top of page

রাজা কংসনারায়ণ ও বাংলার দুর্গোৎসব - শেষ পর্ব

সম্রাট আকবরকে বাংলার জমি জরিপ সংক্রান্ত সমস্ত নথি পৌঁছে দিয়ে রাজা কংসনারায়ণ নির্বিঘ্নে ফিরে গেলেন তাহিরপুর। এই সেই ঐতিহাসিক তাহিরপুর যাকে এখন লোকে তাহেরপুর বলে চেনে। বর্তমানে এটি রাজশাহী জেলার বাগমারা উপজেলার একটি পৌরসভা। তাহিরপুর বারনই নদীর তীরে একটি ছোট্ট বর্ধিঞ্চু শহর। রাজশাহী শহরের কাছে এই স্থানই ছিল রাজা কংসনারায়ণের রাজধানী। যাই হোক, এবার আসা যাক বাংলার প্রথম বর্ণাঢ্য দুর্গাপুজোর কথায়। এস্টেটে ফিরে গিয়ে জমিদারীতে মন দিলেন রাজা। বাংলার হিন্দু সমাজে নিজের নাম আর রাজত্ব অক্ষয় করে রাখবার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন যাগযজ্ঞ করবার জন্য। রাজার ইচ্ছেমতো ডাক পড়লো পরগণার সমস্ত পণ্ডিত পুরোহিতদের। উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন রাজশাহীর হিন্দু সমাজের মাথা রমেশ শাস্ত্রী মহাশয়ও। সকলের সামনে রাজা যা বলে বসলেন তা শুনে অবাক সারা বাংলার পণ্ডিত সমাজ। তিনি একেবারে রাজসূয় বা অশ্বমেধ যজ্ঞ করতে চান। কিন্তু রমেশ শাস্ত্রী বললেন, বিশ্বজিৎ, রাজসূয়, অশ্বমেধ ও গোমেধ - এই চার মহাযজ্ঞ কোনওভাবেই সম্ভব না। কারণ প্রথম দুটির অধিকার কেবল সার্বভৌম সম্রাটের। আর দ্বিতীয় দুটি কঠোরভাবে কলিতে নিষিদ্ধ। রাজা তো পড়লেন মহা দ্বন্ধে। সংকল্প ত্যাগ করবেন তেমন মানুষও তিনি নন। ধনবান রাজা টাকা খরচ করেও কোনোভাবে উপায় পেলেন না মহাযজ্ঞ করবার। শাস্ত্রনিষিদ্ধ। শেষপর্যন্ত পণ্ডিতরা বিধান দিলেন দুর্গোৎসবের। তাঁরা জানালেন মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুসরণ করলে কলিতে একমাত্র দুর্গোৎসবই মহাযজ্ঞ। এবং এই যজ্ঞে সবরকম যজ্ঞের সমান ফল পাওয়া যায়। রমেশ শাস্ত্রীও সহমত হলেন এই শাস্ত্রীয় বিধানের সঙ্গে। যথারীতি শুরু হল তোড়জোড়। তখন তো আর আজকের মতো দুর্গাপুজো বহুল প্রচলিত ছিল না। আজকের মতো একচালার দুর্গাপ্রতিমা দেখেও নি বাংলাবাসী। মহাকবি কৃত্তিবাস ওঝা তাঁর বাংলা রামায়ণে রামচন্দ্রের অকালবোধনের কথা বলেছিলেন ঠিকই। কিন্তু আটপৌরে বাঙালী সেই পুজোর কথা কেবলই বইতে পড়েছে। কখনো চোখে দেখে নি মাটির একচালি দুর্গামুর্তি। তাহিরপুরের রাজা কংসনারায়ণের উদ্যোগে বাংলার বুকে প্রথম অনুষ্ঠিত হল দুর্গোৎসব। এই মহাযজ্ঞে সেযুগেও রাজা খরচ করলেন প্রায় আট লাখ টাকা। নিমন্ত্রিত হল এস্টেটের সমস্ত গণ্যমান্য মানুষজন। পড়শী জমিদারবর্গ। দুর্গাপুজোর প্রসাদ পেলেন সমস্ত প্রজারা। মার্কণ্ডেয় পুরাণের পুজোবিধি অনুসারে দেবীর আবাহন করলেন কংসনারায়ণ। তৈরি করা হল একচালচিত্রের প্রতিমা। দুপাশে দেবীর সম্পূর্ণ পরিবার। লক্ষ্মী সরস্বতী কার্তিক ও গণেশ। প্রতিমার পিছনে আধখানা চাঁদের মতো চালচিত্র। আজও এই ধরনের চালিকে বাংলা চালি বলা হয়। আদি কলকাতায় কালীঘাটের পটশিল্পীরা চিত্রশিল্পে ফুটিয়ে তুলতেন বিভিন্ন রকমের চালচিত্র। দেবী দুর্গার মুখেও নতুনত্ব। টানা চোখ ও সোনার গয়নায় মোড়া শরীর। দেবীমূর্তির এই আদি ধারাকে বাংলা মুখ বলা হয় আজও। রাজা কংসনারায়ণের হাত ধরে বাংলার সামাজিক চিত্রে ঢুকে পড়লো বাঙালীর দুর্গাপুজো।

