মল্লভূমের মাটি - ৫

Updated: Jan 12


রাজা দুর্জন সিংহের পর সিংহাসনে বসলেন তাঁর পুত্র দ্বিতীয় রঘুনাথ। কিন্তু ইতিমধ্যেই রাজধানী বিষ্ণুপুরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঘটে গেছে বহু পরিবর্তন। রাজা বীর সিংহের হাত ধরে নগরবাসী দেখেছে প্রহসনের দিনগুলো। দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ ছিলেন উল্লেখ করার মতই বীর রাজা। কিন্তু আবার ভাগ্যের বিড়ম্বনায় সেই বীর রাজাকেই কিনা অকালে মৃত্যুবরণ করতে হল বেঘোরে, নির্মম ভাবে প্রাসাদের উপর থেকে নীচে পড়ে। এ এক অদ্ভুত কাহিনী। বিষ্ণুপুরের আকাশে বাতাসে সে ইতিহাস এখনও নীরবে সাক্ষী দিয়ে যায়। লালবাঁধের মাঝখান থেকে আজও যেন ভেসে আসে 'বাঁচাও বাঁচাও' চিৎকার। ভোজন টিলা থেকে আজও শোনা যায় হিন্দু প্রজাদের ধর্মরক্ষার আর্তনাদ। কি... অবাক লাগছে? বিষ্ণুপুরের ধার্মিক পটভূমিতে ভীষণ বেসুরো লাগছে। তাই না? তবে বলি।

