কলকাতার ভূত

ভূত কি? ভূতের অস্তিত্বই বা কোথায়? প্রশ্নগুলো ঘোরাফেরা করে নাগরিক সভ্য সমাজের ঘরে ঘরে। কলকাতা এক প্রাচীন মহানগরী। এই শহরের আনাচেকানাচে আজও ব্রিটিশ স্থাপত্য সুস্পষ্ট। উত্তর কলকাতার অলিগলি থেকে শুরু করে দক্ষিণের ঝাঁ চকচকে প্রাসাদ- সর্বত্রই কত অজানা কাহিনী, কত রটনা। আমিও লেগে পড়লাম কোমর বেঁধে। ভূতকে কলকাতা ছাড়া করবো এমন ক্ষমতা তো আর নেই, তাই ভূতের চোদ্দগুষ্টি উদ্ধার করবো এই সংকল্পই নিয়ে ফেললাম আরকি।

কলকাতার ভূত দর্শনে আমরা প্রথম বরং ঘুরে আসি আলিপুরে সাহেব ওয়ারেন হেস্টিংসের বাংলো থেকে। বর্তমানে বি. এড. কলেজ চলার সুবাদে ও চারপাশে আকাশছোঁয়া মাল্টিস্টোরিড বাড়ির দাপটে ভূতের গন্ধটাই বেমালুম উধাও। তবে এই ভবনে বিংশ শতকের প্রথম ভাগ সাক্ষী আছে বহু প্যারানরমাল এক্টিভিটির। সবটা জানার আগে আমরা বরং একটু আড়াইশো বছর আগের কলকাতায় পা রাখি। ১৭৫০ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে ভারতে পা রাখেন ওয়ারেন হেস্টিংস। সামান্য চাকরি দিয়ে জীবনের শুরু, পরে তিনিই হয়ে ওঠেন বাংলার ফোর্ট উইলিয়ামের প্রথম গভর্নর জেনারেল। ১৭৭৬ সালে আলিপুরে এই প্রাসাদ নির্মাণ করেন। এই বাড়িতেই কলকাতার বাবুদের নিয়ে তিনি বসাতেন নৈশ আসর। পরে এই বাড়িটি কিনে নেন লর্ড কার্জন। তৈরী করেন অতিথিনিবাস। ভারতের দেশীয় রাজা, আফগানিস্তানের আমির-ওমরা ও তিব্বতের দলাইলামাও কলকাতায় এসে থেকে গেছেন এই বাড়িতে। বাড়িটির বাগানও ছিল উল্লেখ করার মতো। হেস্টিংস বাড়িটি আসবাবপত্রসহ বিক্রি করে দেন। কিন্তু কোনোদিনই ছাড়তে পারেননি তাঁর প্রিয় ভবনের মায়া। পূর্বতন কর্মচারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, মৃত্যুর পরেও চার ঘোড়ার ফিটনে চেপে গভীর রাতে তিনি নিয়মিত আসতেন এই বাড়িতে। বাড়ির ভিতর ঢুকে কি যেন খুঁজতেন। এইচ. ই. এ. কটন তাঁর 'ক্যালকাটা ওল্ড এন্ড নিউ' বইতে এই ভৌতিক ঘটনার কথা উল্লেখও করেছেন। জানা যায় তাঁর সময়কালে দুটি মিনিয়েচার ছবি ও কিছু কাগজপত্র হেস্টিংস হারিয়ে ফেলেছিলেন। হয় সেগুলি চুরি যায়, আর নাহলে বাড়ির আসবাবপত্রের সাথে ভুলবশত সেগুলি বিক্রি হয়ে যায়। সেই কাগজের খোঁজেই হেস্টিংসের অতৃপ্ত আত্মা এই বাড়িতে আসতেন। যদিও ১৮৭৬ সালে ইন্ডিয়া অফিসের মহাফেজখানায় হেস্টিংসের কিছু দুর্মূল্য কাগজপত্র পাওয়া যায়। যদিও এই কাগজই তিনি খুঁজতেন কিনা তা তর্কসাপেক্ষ।

