অন্ধকূপের খোঁজে ( কলকাতার ইতিহাস পর্ব ১)

কলকাতায় অন্ধকূপ হত্যার ঘটনা কে না জানে। বিশাল সেনাদল নিয়ে গঙ্গার ধার ঘেঁষে নবাব সিরাজ হঠাৎ সরাসরি আক্রমণ করে বসলেন ইংরেজদের কলকাতা শহর। ইংরেজদের ওপর তাঁর রাগ বহুদিনের। দাদু আলিবর্দীও সিরাজকে সাবধান করতেন বেনিয়ার জাত ও স্বার্থপর ইংরেজদের থেকে। নবাব পদে অভিষেক হবার পরে ইংরেজ তরফে উপহার তো দূর, নবাবের শত্রু রাজা রাজবল্লভের পুত্রকে ঢাকা থেকে কলকাতায় আশ্রয় দেওয়াকে মোটেই ভালোভাবে দেখেন নি নবাব। কলকাতায় আসার পর মারাঠা খাল পেরিয়ে হালসিবাগানে তৈরি করলেন ঘাঁটি। বুক কাঁপলো সাহেবদের। নবাবকে ঠাণ্ডা করতে তাঁরা উপহার সমেত পাঠালেন মুন্সী নবকৃষ্ণ দেবকে। আরবি ও ফার্সিতে পন্ডিত নবকৃষ্ণও শান্তিপ্রস্তাবের কথা বললেন নবাবকে। কিন্তু নেট ফল শূন্য। তারপর লালবাজার, লালদিঘি, শিয়ালদার কাছে পরপর কয়েকটি ভয়ানক যুদ্ধ দেখেছে এই শহর। ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে পরপর কামানের গোলায় দলে দলে ইংরেজ গঙ্গায় ভাঁটার টানে পালিয়ে বাঁচে ফলতায়। ইংরেজদের মনে ছিল বর্গী আক্রমণের ভয়। সেই ভয়ে শহরবাসীর টাকায় খালও কাটে কাউন্সিল। যা মারাঠা ডিচ নামে খ্যাত। প্রসঙ্গত বলে রাখি, আজ আর এর কোনো অস্তিত্ব নেই, তবে পরে এই খাল বুজিয়েই তৈরি হয় আপার ও লোয়ার সার্কুলার রোড। এমনকি মহাত্মা গান্ধী রোডের (পুরনো হ্যারিশন রোড) কিছু অংশও এই খালের ওপর তৈরি।

যাই হোক, সেইসময় কলকাতার দিকে ভাস্কর পন্ডিতের দল চোখ তুলে না তাকালেও তাকিয়েছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। কলকাতা আক্রমণ করে ও শহরকে একরকম বিধ্বস্ত করে দমিয়েছিলেন ইংরেজ ঔদ্ধত্য। ধ্বংস করেছিলেন গীর্জাও। আর জয়ের পর ১৭৫৬ সালের ২০ই জুন ফোর্ট উইলিয়াম পুরনো দুর্গে (বর্তমান জিপিও র স্থানে) নবাব একরাতে একটি ১৪ ফুট X ১৮ ফুট হাওয়া-বাতাসহীন ঘরে ১৪৬ জনকে বন্দি করেন। পরের দিন দেখা যায় শ্বাসবন্ধ হয়ে মারা গেছেন ১২৩ জন। কিন্তু কতটা সত্য এই গণহত্যা? পরে ভারতীয় ঐতিহাসিকরা এই ঘটনার সত্যতা নিয়ে প্রবল দ্বন্দ্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। অক্ষয় কুমার মৈত্র তাঁর সিরাজদ্দৌলা বইতে বলছেন, “মুসলমানদের কথা ছাড়িয়া দাও। তাঁহারা না হয় স্বজাতির কলঙ্ক বিলুপ্ত করিবার জন্য স্বরচিত ইতিহাস হইতে এই শােচনীয় কাহিনী সযত্নে দূরে রাখিতে পারেন। কিন্তু যাঁহারা নিদারুণ যন্ত্রণায় মর্মপীড়িত হইয়া অন্ধকৃপ কারাগারে জীবন বিসৰ্জন করিলেন, তাহাদের স্বীয় স্বজাতীয় সমসাময়িক ইংরাজদিগের কাগজপত্রে অন্ধকূপ হত্যার নাম পর্যন্তও দেখিতে পাওয়া যায় না কেন?” বক্তব্যটি এক্ষেত্রে ভীষণ প্রাসঙ্গিক নয় কি?