সাল ১৭০২। দিল্লীর মসনদে বৃদ্ধ সম্রাট ঔরঙ্গজেব। ঢাকা থেকে বাংলা শাসন করেন তাঁরই নিযুক্ত দেওয়ান ইব্রাহিম খাঁ। কিন্তু দিল্লীর সিংহাসন নিয়ে সারা দেশ জুড়ে প্রায় যুদ্ধ বাঁধার উপক্রম। মুঘল সূর্য তখন অস্ত যায় যায়। চেৎবড়দার (বর্তমান মেদিনীপুর) জমিদার শোভা সিংহ তখন হাত মিলিয়েছেন উড়িষ্যার পাঠান সর্দার রহিম খাঁ সাথে। শোনা যায় এই শোভা সিংহেরই স্ত্রী তাঁর রাজ্য থেকে বিতাড়িত হয়ে একা সন্ন্যাসিনীর জীবন কাটাতেন আজকের কলকাতারই চৌরঙ্গী অঞ্চলে, এক সন্ন্যাসীর কুটিরে। তবে যেন ভাববেন না সে কলকাতা আজকের কোলাহলমুখর মহানগরী। তখন চৌরঙ্গী ছিল বাঘের বিচরণভূমি। হ্যাঁ, লম্পট স্বামীর থেকে বিতাড়িত হয়ে জঙ্গলে নিভৃতচারিণী হবার জন্যই তাঁর কলকাতা আগমন। যাক সে এক অন্য উপাখ্যান। এখন আবার ফিরে যাই প্রসঙ্গে। এদিকে শোভা সিংহ ও রহিম খাঁ একযোগে চললেন বর্ধমান আক্রমণ করতে। একেবারে মল্লভূমের গা ঘেঁষে। এই জোড়াফলার আক্রমণে যুদ্ধে প্রাণ দিলেন বর্ধমান রাজ রামকৃষ্ণ। এদিকে এসব খবর শুনে নবাব ইব্রাহিম খাঁও শায়েস্তা করতে পারলেন না এই দুষ্ট যুগ্মশক্তিকে। তাঁর পুত্র জবরদস্ত খাঁ নামে জবরদস্ত হলেও হেরে মুখ পুড়িয়ে ফিরে গেলেন ঢাকায়। পরে ঘটনাপ্রবাহে সম্রাট ঔরঙ্গজেবের বিশাল বাহিনী বিষ্ণুপুর রাজ রঘুনাথের সাহায্য নিয়েই শেষ পর্যন্ত পরাজিত করে শোভা সিংহ ও রহিম খাঁ কে। রঘুনাথের উপর বড় সন্তুষ্ট হন স্ময়ং বাদশা। চেৎবড়দা জয় করে প্রচুর ধনসম্পদ সমেত শোভা সিংহের রাজকন্যা চন্দ্রপ্রভাকে বিয়ে করে রাজধানী ফিরলেন রাজা রঘুনাথ সিংহ। কিন্তু আমাদের গল্পের গতি এতটা মসৃণ নয়। রঘুনাথের জীবন হার মানিয়ে দেয় আজকের সিনেমার ঘটনাক্রমকেও। উড়িষ্যায় রহিম খাঁর মৃত্যু হলে তাঁর সুন্দরী বেগম লালবাঈকে বিষ্ণুপুর নিয়ে আসা হয় এবং বীর রাজা রঘুনাথ এই মুসলমান বেগমের থাকবার জন্য প্রাসাদের কাছেই নির্মাণ করে দেন আলাদা অট্টালিকা। কিন্তু বেগম লালবাঈ চুপ করে থাকবার পাত্র নয়। সে রূপে আচ্ছন্ন করে রাজার ওপর বিস্তার করতে থাকে প্রেমের চাদর। বেগমের ডাককে উপেক্ষা করতে না পেরে রাজা রঘুনাথও দিনরাত পড়ে থাকেন তাঁর নতুন মহলে। ধীরে ধীরে ভাঁটা পড়তে থাকে রাজধর্ম। শিকেয় ওঠে প্রজাপালন। এদিকে রাজরাণী চন্দ্রপ্রভা অগত্যা উপায় না দেখে রাজা রঘুনাথ সিংহের ভাই গোপাল সিংহকেই রাজসিংহাসনে বসানোর জন্য উদ্যোগী হন। বীর রাজা রঘুনাথের জীবনটা এভাবেই বীরত্বের শিখর থেকে পরিণত হয় এক ক্লীব স্তাবকের জীবনে। সামান্য এক নারীর সঙ্গ তাঁকে বিচ্ছিন্ন পর্যন্ত করে দেয় তাঁর প্রজা, পরিবার ও সিংহাসনের থেকে। বিষ্ণুপুরের আকাশে ঘনিয়ে আসে অকাল দুর্যোগ। শেষ পর্যন্ত মুসলিম বেগম লালবাঈয়ের গর্ভে জন্মও নেয় হিন্দু ধর্মপ্রাণ রাজার এক পুত্র। এমনকি শোনা যায় বেগমের ইন্ধনে ভোজন টিলা নামক জায়গায় রাজা তাঁর হিন্দু প্রজাদের একরকম বাধ্য করেন মুসলিম হাতে ভোজন করতে। বিষ্ণুপুরের ইতিহাসে আমরা আগে বীর হাম্বিরের দ্বৈত জীবন পর্যায় দেখেছি। কিন্তু সে ছিল উগ্র যুদ্ধজয়ী রাজার পরম বৈষ্ণবায়ন। কিন্তু রঘুনাথের জীবনে যে পর্যায়ক্রমিক পরিবর্তন এসেছিল তার মূল্য চোকাতে বহু প্রাণ বলি পর্যন্ত দিতে দেখেছে এই ধর্মপ্রাণ মন্দির নগরী।

এমনই একদিন রাজ আদেশ উপেক্ষা করতে ভোজনটিলায় এল না একজনও হিন্দু প্রজা। ক্রোধের বশবর্তী রাজা ছুটে এলেন অন্তঃপুরে। সেখানেই সসৈন্যে অপেক্ষায় ছিলেন গোপাল সিংহ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাজাকে তাড়া করে বসে তাঁর সেনাদল। আর নিজের প্রাণ বাঁচাতে রাজা হঠাৎই নীচে ঝাঁপ দেন একেবারে প্রাসাদের খোলা জানলা থেকে। যথারীতি মৃত্যু, রাজহত্যা। স্বামীর মৃত্যুর জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে রাজার সাথে সহমরণে গেলেন রাণী চন্দ্রপ্রভা। লালবাঁধের কাছে রাজা ও রাণীর দাহস্থান এখনও দর্শনীয়। শুনলাম বিষ্ণুপুর এই রাণীকেই 'পতিঘাতিনী সতী' নামে আজও অভিহিত করে আসছে।