এবার পায়ে পায়ে যাওয়া যাক ২০ নং হরচন্দ্র মল্লিক লেন, শোভাবাজারের দিকে। গন্তব্য পুতুলবাড়ি। চক্র রেলের লাইনের ধারে রোমান স্থাপত্যে নির্মিত বিশাল ভগ্নপ্রায় প্রাসাদ চোখে পড়বে না তা হতে পারে না। বাড়ির মাথায় রোমান সৈনিকদের মূর্তি। এই মূর্তিই বাড়িটিকে পুতুলবাড়ি বলে চিহ্নিত করে। ঊনবিংশ শতকে কলকাতা ছিল দেশের সবথেকে লাভজনক ও বৃহৎ বন্দর। ব্রিটিশদের ব্যবসার মূল ভিত্তিই ছিল এই বন্দর। দেশ ও বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসতো জাহাজ। মূলত পাট, মসলা, রেশম ও চালের আমদানি রপ্তানির মূল কেন্দ্র ছিল এই শহর। তাই এইসকল দ্রব্য রাখার জন্য ব্রিটিশরা গঙ্গার ধারে গড়ে তুলেছিল বেশ কয়েকটি গুদামঘর। পুতুলবাড়িও তেমনই এই গুদাম। তাহলেই ভাবুন, শুধুমাত্র ব্যবসার দ্রব্য রাখার জন্য বানানো হয়েছিল এমন এক সুদৃশ্য প্রাসাদ। বাড়িটি এতই অনুপম শিল্পের দাবী রাখে যে হলিউড চিত্রনির্মাতা রোলান্ড জফ তাঁর বিখ্যাত 'সিটি অফ জয়' সিনেমার শুটিংও করেন এখানে। বর্তমানে বাড়িটি ভৌতিক আখ্যায়িত। কিভাবে সেটি ভূতের চারণভূমি হয়ে ওঠে তাঁর পিছনেও কিছু গল্প তো আছেই। প্রাক স্বাধীনতা আমলে এই গৃহ ছিল বাবু কালচারের এক উল্ল্যেখ্য স্থান। ধনী বাবু ও জমিদাররা এখানে আসতেন ভোগবিলাস ও নারীসম্ভোগের উদ্দেশ্যে। স্থানীয় গরীব মেয়েদের ওপর চলতো অকথ্য অত্যাচার। কখনো নিজেদের পাপ ঢাকা দেবার জন্য খুন পর্যন্ত করে ফেলা হতো ছোট ছোট মেয়েদের। আজও নাকি তাদের অতৃপ্ত আত্মা সুবিচার চেয়ে বেড়ায় এইসব দিনগুলোর। যদিও বাড়ির মধ্যে বর্তমানে থাকেন বহু গরিব উদ্বাস্তু পরিবার। এই বাড়ির মালিকানা ছিল বিখ্যাত ‘নট্ট কোম্পানি’র হাতে। আজও বাড়ির চারতলায় বন্ধ আছে তাদের নাটকের ঘর। ১৯৭৮ সালে নট্ট কোম্পানির কর্ণধার শ্রী মাখনলাল নট্ট এটি অধিগ্রহণ করেন। বর্তমানে সব ঘরই প্রায় দখলদারির আওতায়।

