রান্নাটা পুরোটাই দাঁড়িয়ে আছে কষানোর ওপর। মশলা কষুক, এবার সেই গল্পটা শেষ করি বরং। তো যা বলছিলাম, বিয়ে হয়ে আসার পরদিনই সকালে রান্নাঘরে গেলাম। একটা উঁচু পিঁড়ি দিলেন তিনি। এখন তো আর পিঁড়ির চলই নেই,কিন্তু আমি বলছি অনেক আগের কথা,তখন প্রতি বাড়িতে একটি পিঁড়ি থাকত। তা বসেছি,উনি ধরিয়ে দিলেন এক কেজি বাগদা চিংড়ি। বাছতে হবে। আমি জানি না বলায় নিজে হাতে শিখিয়ে দিলেন। আমি মাছ বাছছি উনি বলে চলেছেন জীবনের গল্প। একটা সময় এলো যখন ওঁর এঁচোড় সেদ্ধ আলুভাজা কমপ্লিট কিন্তু চিংড়ি বাছা হয় তো নি ই উপরন্তু আমার হাতে মাছের শিরকাঁটা ফুটে হাত থেকে রক্ত। এই রক্তের ইতিহাসই বলছিলাম এতক্ষণ। তা হাত ধুয়ে বোরোলিন লাগিয়ে দিলেন উনি, বাঁহাত কেটেছিল বলে বললেন,"ডান হাতে কি রান্না শিখবা?জীবন তো প্রতিদিনই একটু কইর‍্যা কাটবো"। আমি বললাম শিখব। পারব আমি। সেই শুরু। আজও চলছে। এরপর ওঁর অত্যন্ত স্নেহভাজন হয়ে উঠেছিলাম, কত কত পূর্ববঙ্গীয় পদ যে শিখেছি তার অন্ত নেই। যাক গল্প হল। বাদবাকি রান্নাটা এবার শেষ করার পালা।

কষানো হয়ে গেলে এবার তাতে সেদ্ধ এঁচোড় ভাজা আলু এবং ভেজে রাখা চিংড়ি দিয়ে ক্রমাগত এমনভাবে নাড়তে হবে যেন সব্জি বা মাছ কিছু কেটে কেটে না যায় অথচ নাড়ার মাঝেমাঝে অল্প অল্প করে জল দিয়ে আরও পনের মিনিটের জন্য কষাতে হবে। এবার দিতে হবে এক চামচ চিনি , গরমমশলাবাটা এবং অবশ্যই চার চামচ ঘি। একটা বড় থালা দিয়ে চাপাঢাকা দিয়ে রাখুন অন্তত মিনিট পাঁচেক।

তৈরি হয়ে গেল অথেনটিক এঁচোড়চিংড়ি



147 views0 comments

Recent Posts

See All

কলকাতা মানেই কালী। আর তাই কালী কলকাত্তাওয়ালী। প্রচলিত এই বাক্যবন্ধই বুঝিয়ে দেয় যে কলকাতা আর কালীর সম্পর্ক কতটা প্রাচীন। কিন্তু কোথায় সেই কলকাতার কালী। জঙ্গলাকীর্ণ কলকাতায় কালীই পূজিতা। আর সেক্ষেত্রে য