বাংলার দুর্গাপুজোর কথা বলতে গেলে সবার প্রথমেই যাঁর নাম উঠে আসে তিনিই তাহিরপুরের কংসনারায়ণ। এই বাংলায় একচালা মূর্তিতে প্রথম দুর্গামূর্তি বানিয়ে সাড়ম্বরে দুর্গোৎসব পালন করেন তিনিই। এদিকে বাঁকুড়াতে মল্লরাজবংশে দেবী মৃন্ময়ীর কথা আমরা জানি। দশম শতাব্দীতে ঊনিশতম মল্লরাজা জগৎমল্লের হাত ধরে তৎকালীন বন বিষ্ণুপুরে (বর্তমান বিষ্ণুপুর) প্রথম অনুষ্ঠিত হয় দেবী দুর্গার সাড়ম্বরে পুজো। কিন্তু সেই পুজো পদ্ধতি আজকের বাঙালীর দুর্গোৎসবের সাথে মেলে না। বরং রমেশ শাস্ত্রী প্রণীত কংসনারায়ণের দুর্গাপুজো পদ্ধতি ও প্রতিমার ধরণ আজও ভক্তিভরে পালন হয়ে আসছে বাংলার ঘরে ঘরে। কংসনারায়ণ রায় তাই দুর্গাপুজোর হাত ধরে আজকের বাঙালীর কাছে অতিমাত্রায় আপন। বাংলায় আজও যে দুটি ঘরানায় দুর্গাপ্রতিমা নির্মিত হয় তার অলিখিত কপিরাইট যায় বিষ্ণুপুর মল্লরাজাদের ও তাহিরপুরের কংসনারায়ণের দিকে। যদিও বাংলায় দুর্গামূর্তির ভিত্তিতে কংসনারায়ণ নবীন হলেও অনেক আগেই বেশ গোহারান হারিয়ে দিয়েছেন মল্লরাজাকে। আজ কংসনারায়ণ ঘরানার একচালির প্রতিমাই পূজিত হন বেশিরভাগ বাড়িতে। দুর্গার টানা টানা চোখ ও টিকলো নাক। উপরে লক্ষ্মী সরস্বতী এবং নীচে কার্তিক গণেশ। পিছনে অর্ধগোলাকৃতি চালচিত্র। প্রসঙ্গত বলে রাখি, বিষ্ণুপুরে মৃন্ময়ী দেবীর দুপাশে দেবীর পরিবার থাকলেও তা কংসনারায়ণের মূর্তির থেকে কিছুটা আলাদা (সঙ্গে ছবি দেওয়া হল)। এখানে কার্তিক গণেশ উপরে ও লক্ষ্মী সরস্বতী নীচে অবস্থান করেন। যাই হোক, এরপরেই বাংলায় বিভিন্ন ঘরে ঘরে শুরু হয় এই মৃন্ময়ী দেবী দুর্গার আবাহন। কলকাতায় দুর্গাপুজোর গোড়াপত্তন হয় এর বেশ কিছু পরে ১৬১০ সালে। বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের হাত ধরে দেবী দুর্গা পা রাখেন কলকাতায়। যদিও সেই কলকাতা আজকের মতো ঝাঁ চকচকে মহানগরী নয়। সে এক অজ পাড়াগাঁ। কিন্তু তামাম বঙ্গদেশে প্রথম দুর্গাপুজোর আয়োজন করে অমরত্ব পেলেন রাজা কংসনারায়ণ। বাংলার ঘরে ঘরে ঢুকে পড়লেন তিনি। পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের জয়লাভের বছর ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়িতে রাজা নবকৃষ্ণ দেবের পুজোর হাত ধরে শহর কলকাতাতেও রমরম করে শুরু হয়ে গেল দুর্গাপুজো। প্রায় তখনকার প্রতিটি বাঙালী ধনাঢ্য বাড়িতেই শুরু হল দুর্গোৎসব। এরপর ভাগীরথীর স্রোতে গড়িয়ে গেছে অনেক জল। বারোয়ারী পুজো, পাড়া, ক্লাবের পুজো, থিম পুজোর সাথে সাথে বাংলা কাটিয়ে ফেলেছে অনেকগুলো শরৎ। আজও তাহিরপুর চুপিচুপি সাক্ষী দেয় প্রতিটি বাঙলীর কানে কানে।