তাছাড়া ওইদিন নবাবের দুর্গ আক্রমণের খবর শহরে রটে যেতেই দলে দলে ইংরেজ পরিবার গঙ্গাপথে পাড়ি দেন ফলতার উদ্দেশ্যে। এমনকি পালিয়ে যান কলকাতার গভর্নর ক্যাপ্টেন ড্রেকও। ফলে জাত্যাভিমানী ইংরেজ এই পরাজয়কে কোনোদিনই মেনে নিতে পারে নি। এদেশে পাড়ি জমানোর পর সে ইংরেজদের এক ভয়ানক স্মৃতি। শোনা যায় স্বয়ং ওয়ারেন হেস্টিংসও পরে কিছুদিন ছিলেন ফলতার এই অস্বাস্থ্যকর ইংরেজ ক্যাম্পে। যদিও সিরাজের কলকাতা দখলের সময়ে তিনি কাশিমবাজার কুঠিতে। সকলে কলকাতার দুর্গ ছেড়ে যাবার পরে দুর্গে জনা ৬০ ইংরেজ অফিসার ও সেনা থাকবার ইঙ্গিত পাওয়া যায় স্পষ্টভাবে। তাই সেইরাতে দুর্গে সিরাজের পক্ষে হত্যার জন্য ১২৩ জন ইংরেজ সাহেব খুঁজে পাওয়া নেহাত গল্পকথাই। ইংরেজ রাজপুরুষদের বক্তব্যে বিস্তর অসঙ্গতি। এমনকি শহরের বুকে ঘটে যাওয়া এত বড় একটা ঘটনার কথা পারদপক্ষে জানতে পারলো না কলকাতার মানুষও। এও সম্ভব? আর. উইলসন তাঁর 'ওল্ড ফোর্ট উইলিয়াম অফ বেঙ্গল' বইতেও জ্যামিতি দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে ওই ঘরে ১৪৬ জনকে বন্দি করা নিতান্তই একটি গল্পকথা। কলকাতা জয় করে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে ঘনিষ্ঠ মানিকচাঁদকে বসিয়ে মুর্শিদাবাদ ফিরে যান জয়ী নবাব। আর এদিকে জেফানিয়া হলওয়েল সাহেব শুধু নবাবের বিরুদ্ধে এই রটনা রটিয়েই ক্ষ্যান্ত হলেন নি। অন্ধকূপ হত্যার স্মৃতি নিয়ে বর্তমান মহাকরণের সামনে ১৭৬০ সালে বসিয়ে দিলেন একটি প্রকাণ্ড স্মারকস্তম্ভ। আদ্যোপান্ত ইংরেজ ঔদ্ধত্যের প্রকাশ। পরে ১৮২২ সাল নাগাদ এই স্মারক হেস্টিংস কতৃক ভেঙে দেওয়া হলেও ১৯০২ সালের ১৯শে ডিসেম্বর লর্ড কার্জন আবার সেই স্থানেই দ্বিতীয় বার প্রতিষ্ঠা করেন হলওয়েল মনুমেন্ট। কলকাতায় আবার প্রতিষ্ঠা করা হয় নবাব সিরাজের নামে সেই মিথ্যে কলঙ্কিত অধ্যায়টি। আসলে ইংরেজ শাসকরা কোনোদিনই জাত্যাভিমানের বাইরে সম্পূর্ণ বের করে আনতে পারেন নি নিজেদের রাজসত্ত্বাকে। অথচ ২০ই জুনের রাতে পরাজয়ের পর বিধ্বস্ত হলওয়েল যখন অন্ধকূপ হত্যার আষাঢ়ে গল্প তৈরি করছেন, তখন কলকাতা জয় করে ইংরেজদের শিক্ষা দিয়ে দাদুর নামে শহরের নাম পাল্টে আলিনগর করে নবাব নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন কলকাতার বুকে। প্রথম