মন্দির নগরী বিষ্ণুপুর

Updated: 2 days ago

#মন্দির_নগরী_বিষ্ণুপুর

Watch the video in this link👇👇

https://youtu.be/XKSOW8SZ9_U

লকডাউন,করোনা...এসব ঝঞ্ঝাটকে দূরে

সরিয়ে রেখে জীবনের একঘেয়েমি অবস্থা কাটানোর জন্য জীবন-মৃত্যুকে পায়ের ভৃত্য করে ভাবনাহীন চিত্ত নিয়ে স্বল্প অবসরেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম এক অতি পরিচিত ঐতিহ্যমণ্ডিত স্থানের উদ্দেশ্যে। কোলকাতা থেকে প্রায় ১৫০কিলোমিটার দূরত্ব হলেও আমাদের মেদিনীপুর শহর থেকে মাত্র ৭৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত মন্দির নগরী বিষ্ণুপুর।



প্রাচীন মল্লভূম রাজ্যের এই রাজধানী শহরে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে গড়ে উঠেছিল একাধিক মন্দির।

যাহোক, এদিন সকাল সকাল উঠেই আমরা রওনা হলাম। বাইকে করে পৌঁছাতে প্রায় ঘন্টা দুয়েক সময় লাগলো আমাদের। তারপর বিষ্ণুপুর পৌঁছে আমার কোলকাতার স্কুলের একজন স্যারকে ডেকে নিলাম। তাঁর বাড়ি ওখানেই। প্রায় ছ-সাত বছর পর তাঁর সঙ্গে দেখা...সারাদিনের সকল কাজকর্ম ফেলে উনি এক কথাতেই চলে এলেন আমাদের "ট্যূর-গাইড" হতে।


প্রথমে আমরা এলাম রাসমঞ্চে। কারণ এখানেই টিকিট কাটতে হয়। রাসমঞ্চ, জোড় বাংলা ও শ্যামরাই...এই তিনটি মন্দিরে ঘোরার জন্য টিকিট লাগলেও অন্যান্য মন্দিরগুলিতে প্রবেশ অবাধ।

এখানে এসে জানতে পারলাম,এখানকার মন্দির গুলিতে ছবি তোলার পারমিশন থাকলেও ভিডিও করার কোনো পারমিশন নেই। যাহোক, এতসব নিয়মের বেড়াজাল আমার ফোনের ক্যামেরা মানতে নারাজ। তাই সে কখনো কখনো নিরাপত্তারক্ষীদের

দৃষ্টিকে ফাঁকি দিয়েছে।

ল্যাটেরাইট পাথরে তৈরী প্রশস্ত ভিত্তিবেদীর উপর প্রতিষ্ঠিত এই রাসমঞ্চটি একটি অভিনব স্থাপত্য শৈলীর নিদর্শন।

১৬০০খ্রিষ্টাব্দে মল্লরাজ বীর হামবীর-এর সময়কালে এটি নির্মিত । মন্দিরটি বর্গাকার, প্রতি বাহু ২৪.৫ মিটার , উচ্চতা ১২.৫ মিটার। এমন স্থাপত্য ভারতবর্ষেও বিরল। এর চূড়াটি মিশরের পিরামিডের আকার বিশিষ্ট। ১৬০০-১৯৩২ সাল পর্যন্ত এখানে মহা সমারোহে পালিত হতো রাসোৎহব। উৎসবের সময় বিভিন্ন মন্দির ও রাজবাড়ি থেকে মল্ল রাজবংশের পূজিত ১০৮টি মূর্তি এখানে আনা হতো।

কিন্তু বর্তমানে এটি শুধুমাত্র প্রাচীন ইতিহাসের সাক্ষী হিসাবে দণ্ডায়মান।


এরপর আমরা চলে এলাম 'জোড়-বাংলা' মন্দিরে। বিষ্ণুপুরের সর্বশ্রেষ্ঠ মন্দিরগুলির অন্যতম এই মন্দিরটি ১৬৫৫ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ দ্বারা স্থাপিত। বর্গাকার উঁচু ভিত্তির উপরে পরপর দুটি দোচালা কুটিরের সংযুক্তিতে এটি গঠিত এবং সংযুক্তি স্থলের মধ্যভাগে একটি চারচালা শিখর রয়েছে । কৃষ্ণলীলা, রামায়ন, মহাভারত, পৌরাণিক কাহিনী, শিকার দৃশ্য, সমসাময়িক সমাজচিত্র অত্যন্ত কুশলতার সঙ্গে পোড়ামাটির ভাস্কর্যে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে মন্দিরগাত্রে।  


