উনবিংশ শতাব্দীর অনার কিলিং - সতীদাহ (পর্ব ১)

সেটাও কলকাতা। কিন্তু আজকের হৈ-হুল্লোড় নেই। ছোটাছুটিও নেই। নেই বাসে বাদুড়ঝোলা ভিড়ও। শুধু আছে ইংরেজ কোম্পানির সৌজন্যে কেবলমাত্র ব্যবসার প্রয়োজনে যাদুকাঠির বলে গড়ে ওঠা একটা নব্যগঠিত শহর৷ একটা ঘটনা বলি। ১৮১৭ সালে দুই তরুণী বিধবার ঢাকঢোল পিটিয়ে সতীদাহ অনুষ্ঠিত হচ্ছে কালীঘাটে। রামমোহন রায় তখন মানিকতলায়। মাঝে বিস্তীর্ণ জঙ্গল। চৌরঙ্গী। হ্যাঁ, আজকের এই গমগমে চৌরঙ্গীই। জঙ্গলে চৌরঙ্গীশ্বর মহাদেবের নাম অনুযায়ী এই নাম।



এই ঘন জঙ্গলের মধ্যে দিয়েই দুশ্চিন্তা মাথায় নিয়েই ছুটলেন রাজা। বিধবার প্রাণ বাঁচাতে৷ কিন্তু সেদিন বাঁচানো যায়নি দুই তরুণীকে। বড়দা জগন্মোহনের মৃত্যুর পর বৌদিকে জীবন্ত চিতায় উঠতে হচ্ছে জেনেও বাঁচাতে পারেন নি তাঁকেও। কিন্তু ছুটে বেড়িয়েছেন বাঙালীর রাজা। সতীদাহ হিন্দুশাস্ত্রের অবশ্য পালনীয় কর্তব্য? প্রশ্নটি বহুচর্চিত। সমাধান করলেন তিনিই। লিখলেন 'সহমরণ বিষয়ক প্রবর্ত্তক ও নিবর্ত্তকের সম্বাদ'। সতীদাহর বিরুদ্ধে মনুস্মৃতি ও অথর্ববেদ ঘেঁটে বের করলেন অকাট্য প্রমাণ। নইলে রাধাকান্ত দেব, হরিমোহন ঠাকুর, কালাচাঁদ বসুর মতো গোঁড়া সমাজপতিরা মানবেন কেন। আর কেনই না মানবেন বাংলার আপামর হিন্দু ধর্মবিশ্বাসে বেড়ে ওঠা মানুষ। যে যুগে সহমরণে যাওয়া মেয়েদের কাছে পরম পূণ্যের, যে সময়ে মেয়েদের বদ্ধমূল ধারণা সহমরণে গেলে মহাঋষি বশিষ্ঠর স্ত্রী অরুন্ধতীর মতো স্বর্গে প্রবেশ করতে পারা যায়, সেই যুগে এই প্রথার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা নেহাত ছেলেখেলা তো নয় বটেই। তাও আওয়াজ তুললেন। খানাকুলের জাতিভ্রষ্ট ব্রাহ্মণ রামমোহন রায়। সতীদাহর রমরমা তখন সবচেয়ে বেশি এই বাংলায়। আরো নির্দিষ্ট করে বলতে হলে কলকাতা ও তার পাশ্ববর্তী গঙ্গাতীরগুলোয়। আশ্চর্যের হল সবচেয়ে শিক্ষিত জায়গাগুলোতেই সতী হবার ঘটনা সবচেয়ে বেশি। প্রতিদিনই ঢাকঢোল পিটিয়ে মড়া আসে শ্মশানে আর সঙ্গে আছে চার বছর বয়স থেকে আশি বছর পর্যন্ত সদ্যবিধবা। পায়ে আলতা, সদ্যস্নাত, এলোচুল, লালপাড় গরদ আর কপালে সিঁদুরের টিপ। বিভিন্ন ভাবে সম্পন্ন হয় এই পরিকল্পিত হত্যা। কেউ কেউ নিজের ইচ্ছেয় স্বামীর জ্বলন্ত চিতায় আগে থেকেই বসে থাকেন আবার কাউকে ধরে বেঁধে জোর করে তুলে দেওয়া হয় জ্বলন্ত আগুনে। অর্ধেক পুড়ে যাবার পর ছুটে পালাতে গেলে আবার জোর করে ধরে অগ্নিপ্রবেশ। তাও তাতে সমর্থন যুগিয়ে চলেছেন মেয়েটিরই পরমাত্মীয়রা। সতীদাহ নিজে চোখে দেখবারও সে কি আগ্রহ তখন। দিগ্বিদিক থেকে ছুটে আসছে মানুষ। নিজে চোখে দেখা যাবে সশরীরে স্বর্গে যাবার মুহূর্তটি৷ চিতায় ওঠবার আগে সতী ধীরে ধীরে ছুঁড়ে দেবেন তাঁর আঁচলের খই, কড়ি বা গয়না। তার কিঞ্চিৎ ভাগ পাবার জন্য কি ভীষণ হুড়োহুড়ি। শুধু যে স্বামীর সঙ্গেই সহমরণে যাবার প্রথা তাও নয়। গর্ভবতী বা অসুস্থ নারীর ক্ষেত্রে স্বামীর মৃত্যুর বহুদিন পর তাঁর ব্যবহৃত যেকোনো জিনিস সঙ্গে নিয়ে সতীদাহের ঘটনাও দেখা গেছে। এটি অবশ্য অনুমরণ। বিজয়নগরে লিঙ্গায়েত সম্প্রদায়ে সহসমাধির প্রথাও দেখা যেত। অর্থাৎ স্বামীর মৃত্যুর পরে তাঁর সাথেই জীবন্ত সমাধি গ্রহণ। দেশ জুড়ে এমন বহু নারকীয় প্রথা। কলকাতা ও তৎসংলগ্ন হুগলী, চুঁচুড়া, নদীয়া, বর্ধমান, যশোর, মেদিনীপুর, কটক ইত্যাদি জায়গা ছিল সতীদাহর মুক্তাঞ্চল। শুনলে শিউরে উঠতে হয়, আজ যে কোন্নগর, উত্তরপাড়ার, বরানগরের গঙ্গার ঘাটগুলোয় মানুষের আনন্দ কোলাহল লেগেই আছে দিনেরাতে, সেখানেই চাপা পড়ে আছে হাজার হাজার নির্দোষ নারীর শেষ কান্না ও করুণ বাঁচবার আর্তনাদ। বিন্দুমাত্র অক্ষরজ্ঞানহীন মেয়েদের এভাবেই যুগের পর যুগ নারকীয় ও সুপরিকল্পিত হত্যা করা হয়েছে কেবল পুরুষকেন্দ্রীক সমাজের স্বার্থরক্ষায়৷ সম্পত্তি আত্মসাৎ ও উত্তরাধিকারের অধিকার কেড়ে নিতে মেয়েদের শেখানো হয়েছে ধর্মের মুখস্থ বুলি। এমনকি বর্ধিষ্ণু সমাজে সতীদাহতে উৎসাহপ্রদানের লক্ষ্যে অর্থ পুরস্কারের ঘটনাও শোনা যেত। ঘোষণা করা হত সতীর পূণ্যে তাঁর পরিবারের অর্জিত অসীম পূণ্যের কথা। এতকিছুর পরেও চ্যালেঞ্জটা জেনেবুঝে তুলে নিয়েছিলেন সুদূর ব্রিষ্টলের সমাধিতে আজও শুয়ে থাকা মানুষটা। ১৮২৯ খ্রীস্টাব্দের ৮ই আগষ্ট সমাচার দর্পণ যাঁকে 'এতদ্দেশীয় খ্যাত এক ব্যক্তি' বলে উল্লেখ করে। তিনি রাজা রামমোহন রায়। আর তাঁর সেই লড়াইয়েরই সার্থক রূপ দিয়েছিলেন উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সাহেব থেকে ডেভিড হেয়ার সাহেব, দ্বারকানাথ ঠাকুর, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, রামলোচন ঘোষদের যোগ্য সঙ্গত।

