top of page

কালী কলকাত্তাওয়ালী

কলকাতা মানেই কালী। আর তাই কালী কলকাত্তাওয়ালী। প্রচলিত এই বাক্যবন্ধই বুঝিয়ে দেয় যে কলকাতা আর কালীর সম্পর্ক কতটা প্রাচীন। কিন্তু কোথায় সেই কলকাতার কালী। জঙ্গলাকীর্ণ কলকাতায় কালীই পূজিতা। আর সেক্ষেত্রে যে কালীক্ষেত্র দুটির কথা না বললেই নয়, তা হল কালীঘাট আর চিতপুর। কোথায় তখন মহানগরী কলকাতা শহর। চৌরঙ্গীর জঙ্গলে তখন ডাকাত আর ঠ্যাঙাড়েদের আস্তানা। কালীঘাট মন্দিরের অস্তিত্ব সম্বন্ধে আলোচনা করতে হলে পিছিয়ে যেতে হয় সেই কলকাতায়। কালীঘাট মন্দির হল বড়িশার লক্ষীকান্ত গাঙ্গুলিদের সম্পত্তি। লক্ষ্মীকান্ত হালিশহরের জিয়া গঙ্গোপাধ্যায়ের পুত্র আর বড়িশার রায়চৌধুরী বংশের প্রতিষ্ঠাতা। রাজা মানসিংহের থেকে বিশাল জমি লাভ করে এঁদের কলকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুরের সত্ব লাভ। জিয়া গঙ্গোপাধ্যায়ই ছিলেন বিখ্যাত সাধক কামদেব ব্রহ্মচারী। আর বারানসীতে তাঁর কাছেই দীক্ষা নেন সম্রাট আকবরের প্রধান সেনাপতি রাজা মানসিংহ। আর গুরুদক্ষিণা হিসাবে তিনি লক্ষ্মীকান্তের হাতে তুলে দেন বিশাল জমির জায়গীর। এই সূত্রেই কলকাতার ভাগ্যনির্ধারণের ইতিহাসটা শুরু। পরে নিজেদের জমিদারির জায়গায় তাঁরাই বানিয়ে দেন মন্দির। সাবর্ণ গোত্রভুক্ত এই জমিদারেরাই রায়চৌধুরী উপাধি পেয়ে পরে হন সাবর্ণ রায়চৌধুরী। একসময় লোকে মুখে মুখে বলতো - কালীঘাট কালী হল চৌধুরী সম্পত্তি হালদার পূজক তার এই তো বৃত্তি।। কালীঘাট কালীক্ষেত্র। চৌরঙ্গির জঙ্গল পেরিয়েও একসময় দলে দলে মানুষ এসেছে কালীঘাট মন্দির দর্শনে। ১৫৪৪ সালে মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চণ্ডীকাব্যেও উল্লেখ পাওয়া যায় কালীঘাটের। অথচ ১৫৭৮ সালে রাজা টোডরমলের বাংলার জমি জরিপের কাগজে কলকাতা বার্ব্বাকপুর ও বাঁকুয়া পরগনার উল্লেখ থাকলেও কালীঘাটের কালীর উল্লেখ নেই। বিষয়টা কিছুটা অবাক করে বৈকি। ৫১ পীঠের এই পীঠে সতীর ডান পায়ের কনিষ্ঠ আঙুল পড়েছিল বলেই প্রচলিত৷ নবদ্বীপ অধিপতি মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র তাঁর পরগনা থেকে প্রাপ্ত আয়ের ১২ লক্ষ ১০ হাজার টাকা বকেয়া খাজনার অপরাধে গ্রেপ্তার হন মুর্শিদাবাদে নবাব আলীবর্দি খাঁর দরবারে৷ কিন্তু রাজার গুণ বা দানধ্যানের কথা নবাব বিলক্ষণ জানতেন। তাই সাধারণ বন্দীদের মত কারাগারের অন্ধকারে বন্দী করে রাখেননি তাঁকে। দরবারে সসস্মানে তাঁকে রেখে হিন্দু শাস্ত্র ও ধর্মের কথা শুনতেন নবাব। এর মধ্যেই একদিন নৌকাযোগে রাজার জমিদারী দেখানোর সময় কলকাতা পৌঁছে কালীঘাটে জঙ্গলে প্রবেশ করে তাঁর জমির সীমা দেখান মহারাজ। কথায় কথায় বলে রাখা ভালো, সেই সময়ে কলকাতার একটা বড় অংশ নদীয়া পরগনার অন্তর্গতই ছিল। রাজা সেইসময় নবাবকে বলেন, এই বন্য পশু, ভাল্লুক, বন্য শুকর এই সবই আমার প্রজা। আর সেই ভ্রমণকালে গুহ্যকালীর মন্দির ও তাঁর উপাসকের খোঁজ পান রাজা। সেখানেই তিনি সতীপীঠের কথা শোনেন ও কালীঘাটের মন্দিরের বিষয়ে অবগত হন। রাজার অনুরোধেই ব্রাহ্মণ উপাসকের জন্য কিছু নিষ্কর জমি নবাব দান করেন। এরপরই রাজাকে সমস্ত ঋণের দায় থেকে মুক্ত করে সসম্মানে রাজ্যে ফিরিয়ে দেন রাজা। অর্থাৎ কালীঘাট কলকাতার অনেক আগে সে বিষয়ে কোনো মতবিরোধ নেই৷ কথাতেই বলে কালী কলকাত্তেওয়ালি। অর্থাৎ কালীর শহর কলকাতা। আর কলকাতা মানেই কালীঘাট। শহরের আর এক প্রাচীন তীর্থ চিৎপুর। আজকের গমগমে রাস্তাঘাট। অসংখ্য মানুষের ভিড়। কিন্তু