মল্লভূমের মাটি - পর্ব ৪ ( রাজা রঘুনাথ মল্ল ও বীরসিংহ)

বিষ্ণুপুরের ইতিহাস বলতে গিয়ে রাজা বীরহাম্বিরের পরে যে রাজার কথা উঠে আসে তিনি হলেন রাজা

রঘুনাথ মল্ল (প্রথম)। বৃন্দাবনে থাকাকালীন পরম ধার্মীক ও বৈষ্ণব রাজা বীরহাম্বির তাঁর পুত্র ধাড়ীহাম্বিরকে অভিষেক করিয়ে দেন নিজের জীবৎকালেই। কিন্তু ধাড়ীহাম্বিরের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তাঁর ভাই রঘুনাথ সিংহাসন দখল করেন। সম্রাট আকবরের আমল থেকেই বিষ্ণুপুরের রাজারা মুঘল বদান্যতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন ভাবে বাংলার নবাবকে করফাঁকি দিয়ে আসছিলেন বহুদিন। কিন্তু শাহজাহানের পুত্র শাহজাদা সুজা বাংলার সুবেদারী লাভ করার পর কর আদায়ের জন্য হঠাৎ বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে বসেন এবং রাজা রঘুনাথ মল্লকে বন্দী করে রাজমহল নিয়ে যান। সেখানেই এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে যায় এবং শাহসুজার দেওয়া 'সিংহ' উপাধি সমেত রাজা ফিরে আসেন তাঁর রাজ্যে। সে এক সত্যিই বীরত্বের কাহিনী। বন্দী থাকাকালীন রাজা দেখেন একটি ঘোড়াকে কতেকজন প্রহরী মিলেও বাগে আনতে পারছে না কিছুতেই। তখন রাজা রঘুনাথ হেসে ব্যঙ্গবিদ্রুপের মাধ্যমে তাদের তাচ্ছিল্য করতে থাকেন। একটি সামান্য ঘোড়াকে বশে না আনতে পারায় রাজা হাসতে থাকেন প্রহরীদের উদ্দেশ্য করে। তখন খবর পৌঁছয় সুজার কাছে। তাঁর আদেশে সভায় হাজির করানো হয় বন্দী রাজাকে। বন্দী রাজার এই বিদ্রুপ শুনে তিনি রাজাকে শাস্তিস্বরূপ সেই শক্তিশালী ঘাতক ঘোড়ায় চড়ে দেখানোর নির্দেশ দেন। নবাব আদেশে রাজা রঘুনাথ সেই ঘোড়াকে বাগে এনে নিমেষে অদৃশ্য হয়ে যান। সকলে যখন প্রায় তাঁর মৃত্যু নিয়ে একরকম নিশ্চিত হয়ে যান, তখন হাওয়ার বেগে নবাবের সামনে ঘোড়া ছুটিয়ে ফিরে আসেন তিনি। বীর রাজার বীরত্বে মুগ্ধ হয়ে শাহসুজা তাঁকে 'সিংহ' উপাধি দিয়ে সসম্মানে মিত্রতা করে নেন ও মুক্তি দেন। তিনি ফিরে আসেন বিষ্ণুপুরে। রঘুনাথ ছিলেন বিষ্ণুপুর শাসকদের মধ্যে একজন উল্লেখযোগ্য বীর। তাঁর বীরত্ব বিষ্ণুপুরকে সেই নবাব আমলেও এক স্বাধীন রাজ্যের তকমা দিয়েছিল। বিষ্ণুপুরের ইতিহাস তাঁকে আজও বুড়ো রঘুনাথ বলে চিনে আসছে। মিত্রতার জন্য তিনি বাংলার নবাবকে প্রয়োজনে সসৈন্যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পর্যন্তও দিয়েছিলেন। এমনকি তাঁর এই প্রতিশ্রুতি বংশানুক্রমিকভাবে বিষ্ণুপুরের পরের রাজারাও রক্ষা করার চেষ্টা করে গেছেন। ১৭৫৭ সালে পলাশির যুদ্ধে তৎকালীন রাজা চৈতন্য সিংহ (মল্ল)ও এক বিশাল সৈন্যদল পাঠিয়েছিলেন নবাব সিরাজদ্দৌলার সাহায্যের জন্য। কিন্তু বাংলার দুর্ভাগ্য, সেই সেনাদল ইংরেজদের চক্রান্তেই মাঝপথ থেকে আবার ফিরে যায় বিষ্ণুপুরের দিকে এবং পলাশির প্রহসনের বাকিটা তো সকলেরই জানা।


