কলকাতার মেডিসিন মার্চেন্ট - বিকে পাল

উত্তর কলকাতার বিকে পাল এভিনিউ দিয়ে হাঁটেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুরস্ত। কে এই বিকে পাল? অর্থাৎ বটকৃষ্ণ পাল। শোভাবাজার স্ট্রিটে বনেদি বাড়ির গা ঘেসে তাঁর বিশাল প্রাসাদ ও ওষুধের দোকান আজও জাজ্বল্যমান। আসুন জেনে নিই তাঁর ইতিহাস। চিৎপুর রোডে ছোট্ট একফালি আফিমের দোকান থেকে শোভাবাজার স্ট্রিটে বিশাল অট্টালিকা- বটকৃষ্ণের এই পথ খুব উজ্জ্বল। উনিশ শতকের শেষার্ধে সাহেব কোম্পানিগুকে পিছনে ফেলে বটকৃষ্ণ রমরম করে চালান তাঁর ওষুধের দোকান, শুধু তাই নয়, সম্পূর্ণ দেশজ উপায়ে তৈরী করেন ম্যালেরিয়ার এলোপ্যাথি ওষুধ। এমনকি ১৯০৯ সালে লন্ডনের 'কেমিস্ট আন্ড ড্রাগিস্ট পত্রিকা' তাঁর দোকানের পসরা সম্বন্ধে আর্টিকেল পর্যন্ত করে।


১৮৩৫ সালে হাওড়ার শিবপুরে জন্ম নেন তিনি। বাবা লক্ষীনারায়ণ পালের অবস্থা ভালো ছিল না। মাত্র ১২ বছর বয়সে হাওড়া থেকে বটকৃষ্ণ চলে আসেন শোভাবাজারে মামাবাড়িতে। নতুনবাজারে মামা রামকুমারের ছিল মসলার দোকান। সেখানেই বটকৃষ্ণ কাজে লেগে যান। ১৬ বছর বয়সে মামার দোকান ছেড়ে আফিমের দোকান খোলেন চিৎপুরে। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন, মাত্র ১৬ বছর বয়সেই। ভাবা যায়? কিন্তু বটকৃষ্ণের ব্যবসায়িক বুদ্ধি সেখানেই থেমে থাকলে আজ আমরা তাঁকে নিয়ে চর্চা করতাম না। মানুষকে আফিম খাইয়ে তিনি সবসময়ই একটা অপরাধবোধে ভুগতেন। তাই হটাৎ আফিমের ব্যবসায় ইতি দিয়ে চলে যান বৈদ্যবাটির হাটে, আর শুরু করেন পাটের ব্যবসা। শেষ পর্যন্ত খোঙড়াপট্টি স্ট্রিটে তৈরী করেন নিজের দোকান। ব্যবসায়িক মগজের তাৎক্ষণিক প্রয়োগে তিনি বুঝতে শুরু করেন যে আয়ুর্বেদিক ওষুধের চেয়ে বিদেশী এলোপ্যাথি ওষুধের চাহিদা কিভাবে হুহু করে বাড়ছিল। কলকাতার বিদেশী ওষুধ এজেন্টদের সাথে যোগসূত্র করে তিনি লন্ডন থেকে আনতে শুরু করেন এলোপ্যাথি ওষুধ। তারপর খোলেন 'বটকৃষ্ণ পাল আন্ড কোম্পানি'। কলকাতার ওষুধ ব্যবসায় এ এক মাইলফলক। সস্তায় নির্ভেজাল ওষুধ বিক্রি করে তিনি ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন সাহেবদের ব্যবসায়িক প্রতিযোগী।


১৬ বছর বয়সেই ছেলে ভুতনাথকে লাগিয়ে দেন ব্যবসায়। এই ভূতনাথ পালই কলকাতার রাস্তায় ইংরেজদের টক্কর দিয়ে প্রথম বাঙালি ব্যবসার বিজ্ঞাপনের প্রথা চালু করেন। খবরের কাগজ, পঞ্জিকা এমনকি বড়বড় রাস্তাতেও তিনি ভরিয়ে দেন তাঁদের দোকানের বিজ্ঞাপন। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বিষয়টি খুব মামুলি মনে হলেও সেযুগে এটি বেশ শোরগোল তুলেছিল কলকাতার বাঙালি সমাজে। এরপর ১৯০৪ সালে বেশ কয়েকটি বাড়ি হাতবদলের পর ৩০ নং, শোভাবাজার স্ট্রিটে বটকৃষ্ণ গড়ে তোলেন তাঁর অট্টালিকা। এটিই তাঁর বসতবাড়ি। পরে ১৯১২ সালে শশিভূষণ সুর লেনে তৈরী করেন রিসার্চ ল্যাবরেটরি। সেইযুগে তাঁর মালিকানায় চিকিৎসাশাস্ত্রের সব শাখাগুলির জন্য তৈরী হয়েছিল আলাদা আলাদা ১৬ টি বিভাগ। এমনকি পশুচিকিৎসার জন্যও একটা আলাদা বিভাগ। এর পরও কে বলবে বাঙালি ব্যবসা করে না?


পরবর্তী সময়ে ব্যবসার বিশাল পরিসর দেখাশোনার জন্য বটকৃষ্ণ তাঁর আরো দুই পুত্র হরিশংকর ও হরিমোহনকেও নিয়োগ করেন। হরিশংকর কলকাতার ওষুধ ব্যাবসায়ের আর এক পাইওনিয়ার। তিনি বাবার ব্যবসাকে এক সুবিশাল বটবৃক্ষে পরিণত করেন। এমনকি বিদেশি কোম্পানিগুলি কিভাবে ওষুধ ব্যবসা করেন তা দেখার জন্য তিনি বিলেত পারিও দেন। ১৯৩০ সালে তিনি 'নাইট' উপাধি লাভ করেন। শুধু ব্যবসায়ী হিসাবেই নন, সমাজসেবী হিসাবেও তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। হরিশংকরই প্রতিষ্ঠা করেন 'Bengal Chemists and Druggists Association' ।



আজও অত্যাধুনিক শীততাপনিয়ন্ত্রিত ওষুধ ব্যাবসায়ীদের সাথে পাল্লা দিয়েও বিকে পালের ওষুধের দোকান রমরম করে ব্যবসা করে চলেছে শোভাবাজারের বুকে। পারলে কেউ কখনো একবার অন্তত কিছু ওষুধ কেনার উদ্দেশ্যে সেখানে যাবেন। দোকানের গঠনশৈলীই মনে করিয়ে দেবে ঊনবিংশ শতকের বিত্ত ও বৈভবের দিনগুলোর কথা। দোকানের পাশে এখনো রাখা আছে ব্যবসায়ী বটকৃষ্ণ পালের ব্যবহৃত গাড়িটি

529 views0 comments

Recent Posts

See All

রবিবারের সন্ধে। পরিবারের সকলের মুখে হাসি। গল্পগাছা আর আড্ডাবাজি। সাথে যদি থাকে মুচমুচে সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর এই স্ন্যাকস তাহলে জমজমাট হয়ে যায় প্রতিটি মুহূর্ত। ঘরে অনেকদিন মিইয়ে পড়ে থাকা বালিতে ভাজা কিছ