"জোড়-বাংলা" মন্দির দেখে আমরা চলে এলাম শ্যামরাই মন্দিরে। এটি একটি পঞ্চরত্ন মন্দির।১৬৪৩ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজ রঘুনাথ সিংহ এটি নির্মাণ করেন । রামায়ণ,মহাভারতের কাহিনী, রাসচক্র ইত্যাদি চিত্র মন্দিরটির গায়ে সুন্দরভাবে খোদাই করা আছে।  

শ্যামরাই মন্দির দেখে ফেরার পথে দেখতে পেলাম একটি দরজা-জানলা বিহীন চৌকো ঘর। নাম গুমঘর বা গুমগড়। অনেকের মতে,এখানে

যুদ্ধাপরাধীদের ও সাধারণ অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতো। কেউ কেউ বলেন, এটি রাজার শস্যভাণ্ডার ...কারুর মতে, এটি রাজ পরিবারের জল-ট্যাঙ্কি। যাহোক, আজও সেই রহস্যাবৃত গুমঘর স্বমহিমায় তার আপন অস্তিত্বকে টিকিয়ে রেখেছে ।


এরপর আমরা চলে এলাম রাধাশ্যাম মন্দিরে। এটি ১৭৫৮ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজ চৈতন্য সিংহ দ্বারা স্থাপিত বর্গাকৃতি একরত্ন মন্দির । মন্দিরটি প্রাচীর বেষ্টিত ও প্রশস্ত অঙ্গনের ভিতরে অবস্থিত । পাশের ভগ্নপ্রায় মন্দির থেকে বিগ্রহ তুলে এনে এই মন্দিরে রাখা হয়েছে । এখনো নিয়মিত পূজার্চনা হয় এই মন্দিরে।

রাধাশ্যাম মন্দিরের সামনেই রয়েছে মৃন্ময়ী মায়ের মন্দির । মল্লরাজ জগৎ মল্ল বিষ্ণুপুরে রাজধানী স্থানান্তরিত করার পর ৯৯৭ খ্রিস্টাব্দে দেবী দুর্গার উদ্দেশ্যে এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন । সেই সময় থেকে এই মন্দিরে এখনো পুজো চলছে ।

স্থানীয় ইতিহাস অনুসারে, মা মৃন্ময়ী স্বপ্নে রাজাকে মন্দির তৈরির নির্দেশ দিয়েছিলেন। দেবী দুর্গা এখানে মা মৃন্ময়ী হিসাবে পূজিতা হন। মন্দিরটি পুনর্গঠন করা হলেও গঙ্গা-মাটির তৈরি সেই মূর্তিটি রয়ে গেছে আজও।

১০২৩ বছরের পুরানো এটি বাংলার প্রাচীনতম দুর্গা পূজা। মাটির পাত্র বা ঘট স্থাপনের পরে যথাক্রমে 'বড়ো ঠাকুরানী', 'মেজো ঠাকুরানী' এবং 'ছোট ঠাকুরানি'র উপাসনার মধ্য দিয়ে উৎসব শুরু হয়। এখানকার মূর্তিটিও বিশেষ বৈশিষ্ট্যের দাবিদার। প্রতিমার কাঠামোর দুর্গা মূর্তির উপরের দিকে থাকে গণেশ ও কার্ত্তিকেয় এবং নিচে থাকে লক্ষ্মী ও সরস্বতী। প্রতিমার পেছনে পটে আঁকা কোনো চালি থাকে না। পরিবর্তে মহাদেব তার দুই অনুচর নন্দী ও ভৃঙ্গির সাথে প্রতিমার কাঠামোর উপরে অবস্থান করেন। 

'মহাষ্টমী-সন্ধিপূজা' এর পবিত্র মুহূর্তে একটি কামান নিক্ষেপ করা হয় এবং তারপরে সবজী বলি দেওয়া হয়।

(প্রসঙ্গত,মল্ল রাজারা মল্লাব্দ বা মল্ল সাল চালু করেন। যা খ্রিস্টাব্দ থেকে ৬৯৪ বছর পিছিয়ে আছে।)

পথে যেতে যেতে প্রাচীন রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখতে পেলাম ...আগাছাবৃত ঝোপ-জঙ্গলের মাঝে যা আজও নিশিদিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লক্ষ্যে লড়াই করে চলেছে।

