কলকাতার মিষ্টির ইতিহাস


কলকাতার কথা হবে, কথা হবে তার বাবুয়ানার, আর সেখানে মিষ্টিমুখ থাকবে না সে কিকরে হয়? কলকাতার সন্দেশ, মিষ্টি দই আর রসগোল্লা বিশ্বের কাছে তুলে ধরে বাঙালির পরিচয়। কিন্তু এইসব জিভে জল আনা রসনার ইতিহাস কি? কলকাতার অলিগলিতে ছড়িয়ে আছে বহু শতাব্দীপ্রাচীন মিষ্টির দোকান। যেমন তার জিভে জল আনা স্বাদ, তেমনি স্বল্পমূল্যে তৃপ্তির এক আশ্চর্য সমাধান। বিভিন্ন রকমারি খাবার, স্ট্রিট ফুড আর খাদ্যরসিক ক্রেতা কলকাতা শহরের অঙ্গ। আর পাতের শেষে যদি থাকে ভীমনাগের সন্দেশ, বা বলরাম মল্লিকের সরভাজা অথবা নকুড়ের কড়াপাক, তবে তো আর কথাই নেই। বাঙালি জমে ক্ষীর।

তবে এই সব বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ও তাদের মিষ্টির পিছনে রয়েছে মনে রাখার মতো কত ইতিহাস। কয়েকটি বিখ্যাত মিষ্টির দোকানের ইতিহাস নিয়ে একটু নাড়াচাড়া করা গেলে ক্ষতি কি? বাংলার আদি নাম ছিল গৌড়বঙ্গ। জনশ্রুতি, অঢেল গুড়ের যোগানই নাকি এই নামের আসল কারণ। ঊনবিংশ শতাব্দীর কলকাতা ও তদসংলগ্ন অঞ্চল ছিল মিষ্টি ও রসনার স্বর্ণযুগ। কলকাতার বেশিরভাগ প্রখ্যাত ময়রার ব্যবসায় গোড়াপত্তন এই সময়েই। শুধুমাত্র অবিক্রিত বর্জ্য দুধের সঠিক ব্যবহার ও তা থেকে লাভের জন্যই ছানার প্রচলন। এই ছানাকেই চিনি বা গুড়ের সাথে মিশিয়ে একটি অমসৃণ মিশ্রনে পরিণত করা হতো। এই পেস্টকে 'মাখা' বা 'মাখা সন্দেশ' নামে অভিহিত করা হতো। আজও বিভিন্ন দোকানে শুধুমাত্র মাখা সন্দেশের জন্য দীর্ঘ লাইন পড়ে।

১৮২৬ সালে কলকাতার বউবাজার অঞ্চলে পরান চন্দ্র নাগ প্রতিষ্ঠা করেন তাদের পারিবারিক মিষ্টির ব্যবসা। পরে পুত্র ভীম চন্দ্র নাগের হাতে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে খ্যাতি ও প্রতিপত্তি। ১৮৫৮ সাল, তখন প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো দোকান ভীমের। দোকানে আসেন ভারত ভূখণ্ডের তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড চার্লস জন ক্যানিং এর প্রতিনিধি। লেডি ক্যানিং এর জন্মদিন পার্টি উপলক্ষে মিষ্টির বায়না করতে। ভীমকে বলা হয় প্রচলিত সন্দেশ নয়, ফার্স্ট লেডির জন্য বানাতে হবে এক্কেবারে নতুন কিছু। কম জাননা ভীম ময়রাও। তিনি প্রস্তুত করেন একদম ভিন্নস্বাদের একটি পদ, লেডি ক্যানিং পরে অপভ্ৰংশ হয়ে এটিই 'লেডিকেনি' হিসাবে পরিচিতি পায়। জানবাজারের মহারানী রাসমণি দক্ষিনেশ্বর মন্দির যাবার সময় ভীম নাগ থেকে নিয়মিত নিয়ে যেতেন দুবাক্স সন্দেশ। একটি ভবতারিণী মায়ের পুজোর জন্য আর একটি হলো শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্য। তিনিও ভীমনাগের সন্দেশ ভীষণ পছন্দ করতেন। এছাড়াও জানবাজার রাজবাড়ির প্রয়োজনমতো প্রায় সব মিষ্টিই সরবরাহ করতেন ভীম ময়রা। ভীমনাগের আর একজন উল্লেখযোগ্য ক্রেতা ছিলেন বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। কলকাতা হাই কোর্ট থেকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার সময় নিয়মিত ঘোড়ার গাড়ি দাঁড় করিয়ে মিষ্টি নিতেন তিনি। দোকানে ঠিক ওই সময় মিষ্টির বাক্স প্রস্তুত করা থাকতো তাঁর জন্য। আজও স্যার আশুতোষের স্মরণে তাঁর প্রিয় সন্দেশটিকে 'আশুভোগ' নাম দিয়ে বিক্রি করে ভীমনাগ।

