স্বাধীনতা

(চয়নিকা)


১) ছেলেকে দিয়ে আসার সময় গাড়ি থেকে প্রতিদিন মৌসুমি রত্নাকে দেখে। স্ট্যান্ডের টোটোওয়ালাদের সাথে নিজের টোটো নিয়ে বসে থাকে। কোনোদিন লোক তুলতে ব্যস্ত থাকে, কোনো কোনোদিন অন্য টোটোওয়ালাদের সাথে গল্প জুড়ে অসভ্যের মতো হাসে। রত্নার বরও টোটো চালায়, অন্য স্ট্যান্ডে দাঁড়ায়, মৌসুমি চেনে ছেলেটাকে, ওদের পাড়ায় রিক্সা চালাত । এই স্ট্যান্ডে লোক নামাতে এলে সেও খানিক গল্প করে চা খেয়ে যায় বউ আর তার বন্ধুদের সাথে। দেখে মৌসুমির বিরক্ত লাগে, গা জ্বলে যায় পুরো।  রত্না মৌসুমিদের স্কুলেই পড়তো। রত্নার মা লোকের বাড়ি কাজ করতো, মৌসুমিরা তাই ওর সাথে মিশত না। স্কুলে মৌসুমি বেশ ভালো ফল করতো, রত্নাও খুব একটা কম পেত না। স্কুল শেষ করে রত্না আর্টস নিয়ে কলেজে ভর্তি হয়, আর মৌসুমি সাইন্স নিয়ে। মৌসুমি কোনোদিন মিশত না রত্নার সাথে, পছন্দ করতো না একদম, তবু দেখত ওকে, খবর রাখত কোনো অজানা কারণে। বিএসসি পাশ করে মৌসুমি ভর্তি হল এমএসসি-তে। কলেজ ফেরত রত্নাকে একদিন দেখল একমাথা সিঁদুর পরে ওপাশ দিয়ে যাচ্ছে। রত্না প্রতিবারই মৌসুমিকে দেখে হাসার চেষ্টা করে, কিন্তু মৌসুমি মুখ ফিরিয়ে নেয়। বেশ কিছুদিন পরে ওই বন্ধুবান্ধবিদের সাথে কথা বলতে বলতে জানতে পারলো, পাশের পাড়ার রিকশাওয়ালা রাজুকে পালিয়ে বিয়ে করেছে ওদের স্কুলের রত্না, সঙ্গে এটাও জানলো, রত্নাও নাকি এমএতে ভর্তি হয়েছে, শুনে কিছুটা অবাক হল মৌসুমি। তারপর ভাবল, ছোটোলোকের কাজ কারবারের কোনো ঠিক নেই। এমএসসি শেষের আগেই মৌসুমির বিয়ে হলো এই অঞ্চলের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে অঞ্জনের সঙ্গে। বিয়ের পরে প্রথম প্রথম কলেজ গিয়েছিলো ক’দিন। তার কলেজ যাওয়া যে ওই বাড়িতে পছন্দ না সেটাও বুঝতে পারতো। একদিন রাতে চরম আদরের মাঝে হঠাৎই অঞ্জন বলেছিল, “কী দরকার তোমার কলেজ যাওয়ার, পড়ে কোন জর্জ ব্যারিস্টার হবে? বাড়িতেই তো থাকবে সেই। তার থেকে বরং মায়ের সঙ্গে সঙ্গে থেকে সংসার করাটা শেখো। মা কে সাহায্য করো, মায়ের তো বয়েস হচ্ছে নাকি। কাল থেকে আর কলেজ যাওয়ার দরকার নেই। পরীক্ষাটা চাইলে দিতে পারো বাড়িতে পড়ে। কিন্তু ধিং ধিং করে কলেজ যেতে হবে না, বুঝলে।” সেদিনের পর মৌসুমির শরীরে আর ভালোবাসা আসেনি, শুধু অঞ্জনের খিদে মিটিয়েছে। পরীক্ষাটাও মৌসুমি দেয়নি, বেকার পড়ে কি আর হতো তাই পড়াশোনা ওখানেই ইতি হয়েছিলো। অঞ্জনদের বাড়ি মৌসুমিদের বাড়ি থেকে খুব বেশি দূরে না, মিনিট পনেরো হাঁটা পথ। তবে মৌসুমির বাপের বাড়ি যাওয়ার অনুমতি নেই। অঞ্জনদের বাড়ির বউদের বাপের বাড়ি যাওয়া মানে বছরে দুবার, একবার পয়লা বৈশাখ আর একবার বিজয়া দশমী, সেটাও স্বামীর সাথে কয়েকঘণ্টার জন্য। মৌসুমির প্রথম প্রথম খুব মন খারাপ করতো, মৌসুমির মা-বাবাই আসতো দেখতে মাসে দুমাসে একবার করে। একদিন মৌসুমির শ্বশুরমশাই মৌসুমির বাবাকে ভদ্রতা মিশিয়েই বললেন, “বেয়াইমশাই আপনার মেয়েকে তো আমাদের বাড়ি পাঠিয়েছেন, আমরা তো মেরে ফেলছি না, সে তো দেখছেনই। এতো ঘন ঘন এলে তো মেয়ের এই সংসারে মন বসবে না। আপনি আসছেন বলে রাগ করছি না, আপনার মেয়ের ভালোর জন্যই বলছি। বাড়িতে তো ফোন আছেই, ফোন করে খবর নেবেন না হয় মাঝে মাঝে।”