তারপর লালজী মন্দির দেখে আমরা এগিয়ে গেলাম গড়-দরজা বা পাথর দরজার অভিমুখে। ল্যাটেরাইট বা মাকড়া পাথর দিয়ে তৈরি পুরানো দুর্গের উত্তরমুখী এই দরজাটি সপ্তদশ শতকে মল্লরাজ দ্বিতীয় বীর সিংহ দ্বারা স্থাপিত । দ্বিতল এই গড়দরজার মাঝখানের পথটির দুইদিকে সৈন্যদের থাকার ব্যবস্থা ছিল । শত্রুপক্ষ আক্রমণ করলে এর দেয়ালে অবস্থিত ছিদ্রগুলির মধ্য থেকে তির ও গোলা ছোঁড়া হতো।

এর পাশেই রয়েছে 'ক্ষুদ্র প্রবেশ তোরণ'। ল্যাটেরাইট পাথর দিয়ে তৈরি এই প্রবেশপথটি পুরোনো দুর্গের উত্তর ভাগে অবস্থিত । সপ্তদশ শতকে এটি তৈরি করেন মল্লরাজ বীর সিংহ ।

এরপর অঙ্কুর স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী আমরা গেলাম মদনমোহন মন্দিরে।মল্ল রাজা দুর্জন ​​সিংহ দেব ১৬৯৪ সালে ভগবান মদন-মোহন-এর নামে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এটি আজ অবধি একটি সক্রিয় মন্দির।


লালমাটির দেশে পথের ক্লান্তিকে তুচ্ছ করে খরতর রোদ্দুরকে মাথায় করে এতক্ষণ আমরা মন্দির দেখতে দেখতে ক্ষুধা-তৃষ্ণার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। যাহোক,'পোকাবাঁধ' দেখার পর স্থানীয় একটি হোটেলে মধ্যাহ্ন ভোজন পর্ব সেরে একটু বিশ্রাম নিতে আমরা চলে গেলাম লালবাঁধের পাড়ে।

মল্লরাজধানী বিষ্ণুপুরকে সুরক্ষিত রাখতে রাজবাড়িকে ঘিরে পরিখা খনন করেছিলেন মল্লরাজারা। এই অঞ্চলে লালবাঁধ ও পোকাবাঁধসহ মল্লরাজাদের সময় খনন করা সাতটি বাঁধ রয়েছে। শত্রুপক্ষ আক্রমণ করলে এই বাঁধগুলি থেকে জল ছেড়ে দেওয়া হতো পরিখায়। এই বাঁধগুলির মধ্যে লালবাঁধ সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য।

লোককথা অনুযায়ী,রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ বরদার বিদ্রোহী রাজা শোভা সিংহকে যুদ্ধে পরাজিত করে লুণ্ঠীত সামগ্রীর সাথে লালবাঈ নামে এক সুন্দরী মুসলমান রমণীকে নিয়ে আসেন। লালবাঈ-এর রূপে মুগ্ধ হয়ে রাজা তার প্রেমে পড়লে রাণী চন্দ্রপ্রভা তা মেনে নিতে পারেননি। অবশেষে রাণী ষড়যন্ত্র করে রাজা রঘুনাথ সিংহ ও তাঁর প্রেমিকা লালবাঈকে এই বাঁধেই ডুবিয়ে মারেন এবং রাজার সহমৃতা হন। এজন্য লোকে তাঁকে 'পতিঘাতিনী সতী' নামে অভিহিত করেন। বিশেষ বিশেষ দিনে গভীর রাতে সেই করুণ ঘটনার ক্রন্দন নাকি আজও শোনা যায় এই লাল বাঁধের পাড়ে।

স্যারের কাছে শুনলাম,এই লালবাঁধেই বর্ষবরণ উপলক্ষে একজন লোক বর্ষসংখ্যার সমসংখ্যক ডুব দিয়ে বর্ষবরণ করে থাকেন প্রতিবছর। এখানকার মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশকে উপলব্ধি করার পর আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম অবশিষ্ট মন্দিরগুলি দেখার জন্য।

সর্ব্বমঙ্গলা মন্দির দর্শন করার পর আমরা চলে এলাম ছিন্নমস্তা মায়ের মন্দির দেখতে। ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মেদিনীপুরের বিখ্যাত ব্যবসায়ী কৃষ্ণচন্দ্র গুঁই এটি প্রতিষ্ঠা করেন। দুপুর একটা থেকে তিনটে পর্যন্ত বিশ্রামের জন্য মায়ের মন্দির বন্ধ থাকে ।