এবার আসি কলকাতার আর এক আইডেন্টিটি রসগোল্লার গল্পে। সন্দেশের পর কলকাতার ময়রারা কিছু রসনাসিক্ত মিষ্টি প্রস্তুতিতে মন দেন। ১৮৬৮ সালে উত্তর কলকাতার বাগবাজারে কম পুঁজির ময়রা নবীন চন্দ্র দাস বাংলার মিষ্টি জগতে বিপ্লবের সূত্রপাত করেন। আবিষ্কার করেন রসগোল্লা। প্রথমে দোকান প্রতিষ্ঠার পর নবীন পড়েন মহা ফাঁপরে। কম পুঁজির কারণে ও মূলত ধারে বিক্রয় না করার জন্য দিনের শেষে মিষ্টির একটা বড়ো অংশ অবিক্রিত থেকে যেত। রাতে দোকানে আড্ডা দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত মানুষের মধ্যে তিনি বিলিয়ে দিতেন সেই সব মিষ্টি। নবীন দাসের উদার মনোভাব তৎকালীন উত্তর কলকাতাবাসীর মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরী করে। লোকে পয়সা দিয়ে মিষ্টি কেনার চেয়ে তাঁর বিনা পয়সায় বিলানোর মিষ্টি খেতে উৎসাহ বেশি দেখাতো। দিনের পর দিন একই মিষ্টি খাওয়ানোর পর নবীন ময়রা নতুন কিছু ভাবতে শুরু করেন এবং ভাবেন রসগোল্লার বিষয়ে। বাকিটা ইতিহাস। নবীন ময়রাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কলকাতার মানুষ আজও তাঁকে ভালোবেসে 'রসগোল্লার কলম্বাস' বলে ডাকেন। তৎকালীন উচ্চবিত্ত মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী রায়বাহাদুর ভগবানদাস বাগেলা তাঁর পিপাসার্ত পুত্রকে জলমিষ্টি খাওয়ানোর জন্য গাড়ি দাঁড় করান নবীন ময়রার দোকানে। একটি রসগোল্লা ও জল খাওয়ার পর উচ্ছাস লুকোতে পারেন নি তাঁর পুত্র। তিনি বাবাকেও জোর করে খাওয়ান একটি রসগোল্লা। তারপর প্রবাসী ব্যবসায়ী প্রচুর রসগোল্লা কিনে নিয়ে যান সকলকে খাওয়ানোর জন্যই। এরকম অসংখ্য গল্প জুড়ে আছে রসগোল্লার ইতিহাসে। আজও রসগোল্লা বাঙালির গর্ব, বাংলার সম্পদ। ১৯২৫ সালে ৮০ বছর বয়সে নবীন তাঁর সাধের রসোগোল্লাকে রেখে পাড়ি দেন অমৃতলোকে। পরবর্তী সময়ে তাঁর যোগ্য পুত্র কৃষ্ণ চন্দ্র দাস (কে সি দাস) রসগোল্লার বিশ্বায়ন ঘটান। আজও তিনি পৃথিবী বিখ্যাত একজন মিষ্টান্ন বিক্রেতা।

