কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর সাথে জড়িত ইতিহাস পুরাণ শাস্ত্র আর খিচুড়ি লাবড়া ভোগ

"লক্ষ্মীস্তং সর্বদেবানাং যথাসম্ভব নিত্যশ

স্থিরা ভবঃ তথা দেবী মম জন্মানি জন্মানি

বন্দে বিষ্ণুপ্রিয়াং দেবীং দারিদ্র দুঃখ নাশিনিং

ক্ষিরোদপুত্রীং কেশবকান্তাং বিষ্ণুবক্ষ বিলাসিনিং"

"লক্ষ্মী মানে শ্রী সুরুচি। লক্ষ্মী সম্পদ আর সৌন্দর্যের দেবী। বৈদিক যুগে মহাশক্তি হিসেবে তাকে পুজো করা হত। তবে পরবর্তীকালে ধনশক্তির মূর্তি নারায়ণের সাথে তাকে জুড়ে দেওয়া হয় " ----- ঐতিহাসিক নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর 'বাংলার ব্রত' বইতেও কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো নিয়ে বিস্তারিত বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে এই পুজোর নৃতাত্ত্বিক কারণ হল,দেবীর পূজার্চনার মাধ্যমে শস্য ফলনের প্রার্থনা।

কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো। আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষ তিথির শেষ পূর্ণিমাতে অনুষ্ঠিত হয় ধন-সম্পদের দেবী লক্ষ্মীর আবাহন। সনাতন হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী শস্য সম্পত্তির ভারপ্রাপ্ত দেবী লক্ষ্মী, তার ডান হাতে প্রস্ফুটিত পদ্ম, বাঁ দিকের কাঁখে ধানভর্তি গাছকৌটো,পায়ের সামনে বাহন পেঁচা। এই বিশেষ তিথি ছাড়াও সমস্ত বছর ধরে প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিন বৃহস্পতিবার লক্ষ্মী মূর্তির সামনে ঘটভরা জল, পঞ্চপল্লব, আলপনা, পুষ্প, মিষ্টান্ন সহযোগে পুজো করেন গৃহস্থ এয়োস্ত্রীরা,পায়ে আলতা হাতে শাখাপলা সমেত সধবা সমন্বিত সমস্ত লক্ষ্মণচিহ্ন নিয়ে তারা ভক্তিভরে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করেন।

কোজাগরী লক্ষ্মী, কিন্তু কেন বলা হয় কোজাগরী?

কোজাগরী শব্দটির উৎপত্তি 'কো জাগতি' অর্থাৎ 'কে জেগে আছ' থেকে। লোকগাঁথা অনুযায়ী লক্ষ্মী পুজোর দিন যে সকল গৃহস্থরা সারারাত জেগে কাটান পাশা খেলেন মায়ের সমস্ত আশির্বাদ তাদের ওপর বর্ষিত হয়।


"নিশীথে বরদা লক্ষ্মীঃ জাগরত্তীতিভাষিনী তস্মৈ বিত্তং প্রযচ্ছামি অক্ষৈ ক্রীড়ং করোতি যঃ" -- এই সুযোগে অনেকেই রাত্রে পাশা জুয়া খেলায় মেতে ওঠেন। কথিত আছে, এইদিন রাতে আশেপাশের বাগান থেকে ফুল ফল চুরি করে আসন ভরালে দেবী খুশি হন। বর প্রদান করেন।

কোজাগরী এই লক্ষ্মী পুজো বাৎসরিক এবং সাপ্তাহিক ছাড়াও মাসিক হিসেবেও প্রচলিত আছে। চোত পোষ ভাদ্র অর্থাৎ চৈত্র পৌষ এবং ভাদ্র এই তিন মাসের সংক্রান্তির দিনও আলাদা ভাবে লক্ষ্মী পূজার প্রচলন আছে বঙ্গে। কালী পুজোর দিন এদেশীয়দের মধ্যে 'অলক্ষ্মী তাড়িয়ে লক্ষ্মী' পুজোরও নিয়ম আছে,যাকে দীপান্বিতা লক্ষ্মী বলেও ডাকা হয়। লৌকিক রীতি অনুযায়ী সেদিন বিকেল থেকেই ঘরের জানালা দরজা বন্ধ করে রাখা হয় আবার সন্ধে পেরিয়ে গেলে কুলো আর ঝাঁটা সহযোগে পাটকাঠি পুড়িয়ে অলক্ষ্মী বিদায় করে তারপর সমস্ত জানালা দরজা খুলে দেওয়া হয়। 'এ বঙ্গে তব বিবিধ রতন' কবি যথার্থই বলেছেন।