এই মন্দিরের অনতিদূরেই রয়েছে বিখ্যাত দলমাদল কামান।

৩.৮মিটার লম্বা , প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার ব্যাস বিশিষ্ট, ১১২ কুইন্ট্যাল ওজনের লোহার তৈরি এই দলমাদল কামানটি মল্লরাজাদের সময়ের সবথেকে বড়ো কামান..."দলমর্দ্দন" কথা থেকেই দলমাদল নামটি এসেছে । ৬৩টি লোহার রিং পেটাই করে এটি তৈরী করা হয়।প্রচলিত লৌকিক উপাখ্যান অনুযায়ী, মল্লরাজ গোপাল সিংহের আমলে রাজপরিবার ও নগরের রক্ষাদেবতা মদনমোহন বা ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং বর্গী সেনাপতি ভাস্কর রাওয়ের বিরুদ্ধে এই কামান ব্যবহার করেছিলেন ।


এরপর আমরা পৌঁছে গেলাম পোড়ামাটির হাটের ময়দানে। এখানেই রয়েছে জোড়মন্দির শ্রেণীর তিনটি মন্দির । ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দে মল্লরাজা কৃষ্ণ সিংহের সময়ে এই মন্দির তিনটি তৈরি হয় । বাংলার ঢালু চালযুক্ত ও উত্তর ভারতের শিখর বিশিষ্ট মন্দির তিনটির গায়ে রামায়ন ও কৃষ্ণলীলার বিভিন্ন ভাস্কর্য রয়েছে । 


এই জোড় মন্দিরশ্রেণীর চত্বরে প্রতি শনিবার "পোড়ামাটির হাট" বসে । তবে বিগত কয়েকমাস লকডাউনের জেরে সেসব এখন অতীত। আশা করা যায়,অদূর ভবিষ্যতে এই হাট পুনরায় প্রাণোচ্ছল হয়ে উঠবে।


দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেলো..তবু এখনো বহু মন্দির অদেখা রয়ে গেলো।

পথে যেতে যেতে দেখতে পেলাম নন্দলাল মন্দির ও রাধাগোবিন্দ মন্দির । পশ্চিমবঙ্গের যাবতীয় টেরাকোটা মন্দির গুলির মধ্যে শিল্প নৈপুণ্যে এগুলো শ্রেষ্ঠত্বের দাবিদার। ১৭২৯ খ্রিস্টাব্দে গোপাল সিংহের পুত্র কৃষ্ণ সিংহ রাধাগোবিন্দ মন্দিরটি তৈরী করেন । রাধাগোবিন্দ মন্দিরের সামনে রয়েছে রাধা মাধব মন্দির ও তার পাশে ASI এর অফিস । ASI অফিস চত্বরের মধ্য দিয়ে গিয়ে একেবারে শেষ প্রান্তে পাবেন কালাচাঁদ মন্দির(১৬৫৬ খ্রিস্টাব্দ) ।এই মন্দিরগুলির দেওয়ালে দশাবতার সহ তৎকালীন সমাজব্যবস্থার বিভিন্ন চিত্র খোদাই করা আছে। তবে আজ সেগুলির বেশিরভাগটাই প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত।

যাহোক, অনেক স্মৃতি সঙ্গে নিয়ে সন্ধ্যার আগে আমরা প্রত্যাবর্তন করলাম মন্দির নগরী থেকে । অনেক কিছুই অদেখা রয়ে গেলো...যা ভবিষ্যতে আরেকবার এই বিচিত্র বিষ্ণুপুর ঘুরে আসার ইন্ধন যোগাবে।


https://youtu.be/XKSOW8SZ9_U


–:–





197 views

Recent Posts

See All

"হে মাতঃ!প্রণমি তব পদে"

★দেবীপক্ষের সূচনালগ্নে বিশেষ অনুষ্ঠান... #মহালয়া_২০২০ ★ভাষ্যরচনা,ভাষ্যপাঠ ও শ্লোকপাঠে: মোহন গায়েন 🎧Click here to listen in YouTube👇 https://youtu.be/kBmbOecmSOU ★Click here to listen(#mp3_version)

Subscribe to Our Newsletter

  • White Facebook Icon

© 2023 Powered by Maiti Infomedia Pvt Ltd.