আর এক বিখ্যাত মিষ্টি ব্যাবসায়ী হলেন বলরাম মল্লিক এবং রাধারমণ মল্লিক। ১৮৮০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে হুগলীর কোন্নগর থেকে কলকাতায় আসেন গনেশ চন্দ্র মল্লিক, শুধুমাত্র মিষ্টি তৈরির নেশা নিয়ে। প্রথমে উত্তর কলকাতায় একটি প্রসিদ্ধ মিষ্টির দোকানে কারিগরের কাজ নেন। কিন্তু ৩ বছর কাজ করার পর বহিস্কৃত হলে নিজে ব্যবসা করবেন বলে মনস্থির করে ফেলেন। দক্ষিণ কলকাতায় ভবানীপুরে বিখ্যাত ধনী হরলালকা পরিবারের থেকে মাত্র ৪৫০ বর্গফুট জায়গা ভাড়া নেন মিষ্টি দোকানের জন্য। উত্তর কলকাতায় বহু প্রসিদ্ধ ময়রা থাকার কারণে তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন। দক্ষিণ কলকাতায় তিনিই ছিলেন তখন একমাত্র প্রতিষ্ঠিত মিষ্টান্ন বিক্রেতা। শুধুমাত্র কড়াপাকের আর নলেন গুড়ের সন্দেশ নিয়ে তাঁর ব্যবসার সূত্রপাত। স্যার আশুতোষ তাঁর দোকানের মিষ্টি পছন্দ করতেন এবং নিয়মিত কিনতেন। পরে গণেশের ভ্রাতা বলরাম মল্লিক ও তাঁর পুত্র রাধারমণ মল্লিক ব্যাবসার খুঁটিনাটি পরিচালনায় মন দেন। তাঁরা আজও কলকাতার মিষ্টি জগতের পাইওনিয়ার। ১৮৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই দোকান আজও ভবানীপুরে তাদের শীততাপনিয়ন্ত্রিত ঝকঝকে শোরুম থেকে সারা পৃথিবীকে মিষ্টি খাইয়ে চলেছে।

কলকাতার মিষ্টির লড়াইতে অবাঙালিরাও পিছিয়ে থাকেন নি কখনো। ১৮৮৫ সালে মানিকতলা অঞ্চলে রাজা কমলাপ্রসাদ মুখার্জির থেকে প্রাপ্ত একটি ছোট্ট জায়গায় প্রথম দোকান প্রতিষ্ঠা করেন গাঙ্গুরাম চৌরাসিয়া। উচ্চমানের দই বিক্রি করে তিনি খুব অল্প সময়েই বড়ো ময়রাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেন। একবার সোভিয়েত চেয়ারম্যান বুলগানিন ও চীনের রাষ্ট্রনায়ক চৌ এন লাই এর কলকাতা সফরকালে গাঙ্গুরাম ক্যাটারিং এর দায়িত্ব পান। বুলগানিন তাঁর চমচমের ভূয়সী প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠেন। সেই থেকে আজও গাঙ্গুরাম মানিকতলার দোকানে 'বুলগানিন চমচম' বিক্রি করে আসছে।

সবশেষে আসি উত্তর কলকাতার আর এক প্রসিদ্ধ ময়রা গিরিশ ঘোষ ও নকুড় নন্দীর কথায়। ৫৬, রামদুলাল সরকার স্ট্রিটে অবস্থিত এই দোকানও শতাব্দী প্রাচীন। ১৮৪৪ সালে গিরিশ চন্দ্র ঘোষ প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর ব্যবসার। পরবর্তী সময়ে জনাইয়ের বাসিন্দা নকুড় নন্দী বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন তাঁর কন্যার সাথে। তখন একযোগে শশুর-জামাই পরিচালনা করেন ব্যাবসার গুরুদায়িত্ব। সম্প্রতি কালে অমিতাভ পুত্র অভিষেক বচ্চন ও ঐশ্বর্য রাইয়ের বিবাহ অনুষ্ঠানেও নকুড়ের পারিজাত, মৌসুমী সন্দেশ দিগ্বিজয় করেছে।

এরকম গল্প বলতে গেলে বলা যেন শেষই হয় না।

823 views0 comments