bishnupur bangla canvas
ছবিঃ লেখক

এবার এক অন্য বিষ্ণুপুরের কথা বলব। যেখানে নেই ধর্মপ্রাণ রাজার প্রজাবাৎসল্য। যেখানে রাজা হাম্বীর বা আদি রঘুনাথের সময়ের মত রাজ্যের মানুষের মুখে মুখে নেই রাজার গুণগান। মুঘল সম্রাট ঔরঙ্গজেবের সময়কালে মল্লভূমের সিংহাসনে রাজা বীরসিংহ। আজও বিষ্ণুপুরের ইতিহাসে তিনি সবচেয়ে অত্যাচারী ও ক্রুর রাজা হিসাবেই পরিচিত।কথায় কথায় প্রাণদণ্ড, প্রজাদের ওপর অত্যাচার সেযুগে লেগেই থাকত প্রতিদিন। শোনা যায় আজও বিষ্ণুপুর শহরে যে গুমঘরটি দেখতে পর্যটকের ভিড় লেগে থাকে, তাও নাকি রাজা বীরসিংহেরই হাতেই তৈরি। সিংহাসনে বসেই প্রথমে তিনি রাজ্যের নিস্কর প্রজাদের জমি বাজেয়াপ্ত করেন বলে শোনা যায়। তাঁর ভাই মাধব সিংহ (যার নামে মাধবগঞ্জ) এই কাজের প্রতিবাদ করায় রাজা তাঁকে বিষ দিয়ে হত্যা করেন। এমনই ছিল তাঁর বিচার। এমনকি শোনা যায় অত্যাচারী রাজা তাঁর দ্বিতীয় রাণীর প্ররোচনায় প্রথম রাণীর (বিষ্ণুপুর খ্যাত রানী শিরোমণি) দুই সন্তানকে হত্যা পর্যন্ত করেন। তাঁর দুই রাণী ছিল। প্রথম রাণী শিরোমণি ছিলেন ধর্মপ্রাণা ও প্রজাবৎসল। কিন্তু দ্বিতীয় রাণী স্বর্ণময়ী দেবী নিরন্তর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতেন। রাজার প্রথম পক্ষের তিন পুত্রকে (রাজকুমার দুর্জন সিংহ, শূর সিংহ ও কৃষ্ণসিংহ) হত্যা করে কিভাবে নিজের পুত্র রাজকুমার বলদেবকে সিংহাসনে বসানো যায় সেই চিন্তাতেই মগ্ন থাকতেন তিনি। এমনকি রাজাকেও নিজের মোহাবিষ্ট করে এই ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত করেন। একদিন রাজা তাঁর জ্যেষ্ঠ সন্তান ও ভবিষ্যৎ সিংহাসনের দাবীদার রাজকুমার দুর্জন সিংহকে জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে গোপনে হত্যা করতে নির্দেশ দেন। কিন্তু বীর রাজকুমারের গুণমুগ্ধ সঙ্গীরা তাঁকে পালিয়ে যেতে সহায়তা করেন। শেষ পর্যন্ত রাজকুমার দুর্জন ইন্দাস গ্রামে ছদ্মবেশে আত্মগোপন করে বাস করতে থাকেন। কিন্তু ক্রুর বাবার হাত থেকে রক্ষা পান নি বাকি দুই রাজকুমার। দ্বিতীয় রাণীর পরামর্শে তিনি নিজের সন্তানদেরও হত্যা করে বসেন। এদিকে রাণী শিরোমণি ছিলেন বিষ্ণুপুরের এক প্রজাবন্দিত রাণী। সব প্রজাদের