লক্ষ্মীর হাজার রূপ। অষ্টলক্ষ্মীর এই আট রূপ বহুল পরিচিত। আদিমহালক্ষ্মী,ধনলক্ষ্মী,গজলক্ষ্মী,ধান্যলক্ষ্মী, বিজয়লক্ষ্মী, বীরলক্ষ্মী,সন্তানলক্ষ্মী এবং বিদ্যালক্ষ্মী

এই পুজোয় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত আছে বাংলার কৃষক সমাজ। ধানের ছড়া ফুল ফল আলপনা সবকিছুর মধ্যেই যেন লক্ষ্মীমন্ত ভাব।কি এই আনন্দ কি এই খুশি, আলপনা, চালের গুড়িতে জল গুলে সাদায় সাদায় ভরিয়ে দেওয়া লক্ষ্মীর পা আঁকা,ফুল আঁকা-- এ সবই আসলে হৃদয়ের ধনাত্মক শক্তির আহ্বান। অঞ্চল ভেদে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোরও ভাগ আছে। যদি মূর্তির দিক হিসেব করে ধরি তাহলে দেখব কোনো কোনো বাড়িতে পুজো হচ্ছে মাটির তৈরি অবয়বে আবার কোথাও সরা-র পুজো। কারোর পুজোয় প্রতিমাকে পরানো হয় শাড়ি কারোর পুজোয় শুধু জলভরাঘট। সরাও কিন্তু বিভিন্ন রকম। কোনো সরায় মহিষাসুর মর্দিনী থাকেন, তার পায়ের কাছে বসে আছেন লক্ষ্মী। আবার কোনো সরায় আঁকা আছে ধন ধান সম্পূর্ণা মা লক্ষ্মীর মুখ। কোনো লক্ষ্মীর সরায় তিনটি , পাঁচটি, সাতটি পুতুল আঁকা থাকে, লক্ষ্মী, জয়া বিজয়া-সহ রাধা কৃষ্ণ। কোথাও সপরিবার দুর্গা ইত্যাদি। আবার সপ্তডিঙা নৌকা তৈরি করেও পূজা রীতি আছে,সেক্ষেত্রে কলাগাছের পেটোকে কেটে একদম নৌকার আকৃতি দান করে সেখানে পুজো হয়



'শেষ হইয়াও হইল না শেষ ' এর মতো বিজয়ার মনকষ্ট লাঘব করতে থেকে যান স্বয়ং মা লক্ষ্মী। তার আগমনে নিষ্ঠা ভরে পূজা অর্চনা করলে নাকি থাকে না কোনো অর্থকষ্ট দারিদ্র্য অভাব ইত্যাদি। প্রতিটি ঘরেই লোকমুখে ছড়িয়ে আছে এই অতি সাধারণ কাহিনী।

লক্ষ্মীর ব্রতকথা যাকে চলতি ভাষায় আমরা লক্ষ্মীর পাঁচালি বলি সেখানকার কিছু শ্লোক যা একান্তই বাংলার চিরাচরিত