সেযুগে এমনটি ছিল না। তবে কী ছিল সেখানে? কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এক তীর্থ। দেবী চিত্তেশ্বরী ও চিতে বা চিত্ত ডাকাতের গা ছমছমে কাহিনী। এই হল চিৎপুরের গোড়ার কথা। সে এক অচেনা কলকাতা। জঙ্গলের মধ্যে চিতে ডাকাতের ডেরা। হা রে রে রে করে মশাল নিয়ে যাত্রীদের লুটপাট করে সে। তার আগে আরাধ্য দেবীর উপাসনা। তার জন্য নরবলি অবধি করতে হাত কাঁপে না চিতের। তার নাম শুনলে ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে যায় যাত্রীরা। দেবী দর্শন তো দূর, জঙ্গলের পথও মাড়ায় না সাধারণ মানুষ। কালীর সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এমন বহু ডাকাত ঠ্যাঙাড়েদের নাম। পুরনো কলকাতায় খুব প্রচলিত কিছু ছড়ায় যেমন মিশে থাকত ডাকাত সর্দারদের প্রসঙ্গ। যেমন - ঘুম ঘুম যা রে ওরে খোকা ওরে ঐ আসছে বিশে বোদে হারে রে রে রে রে... ডাকাতি করবার আগে দেবী দুর্গার পুজো করে চিতে ডাকাত। নিজস্ব মহামন্ত্রে পুজো শেষ করবার পর অপরাজেয় হয়ে ওঠে। কিন্তু নিয়তি কেন বাধ্যতেঃ। একদিন পুজো শেষ হবার আগেই জঙ্গল ঘিরে ফেলে গৌড়ের সেনা। আকস্মিক আক্রমণে দিসেহারা চিতের মৃত্যু হয় জঙ্গলেই। কিন্তু তারপর কী হল তার আরাধ্য দুর্গামূর্তির? সে এক দীর্ঘ ইতিহাস। এরপর চিৎপুরের গঙ্গাতীরে আসেন দশমহাবিদ্যার অন্তর্গত তারা মায়ের সাধক নৃসিংহ ব্রহ্মচারী। চিৎপুরের গভীর জঙ্গলই হয়ে ওঠে তার সাধনপীঠ। তখন সেই জায়গা শেওড়াফুলীর রায় জমিদারদের জমিদারীর মধ্যে পড়ে। সেই বাড়ির সঙ্গেই বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন মুর্শিদাবাদে কুলাই গ্রামের জমিদার মনোহর ঘোষ। শোনা যায় তিনি আবার বিখ্যাত চৈতন্য পার্ষদ বাসুদেব ঘোষের বংশধর। তখন তিনি মুঘল কর্মচারী হিসাবে জরিপের কাজ করেন রাজা টোডরমলের অধীনে। বিবাহসূত্রে শেওড়াফুলী রাজবাড়ীর জামাই হিসাবে তিনিই পেলেন চিৎপুরের জমি সত্ত্ব। আর তারপরেই মহাত্মা নৃসিংহ ব্রহ্মচারীকে ৩৬ বিঘা জমিদান করেন তিনি। আর তখনই জঙ্গল পরিস্কার করতে করতে আবার উদ্ধার হন চিতে ডাকাতের দেবী শ্রী শ্রী জয়চণ্ডি চিত্তেশ্বরী দুর্গামাতা। মন্দির প্রতিষ্ঠা করে আবার নৃসিংহ ব্রহ্মচারীর কাছ থেকে পুজো পেতে শুরু করেন দেবী। শুরু হয় দেবী চিত্তেশ্বরীর নতুন আখ্যান। গড়ে উঠতে শুরু করে চিৎপুর। জঙ্গল পরিস্কার করে তৈরি হয় রাস্তা। পরে সেটিই গঙ্গার পাড় বরাবর শহর কলকাতার তীর্থযাত্রীদের কাছে ব্যস্ত রাস্তা চিৎপুর রোড। দেবী চিত্তেশ্বরীর সাথে জড়িয়ে যায় মনোহর ঘোষের নাম। কিন্তু বর্তমান মন্দিরটি তৈরি করে দেন কাশীপুরের কালীকৃষ্ণ দেববাহাদুর। মনোহর ঘোষের স্ত্রীয়ের দান করা জমিতে নির্মাণ হয় মন্দির৷ সেখানেই স্থায়ী ভাবে নৃসিংহ ব্রহ্মচারীর হাতে পূজিত হন জয়চণ্ডি দুর্গা। এরপর মন্দিরের সাথে জুড়ে যায় কলকাতার ব্ল্যাক জমিদার গোবিন্দরাম মিত্রের নামও। পুরনো মন্দিরকে আবার নতুন করে সংস্কার করেন তিনিই। তারপর থেকে আজ পর্যন্ত সেই মন্দিরেই রয়েছেন কলকাতার অন্যতম প্রাচীন দুর্গা বিগ্রহ। সিংহবাহিনী দেবী। কিন্তু সিংহের ঘোটক মুখ। চিতে ডাকাতের দুর্গার সিংহ ঘোটক মুখ কিকরে হল তা নিয়ে মতান্তর বিস্তর। ভাবা হয় দেবী পরে বৈষ্ণব জমিদারদের পূজিতা হয়েছেন বলেই সিংহমুখ পরিবর্তিত হয় ঘোড়ায়।কালীঘাট ও চিত্তেশ্বরীর মন্দিরই কলকাতার সবচেয়ে প্রাচীন দুই ধর্মক্ষেত্র। মন্দিরের ওপরে আজও প্রতিষ্ঠাকাল হিসাবে উল্লেখ আছে ১৬১০ সালের। অর্থাৎ প্রায় ৪০০ বছর জুড়ে কলকা