গীর্জার শহর (কলকাতার ইতিহাস পর্ব ২)

কলকাতা। এক আশ্চর্য শহর। তিলোত্তমা মহানগরী। কিন্তু কে হাতে করে তৈরি করলো আমাদের এই শহর? বেনিয়া ইংরেজের জাত নাকি তাদের আগে শহরে আসা আর্মেনীয় অধিবাসীরা? কলকাতা শহরের মধ্যে শুয়ে আছে আরও একটা পুরনো কলকাতা। যার সময়ের হিসাব করা দায়৷ একসময় দাপিয়ে বেড়ানো ইংরেজরা প্রাণ খুলে সাজিয়েছিল শহর কলকাতা কে । কি নেই সেখানে? শহরের প্রথম গির্জা আর্মেনীয়দের তৈরি হলেও পরবর্তীতে ১৭৭০ সালে ইংরেজদের হাত ধরে সুইডিশ মিশনারী জোহান জাকারিয়া কিয়ার্নান্ডার উদ্যোগেই তৈরি হয় ওল্ড মিশন চার্চ। ডালহৌসির কাছেই আর এন মুখার্জি রোডে আজও পুরনো স্মৃতি নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে এই চার্চ। কিন্তু চতুর্পাশে আগাছার মত গজিয়ে ওঠা দোকান। যদিও পুরনো দিনে ওল্ড মিশন চার্চ নাম ছিল না। তখন নাম ছিল মিশন চার্চ ও লাল গীর্জা। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে পুরাতনী রং লেগেছে চার্চের পাথরেও, আর নাম পাল্টে জুড়ে গেছে ওল্ড তকমা। পলাশীর যুদ্ধের পর কলকাতাকে নিজেদের মতো করে গুছিয়ে একেবারে জাঁকিয়ে বসতে শুরু করে ইংরেজ। পুরনো দিনের কিছু অস্থায়ী ধর্ম উপাসনার স্থান থাকলেও তার বেশির ভাগটাই ধ্বংস হয়ে যায় সিরাজের কলকাতা আক্রমণের সময়। মুর্শিদাবাদ থেকে বিশাল সৈন্যবাহিনী সমেত ইংরেজদের উচিত শিক্ষা দিতে সরাসরি কলকাতা আক্রমণ করে বসেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। সেই সময়ই ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ সমেত সমস্ত ইংরেজ উপাসনাগৃহ ধ্বংস করে দিয়ে ফিরে যান নবাব। কলকাতা পরিণত হয় একটি জীবন্ত ধ্বংসস্তূপে। কিন্তু পলাশী জয়ের পর ছবিটা একেবারে ঘুরে যায়। এই সুসময়ে তাদের আটকায় সাধ্য কার। কিন্তু মহানগরী কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা সেই মতো দেখতে গেলে ইংরেজরা হলেও আসলে এই নগরীতে ইংরেজদের বহু আগে পা পড়েছিল আর্মেনীয়দের। আর তার সাক্ষী দেয় কলকাতার সবচেয়ে পুরনো আর্মেনীয় চার্চটি যা আজও বড়বাজারের ভিড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে মাথা তুলে। চার্জটি আকর্ষণীয় হলেও এর মধ্যে সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয়টি লুকিয়ে আছে একটি সমাধির মধ্যে। সমাধিটির উপরে আজও স্পষ্ট অক্ষরে লেখা রেজাবিবির নাম। কিন্তু কে এই রেজা বিবি? সমাধির উপরের এপিটাফ থেকেই জানা যায় তিনি দানবীর সুকিয়াজের ছবি। কিন্তু আসল আশ্চর্যটি লুকিয়ে আছে এই সমাধির সময়কাল নিয়ে। রেজাবিবি মারা যান ইংরেজরা এ শহরে আসার প্রায় ৬০ বছর আগে। পরে ১৭২৪ সালে এই পুরনো কবরস্থানের জায়গায় তৈরি হয় চার্চ। আর আজও সেখানেই ইংরেজদের যাবতীয় ঔদ্ধত্যকে মিথ্যে প্রমাণ করে সেখানেই শুয়ে আছেন রেজাবিবি। এই কবরের আয়ুষ্কাল ধরলে আর্মেনীয়দেরই প্রথম কলকাতায় ইউরোপিয়ান অধিবাসী হিসেবে ধরা হয়। এরপর কি