দিকে এদেশে আসা ইংরেজদের প্রথম ঘোষিত শত্রু সিরাজউদ্দৌলার কুৎসা রটাতে ও চারিত্রিক বদনাম করতে কম পরিশ্রম করে নি সাহেবরা। এমনকি টাকাও ছড়িয়েছেন দেদার। তার ওপর সিরাজের জীবনে যোগ হয়েছিল কলকাতা আক্রমণের মতো স্পর্শকাতর একটি বিষয়। স্বভাবতই ইংরেজদের লেজে পা দিয়ে তিনি আর নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন নি তারপর। ঠিক একবছর পরেই পলাশীর প্রান্তরে হাতেনাতে কলকাতা আক্রমণের ফল পান নবাব। ভয়ঙ্কর পরিণাম মাত্র ২৪ বছর বয়সে মৃত্যু। যা সারা বাংলাবাসীর কাছে আজ জানা। সে যাই হোক, ১৯৪০ সালে হলওয়েল মনুমেন্টকে শহরের কেন্দ্রে প্রকাশ্য অবস্থান থেকে সরাতে প্রথম আন্দোলন সংগঠিত করেন সুভাষ চন্দ্র বোস। শহরবাসীর সমর্থনে তিনি নামেন প্রকাশ্য রাস্তায়। তিনি বলতেন, বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের নামে কুৎসা ও ইংরেজ ঔদ্ধত্য নয়, বরং সত্য ঘটনা জানা প্রয়োজন মানুষের। ফলপ্রসুও হয় সুভাষের আন্দোলন। ১৯৪০ সালের ২৪ শে সেপ্টেম্বর রাজপথ থেকে তুলে হলওয়েল মনুমেন্টকে সরিয়ে নেওয়া হয় সেন্ট জনস চার্চের ভেতর। প্রকাশ্য অবস্থান থেকে ইংরেজ প্রতিষ্ঠিত এই মিথ্যে স্মারক স্থান পায় গীর্জার ভেতরে লোকচক্ষুর অন্তরালে। আজও রয়েছে সেখানেই। অশ্বত্থ আর আগাছার মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে অন্ধকূপ হত্যার একমাত্র জীবিত স্মারক। হত্যাকাণ্ডের সেই ঘরটিও চিহ্নিত করা গেছে পরে। বর্তমানে জিপিওকে ফেলে ফুটপাথ ধরে কালেক্টরেট বিল্ডিংয়ের দিকে হেঁটে এলে আজও মাঝখানে রাস্তার ধারেই দেখা যায় সেই ১৮ ফুটX১৪ ফুটের কুখ্যাত জায়গাটি। ডালহৌসি এলাকায় পায়চারি করলে একবার অন্তত থমকে দাঁড়ান জায়গাটিতে। আড়ম্বরহীন জায়গাটিতে তাকিয়ে ভাবুন একবার। ছাদশূন্য চাতালটি নবাব সিরাজের নামে কলঙ্কের বোঝা নিয়ে আজও কিভাবে সাক্ষী দিচ্ছে পুরনো ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের।





564 views0 comments

Recent Posts

See All

রবিবারের সন্ধে। পরিবারের সকলের মুখে হাসি। গল্পগাছা আর আড্ডাবাজি। সাথে যদি থাকে মুচমুচে সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর এই স্ন্যাকস তাহলে জমজমাট হয়ে যায় প্রতিটি মুহূর্ত। ঘরে অনেকদিন মিইয়ে পড়ে থাকা বালিতে ভাজা কিছ