top of page

দূর্গাসপ্তমীর পুরাণ লোককথা আর পাতুরির শিকড়ের খোঁজ

আজ ১৫ ই আশ্বিন। রবিবার। আজ মহাসপ্তমী। আকাশে পেঁজা তুলোর মতো ভেজা-ভেজা মেঘ। ঠিক যেন থোকা শিউলি। দূর থেকে ভেসে আসছে "দুর্গে দুর্গে দুর্গতিনাশিনী, মহিষাসুরমর্দিনী জয় মা দুর্গে"। দেবী দুর্গা। শিবপত্নী পার্বতী।


মর্ত্যে যিনি ঘরের মেয়ে আদরের উমা। চার সন্তানসহ বাপেরবড়ি বেড়াতে এসেছেন। মহাসমারোহে শুরু হয়েছে তার যত্নআত্তি। মাত্র চারদিন। এর মধ্যেই যথাসম্ভব আপ্যায়ন করতে হবে তাকে। দশমীতে ফিরে যাবেন শ্বশুরালয়ে। কৈলাশ পর্বতের শীর্ষদেশে। এই হল আমাদের লোকগাঁথা। যার পরতে পরতে মিশে আছে বিবাহিত মেয়ের পিতৃগৃহে যাপনের পেলব ইতিহাস। লোকাচার নিয়ম রীতি অনুযায়ী দেবীর আগমনের ফলস্বরূপ ধরণীর শস্যশ্যামলা হয়ে ওঠা,ঘরে ঘরে উপচে পড়া ধনচিহ্ন আর সুখ-সমৃদ্ধি স্বস্তির নিঃশ্বাস। তবু যেন সবকিছু ছাপিয়ে উঠে আসে একটিই শব্দবন্ধ " উৎসব শুরু "


দেবী দুর্গা। ষষ্ঠীতে কল্পারম্ভ বোধনের পর সপ্তমীতে কলাবউ স্নান নবপত্রিকা পূজা। নবপত্রিকা নামটি শুনলেই বোঝা যাচ্ছে নয় রকম পাতার সমাহার। শুদ্ধ বাংলায় যা নবপত্রিকা চলিত সাধারণ মানুষের কাছে সেটাই কলাবউ স্নান। নবপত্রিকার মূল উপকরণ হল কলাপাতা। সাথে কচু, হরিদ্রা,দাড়িম্ব,মান,বেল,জয়ন্তী, অশোক,ধান। এই নয়টি গাছ মূলসহ মাটি থেকে উৎপাটিত করে একসাথে বেঁধে দেওয়া হয়। সপ্তমীর প্রধান নিয়মই হল কলাবউ স্নান। নদী বা পুকুর ঝিল যে কোনো জায়গায় কলাবউকে একটা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি পরিয়ে স্নান করানো হয়। পুরাণ অনুযায়ী এই নবপত্রিকা হল আসলে দেবী দুর্গার নয় রূপ। এই নয় দেবী হলেন যথাক্রমে রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচ্বাধিষ্ঠাত্রী কালিকা, হরিদ্রাধিষ্ঠাত্রী উমা, জয়ন্ত্যাধিষ্ঠাত্রী কার্তিকী, বিল্বাধিষ্ঠাত্রী শিবা, দাড়িম্বাধিষ্ঠাত্রী, অশোকাধিষ্ঠাত্রী শোকরহিতা, মানাধিষ্ঠাত্রী চামুণ্ডা ও ধান্যাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী, রক্তদন্তিকা৷ নিয়ম অনুসারে কলাবউ স্নান করানোর পর দেবী দুর্গার মহাস্নান পর্ব শুরু হয়। সপ্তমী এই অর্থেই মহাসপ্তমী। ঠিকঠাক দেখতে গেলে এই দিন থেকেই আসল পুজোর আমেজ শুরু।

