কাজীসাহেব আর পাকা কৈ-এর পোস্ত

গত বাংলা ১১ ই জৈষ্ঠ্য ইংরেজি ২৬ শে মে,সদ্যই আমরা পার করে এলাম দ্রোহের কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৩ তম জন্মবার্ষিকী। আজ তাই বাংলা ক্যানভাসের পাতা জুড়ে রইল তাঁরই প্রিয় খাবারের হদিশ।


নজরুল। এক ব্যতিক্রমী চরিত্র, বাঙালির মেধা মনন কালিকলমের সাথে আন্তরিক যুক্ত একজন সরল মানুষ, একজন দ্রোহের কবি। আজ তাঁর জন্মতিথি। অন্তরের সবটুকু শ্রদ্ধাঞ্জলি তাঁর চরণে অর্পণ করে লিখতে বসেছি কবির খাদ্য অভ্যাস নিয়ে। খাদ্য অভ্যাস বলব নাকি খাদ্য অনীহা এটা ভাবতে ভাবতে খুঁজে পাই তার খাদ্য অনশন সংক্রান্ত কিছু খবর।কোথায় যেন মনে হয় খাদ্যরসিক মানুষ আর যাই করুন না কেন অনশন করে না খেয়ে দিনযাপন করতে পারবেন না,যদিও মতামত ব্যক্তিগত। আপাতদৃষ্টিতে সরল এই মানুষটির প্রিয় খাবার বলতে দুটো জর্দা দেওয়া পান আর পেয়ালা পেয়ালা চা। দু'টো কেন বললাম আসলে কবি এতটাই পানভক্ত ছিলেন যে যখনই মুখে পুরতেন একসাথে দুটো। কবি বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় এই পান সাজিয়ে গুছিয়ে কৌটোয় পুরে দিতেন কবিস্ত্রী প্রমীলাদেবী। খাবার ব্যাপারে এত সাধারণ ছিলেন নজরুল যে শোনা যায় প্রকাশকরা কয়েক খিলি জর্দাপান আর কয়েক কাপ চা দিয়ে বন্ধ ঘর থেকে নিমেষেই বের করে আনতে পারতেন কালজয়ী সমস্ত সাহিত্য সৃষ্টি। নজরুল গবেষক আসাদুল হক-এর বলা কথা অনুযায়ী এত সাধারণ এবং স্বল্প আহারী মানুষ যিনি বিরিয়ানি পোলাও কোর্মা তো পছন্দ করতেনই না এমনকি গরুর মাংসও ছিল তার অপছন্দের তালিকায়।


কবির পালিত কন্যা শান্তিলতাদেবীর থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী কবি জর্দাপান আর চা ছাড়া পছন্দ করতেন ঝিঙেসুক্তো এবং পোস্তবাটা দিয়ে পাকা হলুদ কৈ মাছের রসা।

বর্ধমানের চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেয়া কবি বিদ্রোহ লিখেছেন সোনার কলমে,লিখেছেন হাজারো গান কবিতা নাটক,লড়েছেন চরমতম দারিদ্র্যের সাথে। হয়তো সেই অভাব থেকেই জন্ম নিয়েছে তাঁর এই অতি সাধারণ জীবন যাপন। খাদ্য অন্বেষণ করেছেন অন্যভাবে,বেঁচে থাকার রসদের জন্য নিজের তৈরি মহলে সর্বদা ডুবে থেকেছেন সৃষ্টির গভীরে। সেই-ই ছিল তাঁর আসল খাদ্য।



এ তো গেলো নজরুলের জীবনতরীর গল্প। এবার আসি কৈ-পোস্ত রাঁধবার সহজ প্রণলীতে।


বাজার থেকে কৈ কিনে আনুন,লক্ষ্য করবেন যেন মাছগুলো একটু বড় হয়,পাকা অর্থাৎ একটু বড় মাছের পেটের দিকটা হলদে রঙ ধরে যায়। বেশ কয়েকবার জল পালটে ভালো করে মাছ ধুয়ে নিন,মাত্রাতিরিক্ত পিচ্ছিল হবার জন্য এই মাছ ধোবার পর বেশ খানিকটা নুন দিয়ে কছলে কছলে রেখে দিতে হবে মিনিট দশেক। এরপর আরও একবার ধুয়ে জল ঝরিয়ে নুন হলুদ মাখিয়ে নিন,সেই সময়ই অল্প সর্ষের তেলও দিয়ে দেবেন মাখানোর সময়। তেল দিয়ে মাছ মাখালে মাছ কড়াইতে লেগে ধরে না।

পরের পর্যায়ে...

পোস্ত কাঁচালঙ্কা (মাছের পরিমাণ অনুযায়ী ) বেটে নিন। সেই বাটায় অল্প চার-পাঁচ চামচ দই দিন। এই মিশ্রণ ভালো করে ফেটিয়ে ঢাকনা চাপা দিয়ে রেখে কড়াই বসান। তেল গরম হলে তাতে এক চিমটি নুন ফেলে দিন (যাতে মাছ ফেটে চোখেমুখে না ঢোকে)তারপর একে একে মাছ ভেজে তুলুন। পোস্তবাটা ব্যবহার করা হয় এমন রান্নায় মাছ বেশি কড়া করে ভাজতে নেই। সব মাছ ভাজা হয়ে গেলে কড়াইতে আরও একটু তেল দিন,বেটে রাখা মশলা ঢেলে দিন,সাথে স্বাদমতো নুন হলুদ,মিনিট পাঁচেক মশলা কষিয়ে তাতে ভেজে রাখা মাছ দিয়ে গ্যাস কমিয়ে রাখুন অন্তত দশ মিনিট, কই মাছ অত্যন্ত শক্ত হয়ে যায় ভাজার পর তাই একটা ঢাকনা চাপা দিয়ে ভাঁপে রান্না হতে দিন।দশ মিনিট পর ঢাকনা খুললেই তৈরি কাজী সাহেবের প্রিয় "কৈ-পোস্ত"


রান্নার পদ্ধতি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না,ফলত এটাই ধরে নেয়া উচিত সাবেকি রান্নার স্টাইলেই কৈ-পোস্ত রান্না হত। আমরাও ঠিক সেভাবেই লোহার কড়াই আর কাঁসার বাসন ব্যবহার করে সেই ঐতিহ্যকেই ধরে রাখার ক্ষুদ্রতম প্রয়াস করতেই পারি।



665 views0 comments

Recent Posts

See All

কলকাতা মানেই কালী। আর তাই কালী কলকাত্তাওয়ালী। প্রচলিত এই বাক্যবন্ধই বুঝিয়ে দেয় যে কলকাতা আর কালীর সম্পর্ক কতটা প্রাচীন। কিন্তু কোথায় সেই কলকাতার কালী। জঙ্গলাকীর্ণ কলকাতায় কালীই পূজিতা। আর সেক্ষেত্রে য