এরপর অবশ্য আর রক্ষা হয়নি লালবাঈয়ের। দল বেঁধে ক্ষিপ্ত জনতা ছুটে যায় নতুন মহল সমেত বেগমকে হত্যা করতে। লালবাঈ ও তাঁর পুত্রকে একটি নৌকায় পাথর বেঁধে ডুবিয়ে মারা হয় তাঁরই নামে নামাঙ্কিত লালবাঁধের জলে। তিলে তিলে মৃত্যুর সময়ে তাঁর 'বাঁচাও বাঁচাও' চিৎকার বিদ্ধ করতে থাকে ক্ষতবিক্ষত বিষ্ণুপুরের আকাশ। আজও লালবাঁধ বুকে করে রেখেছে সেই স্মৃতি। আজও সময়ের ভারে নিজেকেই নিজে প্রশ্নের সামনে দাঁড় করান দিগ্বিজয়ী রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহ। বাঁচবার জন্য নিজের মহলে লুকিয়ে রাখেন নিজের ছিন্নভিন্ন শরীর। শেষ হল বিষ্ণুপুরের মাটিতে এক চরম প্রতিহিংসার পর্ব। মৃত্যু হল রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহের। সহমরণে গেলেন রাণী চন্দ্রপ্রভা। জনরোষে প্রাণ হারালেন লালবাঈ। সমস্ত অস্থিরতার রেশ কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সিংহাসনে বসলেন গোপাল সিংহ। তাঁর এক অদ্ভুত চরিত্র। কীর্তন, নামগান, পুজো-আশ্রয়ের মধ্যে দিয়ে দিনের সকল কাটে তাঁর। বিষ্ণুপুর ফিরে পায় আরও এক পরম ধার্মিক শাসক। নিজের মধ্যেই ভাতৃহত্যার চরম অনুতাপ তাকে কুরে কুরে খায় প্রতিদিন। সারাদিন ইষ্ট মদনমোহনের আরাধনা করেও যেন প্রায়শ্চিত্তের তৃপ্তি আসে না তাঁর অন্তরে। হা মদনমোহন, যো মদনমোহন। এই তাঁর রাজত্ব, এই তাঁর প্রজাধর্ম। আর কোনওদিকেই প্রায় মতিগতি নেই রাজার। ফিরে যায় বিচারপ্রার্থী, পড়ে থাকে বিচার। কোনওকিছুই যেন তাঁকে স্পর্শ পর্যন্ত করতে পারে না। সারাদিন নিজের বৈষ্ণব অনুগামী নিয়ে দুহাত তুলে নগরে কীর্তন করে বেড়ান রাজা। শরীরে তার রাজঐশ্বর্য নেই।