কাছে তিনি ছিলেন স্ময়ং মা মৃন্ময়ী। প্রজাদের দুঃখ, কষ্ট নিরসনে তাঁর ভূমিকা আজও বিষ্ণুপুরের আকাশে বাতাসে ভাসে। ভারতীয় রেল তাঁকে সম্মান জানাতে তাঁর নামে নামাঙ্কিত একটি ট্রেন (রাণী শিরোমণি ফাস্ট প্যাসেঞ্জার) চালায় আজও হাওড়া থেকে আদ্রা স্টেশনের মধ্যে। বিষ্ণুপুরে বিখ্যাত টেরাকোটা মন্দিরগুলির মধ্যে বহু মন্দির তাঁর হাতে তৈরি বলে জানা যায়। কিন্তু ধর্মপ্রাণা রাণীর দুঃখের শেষ ছিল না। দুর্মতি স্বামীর অত্যাচার ও অধর্মের বোঝা তাঁকে বইতে হয় সমস্ত জীবন। তিন সন্তানের জননী হয়েও তাঁকে সন্তানহীনতার অভিশাপে পুড়তে হয় প্রতিনিয়ত। যদিও কথায় বলে 'পাপ কাউকে ছেড়ে কথা বলে না'। রাজা ও রাণী স্বর্ণময়ীর সেই সাত রাজার ধন রাজকুমার বলদেবও দুরারোগ্য রোগে অকালেই দেহ রাখেন। এই হয়ত নিয়তির বিধান। আর এই ঘটনার পরে রাজা বীরসিংহের মধ্যে এক অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যায়। সন্তান বিরহে তিনি রাজধর্ম পালনেও অপারগ হয়ে ওঠেন। রাণী স্বর্ণময়ীর পরিণতিও হয় করুণ। সন্তানের মৃত্যুতে তিনিও পাগলপারা হয়ে অসংলগ্ন কথাবার্তায় নিজের পাপকর্মগুলোই জনসমক্ষে প্রকাশ করতে থাকেন অহরহ। বিষ্ণুপুরের এই দুঃসময়েই রাজহিতৈষীদের পরামর্শে জীবিত রাজকুমার দুর্জন সিংহ ফিরে আসেন ভগ্ন রাজ্যের হাল ধরতে। এই সময়ে নিজের একমাত্র জীবিত পুত্রকে দেখে দুর্মতি রাজা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন নি। পুত্রকে বুকে জড়িয়ে ধরে রাজা বলে ঘোষণা করেন ও শুভদিনে রাজ্যাভিষেক করেন। এই হল মল্লভূম রাজভবনের ইটের খাঁজে খাঁজে অমর হয়ে জমে থাকা রাজা বীরসিংহের অত্যাচারের কাহিনী। বীর রাজা প্রথম রঘুনাথ সিংহের এই পুত্র সম্পূর্ণ বৈষ্ণব আবহে বড় হয়েও কিভাবে এক প্রাণনাশী রাজশক্তির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছিলেন তা নিয়ে আজও ঐতিহাসিকদের মধ্যে বিস্ময় দেখা যায়। তবে অত্যাচারী রাজার শেষ জীবন বড় করুণ। জীবনের শেষ ভাগে সমস্ত অনুতাপের জ্বালা বুকে নিয়ে তিনি আত্মহত্যা করে এই পাপজীবন থেকে অব্যাহতি পান। ধার্মিক বিষ্ণুপুরের এই ইতিহাস এক ব্যতিক্রমী ইতিহাস। মল্লভূম রাজবংশের এক ছন্দপতনের সাক্ষী।

60 views0 comments