ওই ঘটনার পর থেকে মৌসুমির মা-বাবা কখনো পা দেয়নি ওই বাড়িতে। মৌসুমিও মানিয়ে নিয়েছে শ্বশুরবাড়ির সাথে। টাকা পয়সা লোকজনের অভাব নেই কোনো, একরকম মহাবিলাসিতাতেই থাকে মৌসুমি। ছেলে হওয়ার পর থেকে তো বাড়িতে মৌসুমির সন্মানও বেড়েছে অনেকটা। তার আগে অবশ্য বার দুই গর্ভপাত করতে হয়েছে, পেটেরগুলো মেয়ে ছিল বলে। (২) আজ টোটো স্ট্যান্ডের সামনে এসেই গাড়ি খারাপ হল, নিয়তি আর কাকে বলে। মৌসুমি মোটেও রত্নার মুখোমুখি হতে চায় না। রত্না মেয়েটা প্রথম থেকেই গায়ে পড়া, দেখলেই কথা বলতে চলে আসবে। অত বড় ব্যবসায়ী তার স্বামী, এরকম টোটোওয়ালাদের সাথে কথা বলা তার মানায়! মৌসুমি ভেবে পাচ্ছিলো না কী করবে, ড্রাইভার বলছে সারাতে সময় লাগবে। বাবানকে আবার টিউশন পড়াতে আসবে খানিক পরেই, বাড়ি না গেলেই তো নয়। অগত্যা মৌসুমি গাড়ি থেকে নেমেই পড়লো, টোটো ধরবে বলে। যা ভেবেছিল তাই! ওকে নামতে দেখেই রত্না টোটো নিয়ে এগিয়ে এলো। -কি রে, বাড়ি যাবি তো? নে ওঠ। আমি তোর বাড়ি চিনি, চল নামিয়ে দিচ্ছি। -না না ঠিক আছে, আমরা চলে যাবো। -আরে টাকা দিতে হবে না, চল তো। - আরে না রে। (আদিখ্যেতার শেষ নেই, আমায় টাকার গরম দেখাচ্ছে, আমার স্বামী তোর মতো দশটা টোটোওয়ালা কিনতে পারে।) -কী রে! কী এতো ভাবছিস? ওঠ, তোর দেরী হয়ে যাচ্ছে তো? - চল তাহলে। টাকা কিন্তু আমি দেবো। (নেহাত ছেলেটার পড়া আছে, নাহলে তোর পাল্লায় পরতাম না।) - জানি রে, তোর বরের অনেক টাকা, মস্ত ব্যবসায়ী। কিন্তু তোর টাকা ফুরিয়ে গেলেই তো আবার হাত পেতে চাইতে হবে। দুটো কথা শুনতে হবে। তুই আমার ইস্কুলের বন্ধু, আমার জন্য তোর অপমান হোক সেটা আমি কী চাইব? ওই বাড়ির লোকজন যে সুবিধের না সে এলাকার সবাই জানে। - তোকে এসব ভাবতে হবে না। আমার বর এরকম না। (দু পয়সার টোটো চালিয়ে আমায় দয়া দেখাতে এসেছে, সাহস মন্দ না। আমার বর আমার থেকে টাকার হিসাব চায় তাতে তোর কী? তোর বরের তো খাওয়ানোর মুরোদ নেই, টোটো দিয়ে স্ট্যান্ডে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। লজ্জা সরমের মাথা তো খেয়েছিস এখন এসেছিস আমায় জ্ঞান দিতে। উফফ... অসহ্য।) - জানিস আমি এমএটা শেষ করে ফেলেছি। বিয়েটা করে ভর্তি তো হলুম কিন্তু পরীক্ষা দেওয়া হল না এক বছর, তারপরের বার পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে গেলাম। -বাঃ, ভালো তো...।(এমএ পাশ করে টোটো চালাচ্ছে আবার বড় বড় কথা।) -তুই ভাবছিস তো এমএ করে টোটো চালাই। আরে আমি সরকারী পরীক্ষার ফর্মও ভরেছি অনেকগুলো। আমার ইচ্ছা ছিল না খুব একটা। এই তো বেশ টোটো চালাই, বাড়িতে মেয়েটাও বড় হচ্ছে। কিন্তু রাজু নাছোড়বান্দা, বলে ‘রত্না আমি তো পড়াশোনা করিনি, তুই পড়েছিস, তুই চাকরীর পরীক্ষাগুলো দে’। একটা না একটা চাকরী নিশ্চয়ই পাবো বল! - ভালোই তো। নিশ্চয়ই পাবি।