কিন্তু প্রজাদের প্রতি রাজার কড়া ধর্মাচরণের নির্দেশে প্রায় নাভিশ্বাস ওঠার জোগাড় নগরবাসীর। নাগরিকের ধর্মাচরণের ক্ষেত্রেও সারা মল্লভূমে ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে রাজআদেশ ঘোষণা করা হয়। প্রত্যেক নগরবাসীকে রাতে শোবার আগে মদনমোহনের নাম করে মালা জপ করতে হবে। সারা বিষ্ণুপুরের মানুষ এই আইনকে 'গোপাল সিংহের বেগার' নাম দিয়ে একরকম বাধ্য হয়েই পালন করতে থাকে। মালাজপ না করবার অপরাধে বহু প্রজাকে কড়া শাস্তি গ্রহণ করতে হয় বলেও শোনা যায়। এই ছিল গোপাল সিংহের রাজত্ব। তাঁর সময়ে বিষ্ণুপুরের আকাশ-বাতাস মেতে থাকত হরিধ্বনী আর খোল কর্তালের শব্দে। না ছিল রাজার রাজ্যজয়ের তাগিদ আর না ছিল যুদ্ধে শত্রুকে প্রতিহত করবার যোগ্য প্রস্তুতি। আর ঠিক সেই সময়েই বাংলার ভাগ্যে ঘনিয়ে আসে সেই ঘোরতর দুর্দিন। যার ছড়ায় আজও শিশুকে ঘুম পাড়ায় মায়েরা। হ্যাঁ, আমি বর্গী আক্রমণের কথাই বলছি। সেই সময় বাংলার নবাব আলিবর্দী খাঁ প্রায় বর্গীদের পিছনে ধাওয়া করতে করতেই কাটিয়ে দিচ্ছেন তাঁর সমস্ত জীবনকাল। বর্গী নেতা ভাস্কর পন্ডিতের নেতৃত্বে সে এক দুর্ধর্ষ মারাঠা দস্যু অভিযান। মুঘল পাট্টা অনুযায়ী সামান্য কিছু খাজনার দাবীতে বাংলার গ্রাম কে গ্রাম জ্বালিয়ে খাক করে দিচ্ছে তারা। ঘর থেকে টেনে আনছে ঘরের বউ-মেয়েদের। এমন অবস্থায় একদিন ভাস্কর পন্ডিত তার অপরাজেয় বর্গী বাহিনী নিয়ে বিষ্ণুপুর আক্রমণ করে বসলেন। চারপাশ থেকে ঘিরে ফেললেন বন-জঙ্গল অধ্যুষিত রাজধানী বিষ্ণুপুর। খবর গেল গোপাল সিংহের কাছে। কিন্তু বৈষ্ণব রাজা কিছুতেই ভেবে পেলেন না যে কিভাবে প্রতিহত করবেন ভয়ঙ্কর মারাঠাদের। তিনি নিজেকে সঁপে দেন মদনমোহনের পায়ে। নিজে দল গঠন করে নগরের পথে সংকীর্তন বের করেন। সকলকে নির্দেশ দেন ইষ্টমন্ত্র জপের। অবশেষে কোনও কূল না পেয়ে যুবরাজ কৃষ্ণ সিংহ নিজের গুটিকয়েক কিছু দক্ষ সেনাদল পাঠিয়ে নজর রাখতে নির্দেশ দিলেন মারাঠা দস্যুদের দিকে। বিষ্ণুপুরের আকাশে বাতাসে হরিধ্বনীর সুর ভাস্কর পন্ডিতের মনেও ভয়ের জন্ম দিতে থাকে। ঠিক সেই রাতেই ঘটে যায় এক অলৌকিক ঘটনা। ঢাকার জগন্নাথ কর্মকারের নির্মাণ করা কামান দলমাদল বা দলমর্দন থেকে মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণ হতে থাকে বর্গীদের লক্ষ্য করে। প্রচন্ড শব্দে পথে নেমে পড়ে বিষ্ণুপুরবাসী। রাতের অন্ধকারে অতর্কিত হামলায় ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় বর্গী দস্যুরা। প্রাণ হাতে করে পালিয়ে বাঁচেন বর্গী নেতা ভাস্কর পন্ডিত।

পরেরদিন সকালে রাজা গোলাবর্ষণের কারণ খুঁজতে গিয়ে আকাশ থেকে পড়েন। এক গোলন্দাজ সৈনিক খবর দেন যে উত্তরগড় মুণ্ডমালাঘাটের দিক থেকে ঘোড়ায় চড়ে এক নীল দিব্য বালক একাই গোলাবর্ষণ করে গেছেন ও শত্রুকে ছত্রভঙ্গ করেছেন। গোপাল সিংহ বুকে জড়িয়ে ধরেন সেই সৈনিককে। চিৎকার করে ওঠেন জয় মদনমোহন ধ্বনীতে। নিজের পারিষদ নিয়ে ছুটে যান মদনমোহন মন্দিরের দিকে। পথে এক গোয়ালা এসে রাজাকে বলেন এক ক্লান্ত দিব্য বালক নীল পোশাক পরে তার কাছে দই খেয়ে গেছেন এবং মূল্য বাবদ নিজের সোনার বালা গচ্ছিত দিয়ে গেছেন। সারাগায়ে তাঁর কাদা মাখা। হাতে বারুদ। এ শুনে রাজার আর আনন্দের সীমা ধরে না। তিনি হা মদনমোহন বলতে বলতে আছড়ে পড়েন মন্দিরের দরজায়। কথিত আছে, মন্দিরের মদনমোহন মূর্তিতে সেদিন হাতের বালা ছিল না ও হাতে বারুদ লেগে থাকতে দেখা যায়। রাজা আবার সংকীর্তনে বের হন। খোল কর্তালের শব্দে মেতে ওঠে সমগ্র বিষ্ণুপুর।