দোল পূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ।

মন্দ মন্দ বহিতেছে মলয় বাতাস।।

লক্ষ্মীদেবী বামে করি বসি নারায়ণ।

কহিতেছে নানা কথা সুখে আলাপন।।

হেন কালে বিণা নিয়ে আসি মুনিবর।

নারায়ণের সাক্ষাৎ-এ কহিল বিস্তর।।

তারপর করজোড়ে করিয়া প্রণতি।

কহিল নারদমুনি নারায়ণী প্রতি।।

কহ মাতা এ কেমন তোমার বিচার।

চঞ্চলা চপলা প্রায় ফির দ্বারে দ্বার।।

পলকের তরে তব নাহি কোনো স্থিতি।

মর্ত্যবাসী সদা তাই ভুগিছে দুর্গতি।।

পূজা শেষে পুষ্পাঞ্জলি মন্ত্র প্রণাম মন্ত্র উচ্চারণ করে

ওঁ পাশাক্ষমালিকাম্ভোজ সৃণিভির্যাম্য সৌম্যয়োঃ পদ্মাসনাস্থাং ধায়েচ্চ শ্রীয়ং ত্রৈলোক্য মাতরং। গৌরবর্ণাং স্বরূপাঞ্চ সর্বালঙ্কার ভূষিতাম্, রৌক্নোপদ্মব্যগ্রকরাং বরদাং দক্ষিণেন তু।

স্তবমন্ত্র

ওঁ ত্রৈলোক্য-পূজিতে দেবী কমলে বিষ্ণুবল্লভে, যথা ত্বং সুস্থিরা কৃষ্ণে তথা ভব ময়ি স্থিরা। ঈশ্বরী কমলা লক্ষ্মীশ্চলা ভূতির্হরিপ্রিয়া, পদ্মা পদ্মালয়া সম্পৎপ্রদা শ্রী: পদ্মধারিণী। দ্বাদশৈতানি নামানি লক্ষীং সম্পূজ্য য: পঠেৎ, স্থিরা লক্ষীর্ভবেত্তস্য পুত্রদারাদিভি: সহ।

প্রণাম মন্ত্র

ওঁ বিশ্বরূপস্য ভার্যাসি পদ্মে পদ্মালয়ে শুভে সর্বতঃ পাহি মাং দেবী মহালক্ষ্মী।

এসব তো গেল শাস্ত্রকথা। পূজামন্ত্র ইত্যাদি। কিন্তু কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর আড়ালে যে লোককথা ছড়িয়ে আছে তা কি। এ এক প্রচলিত গল্প।

