• Joy

সরস্বতী পুজো কড়চা

বাঙ্গালীর সরস্বতী পুজো মানে এখন একটা রম-কম ওয়েব সিরিজ । কবে থেকে যেন এই পুজো উপলক্ষে এক নতুন সংস্কৃতির জন্ম হয়েছে। অনেকে বলেন এটা বাঙ্গালীর প্রেম দিবস, আবার অনেকে বলেন এটা বাঙ্গালী শিশু কিশোর দের পড়াশোনা শুরু করার দিন! এই দিনটা এখন একটা সফট ড্রিঙ্ক এর মত। বাচ্চা থেকে ধেড়ে খোকা খুকি সবাই খায়। তা চরণামৃত কবে থেকে কেমন করে সফট ড্রিঙ্ক হয়ে উঠল সে কথা না হয় কালের অমোঘ নিয়মের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া যাক। এই "কাল" দেব কখন যে কি করেন বলা দায়, বোঝা দায়।


পুরাণ মতে, দেবী সরস্বতী হলেন আরাধনার দেবী। শিক্ষার দেবী। শিক্ষা বলতে পাঠ্য শিক্ষা, সঙ্গীত, কলা সব-ই এর অন্তর্গত। তাই পুস্তক, বাদ্যযন্ত্র ইত্যাদি দেবীকে পুজোর সময় উতসর্গ করা হয় আর বাকি নৈবেদ্যর সাথে। অনেকটা "মায়ের ভোগে" আর কি! নাহঃ সেই প্রচলিত অর্থে নয় বলেই মনে হয়। মানে যতদিন "মা" এর পুজো বেদীর সামনে বইখাতা রাখা থাকে ততদিন তো আর পড়াশোনার কোন বালাই থাকে না, তাই "মায়ের ভোগে" বললে খুব একটা বেখাপ্পা বলা হয় না। তো যাই হোক, পড়াশোনার ধারা বদলালেও এই রীতি থেকে গেছে । মানে ধরুন - এখন করোনা কালে পড়াশোনা করা হচ্ছে কম্পিউটারে। ছাপা বই বা খাতার তো কোন তেমন দিনকাল নেই। তা সেই জন্য কোন কোন ঘরে কম্পিউটার কে দেবীর আরাধনায় দেওয়া হচ্ছে কিনা জানতে উৎসুক হই। মানে নিদেন পক্ষে ল্যাপটপ। কেউ যদি করে থাকেন তাহলে অবশ্যই এই অধম কে জানাতে ভুলবেন না।


তো যাই হোক। এই দিনটার আর একটা তাৎপর্য আছে। ভারতীয় সময় অনুযায়ী মাঘ মাস্যার পঞ্চম দিনটি পূর্ব ভারতের বিভিন্ন জায়গায় এই দিনটি "বসন্ত পঞ্চমী" বা "মাঘ পঞ্চমী" হিসেবে পালিত হয়। এই দিনটা থেকেই নাকি শীতকাল বিদায় নেয় আর বসন্ত কালের আগমন ঘটে। গাছে গাছে নতুন সবুজ কচি পাতার আবির্ভাব হওয়ার সময় এর সূচনা হয়। সর্ষেখেতের হলুদ রঙে ছেয়ে যায় তেপান্তরের মাঠ। সেই হলুদ রং যেনও সবার মনে দোলা লাগায় এক নতুন সম্ভাবনার। এই অনুভূতি মিশে যায় সরস্বতী পুজোর আধ্যাত্মিকতায়।বিদ্যার দেবীর সামনে শিশুর প্রথম হাতে খড়ি। প্রতিভাপন্ন কিশোর বা কিশোরীর গান, বাজনার রেওয়াজ এর তালিম শুরু। সেই একইরকম ভাবে সদ্য যৌবনে পা দেওয়া তরুণ তরুণীর প্রেমের কচি পাতা ফোটা -- সব-ই এই শুভারম্ভে শামিল হয়ে যায়। বড়দের জন্যও শূন্যভাঁড় ণয় এক্কেবারে। হলুদ শাড়ি বা পাঞ্জাবি পরে কলেজের দিনগুল একঝলক চেখে নেওয়া চলতেই পারে।


তরুণ তরুণীদের রমরমা চোখে পড়ার মত। রাস্তাগুলো যেনও শাহরুখ কাজলের সর্ষে খেত। স্কুল আর কলেজ প্রেমের আঁতুড়ঘর। ক্লাস এইট থেকেই বাঙ্গালীর ছেলে মেয়েদের মনে পাখা গজিয়ে যায় বলে জানা যায়। ক্লাস ১১ বা ১২ হলে তো আর কথাই নেই। অঙ্কুরোদ্গম হওয়ার জন্য প্রাণ ওষ্ঠাগত। যে স্কুল গুলো কো-এড নয় - সেখানে রীতিমত "ধুম" লেগে যায়। ধুম সিনেমার নায়কের মতই ছাত্ররা বাইকের কেরামতি দেখিয়ে অতিথি ছাত্রীবৃন্দকে "ইমপ্রেস" করতে ব্যাস্ত হয়ে পড়ে। এই ব্যাস্ততাও এক নতুন সূচনা । আগামী কলেজ জীবনের। তার মহড়া যেন।

অনেকেই ঘরের বাইরে অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়াবার অনুমুতি পেয়ে যায়। ছেলে হোক বা মেয়ে। বাবা মা রাও জানেন তাদের গুণধর ছেলে বা মেয়েটির মনের চাঞ্চল্যের কারণ। কিন্তু বাঙ্গালী ঘরে তেমন কেউ বলেন না যে " প্রেমে পড়া বারণ"। মুখে না বললেও এই রীতি যেন আচ্ছন্ন ভাবে ছড়িয়ে গেছে বাংলার স্কুলে স্কুলে, কলেজে, পাড়ায় পাড়ায়।


বাঙ্গালীর কাছে বিদ্যা, সঙ্গীত, কলা যতটাই প্রাধান্য পায় ততটাই প্রেম বাঙ্গালির মনে প্রাণে জড়িয়ে থাকে। প্রেম সারাজীবন চলতে থাকে এক গাছের মত - তার লতা পাতা মনের কোনায় কোনায় বিছিয়ে দিয়ে। সেই প্রেম এর সূত্রপাত হওয়ার এক মস্ত বড় সুযোগ থাকে এই সময়ে। তাই সরস্বতী দেবী বিদ্যার দেবী হওয়ার সাথে সাথে বাঙ্গালিদের কাছে অন্তত প্রেমের দেবী হয়ে উঠতেই পারেন। সেই শুভ সূচনা টাও নাহয় হয়ে যাক এই পুজোর দিনে! কি বলেন?

450 views0 comments

Recent Posts

See All

রবিবারের সন্ধে। পরিবারের সকলের মুখে হাসি। গল্পগাছা আর আড্ডাবাজি। সাথে যদি থাকে মুচমুচে সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর এই স্ন্যাকস তাহলে জমজমাট হয়ে যায় প্রতিটি মুহূর্ত। ঘরে অনেকদিন মিইয়ে পড়ে থাকা বালিতে ভাজা কিছ