(যত নাটক, টোটো চালিয়ে নাকি সরকারী চাকরী... দিবাস্বপ্ন আর কাকে বলে!) - আমার মেয়েটার এইবার পাঁচ হল বুঝলি, তোর ছেলে যে ইস্কুলে যায় সেখানের ফর্মও তুলেছি, এবার তো ওর ভর্তির সময় হয়ে এলো। - ও, তাই নাকি! (সাহস কত মেয়েটার, আমার ছেলের স্কুলে নাকি ওর মতো একটা মেয়ের বাচ্চা পড়বে! এদের সাহস দেখে অবাক হতে হয়। সব সময় আমাদের সমান হওয়ার ইচ্ছা। অঞ্জন ঠিকই বলে যারতার সাথে কথা বলতে নেই। ) রত্নার একতরফা কথাতেই গোটা রাস্তা ফুরিয়ে গেলো। মৌসুমি বাড়ি ঢুকতেই দেখে সোফায় গম্ভীর মুখে শ্বশুরমশাই বসে। মৌসুমি ঢুকতেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন- - গাড়ি কী হল বৌমা? - বাবা গাড়ি তো খারাপ হয়ে গেছে বাড়ি থেকে একটু দূরে। - আমি জানি সেটা। তোমরা কী ভাবে এলে? - ওই স্ট্যান্ডে টোটো ছিল, টোটোতে এলাম। - কেন? গাড়িতে অপেক্ষা করা যেত না? কীসের এতো তাড়া? ওই স্ট্যান্ডের টোটোওয়ালাদের সাথে গল্প করার যখন এতো শখ তাহলে তো ওরকম বাড়ি দেখেই বিয়ে করতে পারতে। - বাবা, আপনি ভুল বুঝছেন, আমি গল্প করিনি, একটা টোটো নিজেই এগিয়ে এলো। বাবানের তো পরীক্ষা সামনে, আজ পড়াতে আসবে, তাই তাড়াতাড়ি আসার জন্য টোটো ধরতে হল। - দেখো বৌমা, অজুহাত দিও না। আমিও ছেলে মানুষ করেছি, যথেষ্ট ভালো মানুষ করেছি। একদিন ছেলের পড়া না হলে খুব ক্ষতি হয় না। ওই নোংরা মেয়েটা তোমায় নাকি তুই তুই করে কথা বলছিল। লজ্জা করেনা তোমার? কী ভাবো আমি খবর পাইনা কিছু? - বাবা আপনি যা ভাবছেন তা না, আসলে ওই মেয়েটা আমাদের স্কুলে পড়তো। - কী বললে? ওই মেয়ে তোমার স্কুলে পড়তো? ছিঃ ছিঃ ছিঃ। সুবোধ ঠিক বলেছিল, ছোটো বাড়ি থেকে মেয়ে আনা আমার একদম উচিৎ হয়নি। এই তার ফল। টোটোওয়ালা বেহায়া একটা মেয়ে, সে নাকি স্কুলের বন্ধু। লজ্জা শরমের তো আর বাকি কিছু রাখলে না। - বাবা বন্ধু না, একসাথে পড়তো। আমি ওর সাথে মিশতাম না।  - থাক, আর বাহানা দিতে হবে না। যা বোঝার আমার বোঝা হয়ে গেছে। বন্ধু না তাতেই গোটা রাস্তা গল্প করে করে এলে। বন্ধু হলে তো মনে হয় ওই নোংরা মেয়েছেলেটার বাড়িতেই চলে যেতে। যাও নিজের ঘরে যাও, বাকি যা বলার অঞ্জন আসুক, ও নিজেই বলবে। মৌসুমি জানে অঞ্জনের বলা মানে মুখে নয়, বেল্টে। তার এক মুহূর্তে মনে হল, রত্না তার থেকে অনেক সুখে আছে, অনেক স্বাধীন, তারপর নিজেই নিজের মনকে বোঝাল, কখনোই হতে পারে না, কোনো চালচুলো নেই ওর, কতই বা রোজগার করে ও আর ওর বর মিলে ওই টোটো চালিয়ে! মৌসুমি ঢের সুখে ওর চেয়ে। কত বড় বাড়ির বউ, কত টাকা পয়সা ওদের, কত দামী পোশাক পরে মৌসুমি নিজে। গাড়ি ছাড়া তো কতদিন পরে রাস্তায় নামলো আজ, সেটা মনেও করতে পারলো না। খুব আরামে আছে মৌসুমি, খুব। সুখী মৌসুমি এসব ভাবতে ভাবতেই চোখ থেকে দু’ফোঁটা জল মাটিতে পড়লো। চয়নিকা

ঠিকানাঃ ৬২/৯ শরৎ চ্যাটার্জি রোড, সাঁতরাগাছি, হাওড়াঃ ৭১১১০৪

4 views

Subscribe to Our Newsletter

  • White Facebook Icon

© 2023 Powered by Maiti Infomedia Pvt Ltd.