কোনো এক দেশে এক সৎ ন্যায়বান প্রজাবৎসল ধার্মিক রাজা ছিলেন। তিনি হাটে প্রজাদের যে সব জিনিস বিক্রি হত না,সেগুলো সঠিক দামে বিক্রেতার কাছ থেকে কিনে নিতেন। একজন কামার একটি লােহার নারীমূর্তি সারাদিন হাট হবার পরেও বিক্রি করতে না পারায় রাজা তা কিনে নেন। সেইদিনই রাত্রে রাজা তার বাড়িতে কান্নার আওয়াজ শুনতে পান,কিন্তু সেই শব্দের উৎসস্থল খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে ঠাকুর ঘরে দেখেন এক সুন্দরীনারী কাঁদছে। রাজা তাকে কান্নার কারণ জিজ্ঞেস করায় সে বলে “আমি রাজলক্ষ্মী, তাের বাড়িতে এতদিন ছিলাম, এখন আর থাকতে পারবাে না, চলে যেতে হবে তাই কাঁদছি।" রাজা অনুনয়-বিনয় করে তার কাছে কারণ জানতে চান। সে বলল, “আমি আর এখানে বাস করতে পারবাে না।বাড়িতে অলক্ষ্মী এসেছে" এভাবে কাঁদতে কাঁদতে রাজলক্ষ্মী চলে গেলেন। এরপর একে একে ভাগ্যলক্ষ্মী যশলক্ষ্মী রাজলক্ষ্মী তিনজনে রাজাকে ছেড়ে চলে গেলেন। রাজার চোখে ঘুম নেই,জানলা ধারে বসে থাকতে থাকতে দেখেন একজন পরম পুরুষ আর এক সুন্দরী নারী বাড়ি থেকে চলে যাচ্ছে, রাজা দোর আগলে কে তারা জানতে চাইলে সুন্দরীনারী বলেন আমি কুললক্ষ্মী, ঘরে অলক্ষ্মী আছে তাই তার থাকা হবে না। পরম পুরুষটি জানালেন তিনি ধর্ম, কিন্তু অলক্ষ্মীর কারণে তাকে যেতে হচ্ছে। সে কথা শুনে রাজা জিজ্ঞেস করলেন, " আমার দোষ কি ?ধর্ম রক্ষা করতেই অলক্ষ্মীকে কিনেছি, ধর্মই আমার সম্বল। এই ধর্মবলে আমার রাজলক্ষ্মী,ভাগ্যলক্ষ্মী,যশলক্ষ্মী কুললক্ষ্মী সবাইকে যেতে দিয়েছি।আমি ধর্মপ্রাণ, ধর্মত্যাগ করিনি,আমি আপনাকে যেতে দেবো না।ধর্ম দেখলেন রাজার কথাই ঠিক তিনি রয়ে গেলেন।কিন্তু এভাবে রাজা সমস্তটাই হারিয়ে পথের ভিখারি হয়ে পড়েন। রাজা খেতে বসলেই পঙ্গপালের মত পিঁপড়ের থালার চারদিকে ঘিরে ধরে,রাজা রানীকে তার খাবারে ঘি দিতে বারণ করলেন। তিনি খেতে বসেন খাবার থালার চারদিকে পিঁপড়ের দল এসে জড়ো হয় কিন্তু খাবারের তাদের রুচি হয় না। তাই দেখে এক পিঁপড়ে বলে ওই অলক্ষ্মীর জন্য রাজা এমন গরিব হয়েছে যে খাবারে ঘি জুটছে না। তা শুনে রাজা হা হা করে হেসে উঠেন।রানী দেখতে পেয়ে বললেন আপনি এমন হাসছেন কেন? রাজাও বলবেন না, রানীও ছাড়বেন না। রাজা তখন বলেন একথা বললেই আমার প্রাণ যাবে, তাও যদি তুমি শুনতে চাও তাে বলবাে। তাও রানী শুনতে চায় । রাজা তখন বলেন আমি মরলে যদি খুশি হও তাহলে ওই নদীর ধারে চলাে বলব। রানী ভাবে কথা বললে আবার মারা যায় নাকি? তাই তারা নদীর ধারে এসেছে,হঠাৎ এক শিয়ালিনী শিয়াল বলে ওই দেখাে জলে মরা ভেসে যাচ্ছে নিয়ে এসাে দুজনে খাওয়া যাবে।তাই শুনে শেয়াল বলে আমি কি রাজার মতাে বােকা নাকি যে রানীর কথায় প্রাণ দেব রাজামশাই সে কথা শুনতে পেয়ে রানীকে সেথায় রেখে সেই স্থান পরিত্যাগ করেন। রানী কাঁদতে কাঁদতে নদীর ধারেই থেকে যান। এই ভাবে অনেক দিন পার হয়ে যায় দেখতে দেখতে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা তিথি এল, রানী দেখলেন নদীর ঘাটে শঙ্খ, ঘন্টা ধুপ ধুনাে দিয়ে কারা কি সব করছে। রানী এগিয়ে এসে মেয়েদের জিজ্ঞাসা করলে তারা কি করছে, তখন তারা বলে আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো করছে এবং সঙ্গে এও জানায় এই পুজো করলে অলক্ষ্মী দূর হয়, মা লক্ষ্মীর কৃপাদৃষ্টি লাভ হয়। তাই শুনে রানী অতি কষ্টে কোনোক্রমে জিনিসপত্র জোগাড় করে পুজো করলেন এবং ব্রতপাঠ গান করে সারারাত জেগে কাটালেন। রাজবাড়িতে যে লােহার অলক্ষ্মী ছিল সকাল থেকেই নিখোঁজ। কোথায় গেল কেউ জানতে পারলাে না। ধর্ম এসে রাজাকে বললেন, “আপনার অমঙ্গল কেটে গেছে।অলক্ষ্মী দূর হয়েছে। আপনি রানীকে ফিরিয়ে নিয়ে আসুন।" রাজা পালকি নিয়ে রানীকে ফিরিয়ে আনলেন। তারপর খুব ঘটা করে লক্ষ্মীপুজো করে আবার সব ফিরে পেলেন।এইভাবে কোজাগরী লক্ষ্মী পুজো সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল।




1 view0 comments