বলবেন? ইংরেজরাই কলকাতার আসল প্রতিষ্ঠাতা? মহামান্য কলকাতা হাইকোর্ট বরিশাল রায়চৌধুরীদের করা একটি পিটিশনে এই তথ্য নাকচ করে দিয়েছে। হুগলি নদীর জলপথ ধরে জব চার্নক যখন তৃতীয়বার কলকাতায় পা দেন তখন কলকাতা যে মহানগরীর রূপ পায়নি তা সবাই জানে। কিন্তু কলকাতায় যে শুধুমাত্র সুন্দরবনের একটি অজ জনবিবর্জিত একটি বনাঞ্চল ছিল সেটি ও মেনে নেওয়া যায় না। হ্যাঁ জঙ্গল তো ছিলই। ঘটনা প্রসঙ্গে চেতুয়া বরদার (এখন মেদিনীপুর) রাজা শোভা সিং এর স্ত্রী অজিতা সুন্দরী দেবীর কথা বলা যায়। শোনা যায় মহারাণীকে নাকি প্রাসাদ থেকে বার করে দিয়েছিলেন শোভা সিং। তারপর থেকে অজিতা সুন্দরী দেবী কলকাতার চৌরঙ্গীর জঙ্গলে এক সাধুর পর্ণকুটিরে বাস করতেন। ভেবে দেখেছেন একবার। আজকের রমরমে চৌরঙ্গীতে একসময় ছিল বাঘের উপদ্রব। সে যাই হোক, গোড়াপত্তন না হলেও, গ্রাম্য কলকাতা যে ইংরেজদের হাত ধরে তিলোত্তমা মহানগরীর রূপ পেয়েছে তা এককথায় স্বীকার করা যায়। প্রথমদিকে আর্মেনীয়দের একটি চার্চ থাকলেও ইংরেজদের ছিল না কোনো স্থায়ী ধর্ম উপাসনাগৃহ। ফলত সেই অর্থে ওল্ড মিশন চার্চ কেই ইংরেজদের প্রতিষ্ঠিত প্রথম চার্চ হিসেবে মান্যতা দেয়া যায়। প্রায় সকলের চোখের আড়ালে এই চার্জ আজও দাঁড়িয়ে আছে মাইকেল মধুসূদন দত্তের খ্রিস্টধর্ম গ্রহণের দিনটির স্মৃতি বুকে করে নিয়ে। কলকাতাবাসীর সমস্ত রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে ক্রিষ্টান প্রটেস্ট্যান্ট ধর্ম যাজকরা সেদিন মাইকেলকে খ্রিস্ট ধর্মে দীক্ষা দিয়েছিলেন এই ওল্ড মিশন চার্চেই। ১৭৮৭ সালে সেন্ট জনস চার্চ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অল্ড মিশন চার্চ কিছুটা উপেক্ষিত হতে শুরু করে ইংরেজদের কাছেই। সেই অর্থে ধরতে গেলে সেন্ট জনস চার্চ কলকাতার তৃতীয় প্রাচীনতম চার্চ। ঠিক রাজভবনের পাশে আজও দাঁড়িয়ে থাকা এই চার্চও আসলে একটি প্রাচীন গোরস্থান। তখনো তৈরি হয়নি সাউথ পার্ক স্ট্রিট সিমেট্রি। বিলেত থেকে আসা সাহেবরা এখানে ম্যালেরিয়া কলেরা বা গুটিবসন্তে মারা গেলে গোর দেওয়ার প্রচলন ছিল ঠিক এই স্থানে। তখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি কলকাতা। কলকাতার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে এবং তীব্র গরমে কোনদিনই সাহেবরা মানিয়ে নিতে পারেননি ঠিকমত। ফল ছিল মৃত্যু। ১৮ বছরের যুবক থেকে ৩০ বছরের তরতাজা সৈনিক - সকলেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে ছেড়ে দিত ইহলোকের মায়া। স্বভাবতই কলকাতায় প্রয়োজন পড়েছিল একাধিক কবরস্থানের। সেই রকমই একটি প্রাচীন কবরস্থান হলো সেন্ট জনস চার্চের কবরস্থান। স্বয়ং জব চার্নক থেকে শুরু করে বেগম জনসন সকলেই শুয়ে আছেন এখানে। ইংরেজ লেখকদের লিখিত তথাকথিত কলকাতার প্রতিষ্ঠাতা জব চার্নককে তো আমরা সকলেই চিনি। কিন্তু বেগম ফ্রান্সিস জনসনকে আমরা চিনি কজন৷ শোনা যায় নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে তার নাকি ছিল চোখে পড়ার মতো দোস্তি। যদিও অনেকে বলেন তাঁর চতুর্থ স্বামী কাশিমবাজার কুঠির অধিকর্তা ও কলকাতা কাউন্সিলের সদস্য উইলিয়াম ওয়াটস সাহেব নবাবের হাতে গ্রেপ্তার হলে তিনি ও তাঁর তিন পুত্রকন্যা বহুদিন নবাবের প্রাসাদে দিন কাটান। সেখান থেকেই তাঁর বেগম তকমা। কিন্তু পরবর্তীতে মুর্শিদাবাদের প্রাসাদ থেকে মুক্তি পেলে তিনি সোজা পাড়ি দেন চন্দননগরের পথে। শেষ জীবনেও ফেয়ারলি প্লেসের প্রাসাদে বসে তিনি আওড়াতেন তার সেইসব দিনের কথা। ৮৭ বছরের দীর্ঘ জীবনে কলকাতার বহু সোনালীর ইতিহাসের সাক্ষী ছিলেন এই সাদা চামড়ার বেগম। মুর্শিদাবাদ হিরাঝিল প্রাসাদে সিরাজের কলকাতা আক্রমণের যুদ্ধযাত্রা থেকে শুরু করে পলাশীতে নবাবের সমর্পণ, নতুন ফোর্ট উইলিয়াল দুর্গ শিলান্যাস, মারাঠা ডিচ খনন, ছিয়াত্তরের মন্বন্তর - প্রায় সবকিছুরই সাক্ষী তিনি। তাই শেষ বয়সে ফেয়ারলি প্রেসের ঝলমলে প্রাসাদে সকলকে শোনাতেন এইসব স্মৃতিকথা। প্রতিদিন সন্ধ্যায় অতিথিদের ভিড়ে ঝলমল করতো প্রাসাদ। নিজের ইচ্ছানুসারে সেন্ট জনস চার্চের গোরস্থানে আজও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছেন তিনি। এই গোরস্থানে তখন কবর দেওয়া বন্ধ হয়ে গেলেও শুধুমাত্র বেগমের মতো বর্ণময় চরিত্রের জন্য ও তাঁর ইচ্ছাকে মর্যাদা দিয়ে এখানেই সমাধিস্থ করা হয় তাঁকে। তাঁর মৃত্যুতেই কলকাতা প্রথম প্রত্যক্ষ করে একজন সাধারণ নাগরিকের রাজসিক শেষকৃত্য সম্পাদনের। কে ছিলেন না সেদিন। স্বয়ং বড়লাট লর্ড মিন্টো বাহাদুরও হাজির হয়েছিলেন নিজের ঘোড়ার গাড়ি নিয়ে। শোনা যায়, ১৭৮৭ সালে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংস নিজে হাতে ফিতে কেটেছিলেন চার্চের। ওই চার্চেই আজও দেখা যায় পুরনো কলকাতায় লর্ড কার্জন কতৃক দ্বিতীয়বার প্রতিষ্ঠিত অন্ধকূপ হত্যার স্মারক স্তম্ভ এবং রোহিলা যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ। ১৭৭৩ সালে অওধের নবাব সুজা-উদ-দৌলার সাথে পার্বত্য পাঠান উপজাতি রোহিলাদের যুদ্ধে সঙ্গ দেয় ব্রিটিশ কলোনিয়ালরা। সে এক বিস্তৃত পটভূমিকা। প্রথম যুদ্ধে পরাজয়ের পরেও রোহিলারা শায়েস্তা না হলে আবার ১৭৯৪ সালের অক্টোবরে ইংরেজ বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে রোহিলাদের উপর। এই দ্বিতীয় যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভই আজও ইংরেজ বিজয়ের চিহ্ন ধরে রেখেছে কলকাতার বুকে। কলকাতা মাদ্রাসা বা মহাকরণের মতোই পুরনো কলকাতার এক জীবন্ত জীবাশ্ম এই স্টোন চার্চ। এর মধ্যে যেন আজও রয়ে গেছে সেকালের একখণ্ড কলোনিয়াল কলকাতা।



380 views0 comments

Recent Posts

See All

কলকাতা মানেই কালী। আর তাই কালী কলকাত্তাওয়ালী। প্রচলিত এই বাক্যবন্ধই বুঝিয়ে দেয় যে কলকাতা আর কালীর সম্পর্ক কতটা প্রাচীন। কিন্তু কোথায় সেই কলকাতার কালী। জঙ্গলাকীর্ণ কলকাতায় কালীই পূজিতা। আর সেক্ষেত্রে য