ভূত ও রহস্য নিয়ে বলা শুরু করলে শেষই হবার নয়। তাও যদি হয় শহর কলকাতাকে নিয়ে। বহু আবেগ, বহু ইতিহাসের সাক্ষী আমাদের প্রিয় এই শহর। আজ বলবো আরো একটা রহস্যের ঠিকানা। কলকাতার আনাচেকানাচে কান পাতলে শোনা যায় ন্যাশনাল লাইব্রেরীর রহস্য গল্পের কথা। ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে রহস্যজনক অস্তিত্বের টের পেয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যা নেহাত কম নয়। কি ধরণের রহস্য বা কি অভিজ্ঞতা জানার আগে আমরা আবার একটু ঘুরে আসি ন্যাশনাল লাইব্রেরীর স্মৃতি সরণী বেয়ে। ১৮৩৫ সালের মার্চ থেকে ১৮৩৬ এর মার্চ - মাত্র একবছর ভারতের গভর্নর জেনারেল হয়েছিলেন লর্ড মেটকাফ। লর্ড বেন্টিঙ্কের প্রস্থান ও লর্ড অকল্যান্ডের আগমনের মাঝের সময়ে। কিন্তু ভারতের ইতিহাসে সমস্ত ইংরেজ অধীশ্বরের মধ্যে তিনিই ছিলেন একদম অন্য ঘরানার এক সাহেব। তাঁর একটি বছর ছিল বাংলা ও বাঙালির কাছে স্মরণীয় সময়। তিনি তাঁর সময়েই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। স্যার মেটকাফের স্মৃতিরক্ষায় কলকাতাবাসী চাঁদা তুলে ১৮৪০ সালে তৈরি করে দেন মেটকাফ হল। এ এক অনন্য নজির। কলকাতা কখনো উপকারের ঋণ ভোলে না। এই প্রাসাদ তারই নিদর্শন হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ষ্ট্র্যান্ড রোডের বুকে। আর এটিই ছিল আজকের ন্যাশনাল লাইব্রেরীর প্রথম ভবন। মেটকাফ সাহেবের তত্ত্বাবধানে এখানে চলতো দুটি প্রতিষ্ঠান। একটি 'কলকাতা পাব্লিক লাইব্রেরী' (ন্যাশনাল লাইব্রেরীর আদি নাম) ও উইলিয়াম কেরি প্রতিষ্ঠিত 'এগ্রিকালচার ও হর্টিকালচার সোসাইটি'। পরে এই পাবলিক লাইব্রেরীই হয় 'ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরী'। ভারতের স্বাধীনতার পর সরকার এটি অধিগ্রহণ করে ও নাম দেওয়া হয় 'ন্যাশনাল লাইব্রেরী'। আলিপুরের বর্তমান লাইব্রেরী ভবনটি ছিল স্বাধীনতা পূর্বযুগে বাংলার গভর্নরের ভবন। বিশাল বইভান্ডার সংকুলানের জন্য পরে এটিতেই লাইব্রেরী স্থানান্তরিত হয়। বর্তমানে এই ভবন নিয়েই জড়িয়ে আছে বহু ভৌতিক কাহিনী। বিভিন্ন ঘটনার মধ্যে সবথেকে প্রচলিত রহস্যটি হল লর্ড মেটকাফের স্ত্রীকে ঘিরে। বহু মানুষ আজও ভবনের বিশাল ঘরগুলিতে অনুভব করেন তাঁর নিঃশ্বাসের শব্দ। বিশেষ করে বই যথাস্থানে রাখা না হলে লেডি মেটকাফ সাড়া দেন তাঁর প্যারানরমাল অস্তিত্ব নিয়ে। শোনা যায়, লাইব্রেরীর প্রতিটি বই ছিল তাঁর প্রাণপ্রিয়। তিনি যত্ন করে রক্ষা করতেন দেশ ও বিলেত থেকে আনা বিভিন্ন মূল্যবান বই। তাই আজও তিনি ছেড়ে যেতে পারেন নি তাঁর লাইব্রেরীর মায়া। ১৭৬০ সালে মিরজাফর নির্মিত এই ভবন গভর্নর জেনারেল হেস্টিংসের হাতে হস্তান্তরিত হয় ১৭৮০ সালে। তারপর থেকেই এটি গভর্নরদের বাসভবন। বহু জানা অজানা ইতিহাস জুড়ে আছে এই বাড়ির সাথে। এমনকি বহু লুকোনো চেম্বার আজও তালাবন্ধ থাকে। কিভাবে সেখান থেকে গভর্নররা শাসন করতেন বা কাজ চালাতেন সে সম্বন্ধে আজও কতৃপক্ষ ও সরকার অন্ধকারে। শোনা যায় এক ছাত্র গবেষণার কাজে আসতেন ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে। পরে আশ্চর্যজনক ভাবে তাঁর অন্তর্ধান ঘটে। আজও তাঁর কোনো খবর পাওয়া যায়নি কোথাও। অদ্ভুত রহস্যাবৃত সে কাহিনী।

ভূতের কথা এক আশ্চর্য আফিমেরমত। সত্য মিথ্যার বাইরেও আছে এক অনাবিল টান। বহু মানুষ আজও সবকিছুর উর্ধ্বে বিশ্বাস করেন অশরীরীর অস্তিত্ব। আমরা তর্কে যাব না। আমরা শুধু অনুভব করবো কলকাতার প্রাচীনত্বকে, তার ইতিহাসকে। কোনো মানুষকে প্রভাবিত করবার জন্য আমার এই প্রতিবেদন নয়। সব তর্কের বাইরে গিয়ে এ শুধু এক প্রাচীন কলকাতার অনুসন্ধান ও তার সাথে জড়িত লোককথা।

কলকাতার ভৌতিক গল্প কিন্তু এখানেই শেষ হয় না। আছে আরো কত কত ঠিকানা, যেখানে জুড়ে আছে হাড় হিম করা সব কাহিনী। পাঠকরা চাইলে আবার আসা যাবে কিছু ভূতবাংলোর হালহকিকত নিয়ে। তবে সবটাই বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে বাঁধা।





2,375 views0 comments

Recent Posts

See All

রবিবারের সন্ধে। পরিবারের সকলের মুখে হাসি। গল্পগাছা আর আড্ডাবাজি। সাথে যদি থাকে মুচমুচে সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর এই স্ন্যাকস তাহলে জমজমাট হয়ে যায় প্রতিটি মুহূর্ত। ঘরে অনেকদিন মিইয়ে পড়ে থাকা বালিতে ভাজা কিছ