এই ঘটনার কথা আজও প্রতিটি বিষ্ণুপুরবাসীর মুখে মুখে শোনা যায়। মদনমোহনের আখ্যান হয়ে এই কথা আজ বিষ্ণুপুরের কিংবদন্তি। এদিকে ভাস্কর পন্ডিতের সাথে যুদ্ধে যুবরাজ কৃষ্ণ সিংহ অকালেই মৃত্যুবরণ করেন। তাই পৌত্র চৈতন্য সিংহকে সিংহাসনে বসিয়ে গোপাল সিংহ বাকি জীবনটা মদনমোহনের পায়েই নিজেকে সঁপে দেন। এই চৈতন্য সিংহের সময়েই রাজ্যের ঋণে জর্জরিত রাজা মদনমোহনকে কলকাতায় বাগবাজারে কায়েত ধনী বণিক গোকুল মিত্রের কাছে বাঁধা দিয়ে ঋণ নেন। পরে গোকুল মিত্রের ছলনায় আসল মূর্তির বদলে রাজা কলকাতা থেকে নকল মদনমোহনকে বিষ্ণুপুর নিয়ে যান বলে জানা যায়। অনেকে বলেন এ সেই বীর হাম্বীরের মূর্তি চুরিরই প্রায়শ্চিত্ত, যা সময়ের অপেক্ষায় বিষ্ণুপুরের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছিল বহুদিনই। তবে যাই হোক। আজও বিষ্ণুপুরের মদনমোহন কলকাতা বাসী। বাগবাজারে মদনমোহনতলায় মন্দিরে নিত্য পূজিত হয়ে আসছেন তিনি। চৈতন্য সিংহের সময়কার আর একটি ঘটনা উল্লেখ না করলে অসম্পূর্ণ থেকে যায় কাহিনী। বাংলার নবাবদের চিরকালই সাহায্য করার পরম্পরায় চৈতন্য সিংহ পলাশীর যুদ্ধের সময় নবাব সিরাজদ্দৌলাকে সাহায্যের জন্য এই বিশাল সেনাদল মুর্শিদাবাদের দিকে পাঠান। কিন্তু ইংরেজদের প্রতারণায় সেই সেনাদল মাঝপথ থেকেই আবার বিষ্ণুপুর ফিরে যায়। বাকিটা বাংলার দুর্ভাগ্য।

১৮০৬ খ্রীস্টাব্দে ১২ই নভেম্বর অবশেষে ইংরেজ পরিচালিত নবাব সরকারের বাকি খাজনার দায়ে বিষ্ণুপুর নিলাম হয় এবং বর্ধমানের মহারাজা ২ লক্ষ ১৫ হাজার টাকায় এই মল্লরাজাদের ঐতিহাসিক পরগণা কিনে নেন। এরপর থেকে বিষ্ণুপুরের কোনও রাজাই আর স্বাধীন ছিলেন না। শেষ মল্লাধিপতি ছিলেন কালীপদ সিংহ ঠাকুর। ১৯৩০ সালে তিনি বিষ্ণুপুরের রাজা হিসাবে দায়িত্ব নেন। ১৯৮৩ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হলে বিষ্ণুপুরের রাজা পদটির অবসান ঘটে। বর্তমান রাজবংশের পুরুষদের আজকের বিষ্ণুপুরে মৃন্ময়ী মন্দিরের আশেপাশে খুঁজে পেয়েছিলাম বটে। তবে রাজ বিলাসের কিচ্ছু অবশিষ্ট পাই নি। আজ বিষ্ণুপুর মল্লরাজবংশের হাজার বছরের ঐশ্বর্য ও বীরত্বের ভগ্নাবশেষকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি পর্যটককে সে আজও গল্প শোনায় তার চিরাচরিত টেরাকোটার ইটেই।

37 views0 comments