আজ মহাসপ্তমীতে যখন লোকাচার রীতি নিয়ে কথা হচ্ছে তখন বলতেই হয় এই যে এতভাবে বাংলার রীতি রেওয়াজ সবসময়ই এমনভাবে প্রকাশ হয়েছে যেখানে চাষআবাদ থেকে শুরু করে অরণ্যসম্পদ সবকিছুই কোনো না কোনো ভাবে যুক্ত।


আজ সপ্তমীর এই শুভদিনে রান্না করব ভেটকি পাতুরি। পাতুরি রান্না তো হবেই তার আগে চলুন ঘুরে আসি পাতুরির শিকড়ের খোঁজে কিছুটা রাস্তা। পাতুরি শব্দটির মধ্যেই পাতার সন্ধান মিলে যায় খুব স্বাভাবিকভাবেই। পাতুরি অর্থাৎ পাতায় রান্না করা কোনো খাবার। তবে পাতুরি সঠিকভাবে কোনো সময়ের উল্লেখ পাওয়া যায় না ইতিহাস ঘাঁটলে,বরং আজ যে পাতুরির এত রমরমা সেই পাতুরি কিন্তু মধ্যযুগের বাংলা রান্নার ইতিহাসেও কিছুটা অধরা ছিল বলে মনে করা হয়।

কবি মুকুন্দ মিশ্র তাঁর " বাঁশুলিমঙ্গল " কাব্যে বর্ণনা করেছেন যে,স্বামী ধূসদত্তের জন্য তাঁর স্ত্রী রুক্মিণী যে সমস্ত পদ রান্না করেছিলেন তার মধ্যে পাতুরি ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সর্ষে এবং মাছ সহযোগে পাতুরির উল্লেখ আছে সেখানে। বঙ্গীয় শব্দকোষ লেখক হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় কিন্তু তার গ্রন্থে পাতুরির উল্লেখ করেননি। এর থেকে ঠিক কি প্রমাণ হয় তা অবশ্য আমাদের জানা নেই কিন্তু একথা জোর গলায় বলা যায় পাতুরি শুধুই বাঙালির না হয়তো।

এই প্রসঙ্গে আরেকটি প্রসঙ্গ স্থাপন জরুরি। 'পত্রানি মচ্ছি' নামের যে রান্নাটি কেরালা কর্ণাটক রাজ্যে বহুল পরিচিত সেটিও অনেকটাই। পার্সি কুইজিনের সুপারম্যান এই পদের সাথে বাংলার পাতুরি কিছুটা এক। দুরকম মাছই রান্না হয় পাতামোড়া অবস্থায়। কিন্তু মশলায় রয়েছে বিরাট ফারাক। বাংলার রান্নায় আসল উপকরণ হল সর্ষে-নারকেল বাটাকাঁচালংকা সমেত, আর সর্ষের তেল নুন হলুদ। সেখানে পার্সি রান্নার প্রধান উপকরণ হল পেঁয়াজ রসুন ধনেপাতা পুদিনাপাতা বাটা।

বাংলার সাহিত্যের আকাশে তাকালে দেখা যায় প্রায় সব বিখ্যাত কবি-লেখকদেরই পছন্দের পদ ছিল পাতুরি। শক্তি থেকে সুনীল পাতুরিতে মজেননি এমন লেখক বাংলায় নেই। স্যার সৈয়দ মুজতবা আলী তাঁর 'বাঙালি মেনু' নিবন্ধে বলেছেন "মাছের সঙ্গে সর্ষে, যেন রবীন্দ্রসঙ্গীত কথার সঙ্গে সুরের মিলন"। সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর প্রিয় পদ ছিল ভাত ফোটার সময় হাঁড়ির মুখে কলাপাতায় মোড়ানো চিংড়ি ভাঁপে। সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আবার মায়ের হাতে রান্না করা সর্ষে কাঁচালংকা নারকেল বাটা দিয়ে ইলিশ ভাঁপা।


"রান্ধি নিরামিষ ব্যঞ্জন হল হর