বাংলার নবজাগরণে তখন অগ্রণী ভুমিকা কলেজ স্কোয়ারের পাশে নব্যগঠিত হিন্দু কলেজের। ডেভিড হেয়ার সাহেবের সৌজন্যে তৈরি হয়েছে স্কুলবুক সোসাইটিও। বিনা বেতনে সেখান থেকে কুড়িজন করে ছাত্র সরাসরি ভর্তি হতে পারেন হিন্দু কলেজে। বিখ্যাত বাঙালী বাগ্মী রামতনু লাহিড়ীও তেমন ভাবেই হেয়ার সাহেবের সুপারিশে বিনামূল্যে ভর্তি হন কলেজে। শোনা যায় একসময় হেয়ার সাহেবের পালকির পিছনে দৌড়ে বেড়াত সাধারণ হিন্দু ঘরের ছেলেরা। দিনের পর দিন পড়ে থাকলে যদি সাহেবের নজরে আসা যায় স্কুলে ভর্তির জন্য। সেই সময়েই গোঁড়া হিন্দু সমাজের মধ্যে প্রকাশ্যে গোমাংস খাচ্ছেন ব্রাহ্মণ ঘরের তরতাজা তরুণ দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়, রাধানাথ শিকদার ও অন্যান্যরা। শোনা যায় অধিক গোমাংস খাবার ফলস্বরূপ চর্মরোগে মৃত্যু হয় বিখ্যাত সার্ভেয়র ও ডিরোজিয়ান রাধানাথ শিকদারের। বাড়ি থেকে একরকম নির্বাসিত হয়ে তাদের প্রায় প্রত্যেকেরই স্থান হয় ডিরোজিও সাহেবের বাড়ি। সতীদাহ রোধের লড়াইটা তখন বহুমুখী। যদিও কলকাতায় বহু আগে থেকেই রাস্তায় নেমে লড়াইটা করছিলেন রাজা রামমোহন রায়, দ্বারকানাথ ঠাকুররা। তার সঙ্গে শেষের দিকে সরাসরি সমর্থন জোগালেন হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক হেনরী লুইস ভিভিয়ান ডিরোজিও ও তাঁর ইয়ং বেঙ্গলের নাইটরা। ১৮২৬ সালে তিনি হিন্দু কলেজের তরুণ অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন। এদিকে শ্রীরামপুর থেকে গঙ্গার ঘাটে অনুষ্ঠিত প্রত্যেকটি সতীদাহর উপর সম্পূর্ণ নজর রেখে চলছিলেন উইলিয়াম কেরী ও জোশুয়া মার্শম্যান সাহেব ও তাদের মিশনারীর দলবল। তিনি হুগলী ও কলকাতা গঙ্গাতীরে সতীদাহর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করবার লক্ষ্যে তৈরিও করে ফেলেন বিভিন্ন ছোট ছোট দল। কেরীর সংগৃহীত তালিকা থেকে জানা যায় ১৮০৩ সালে কলকাতা ও শ্রীরামপুর সন্নিকটস্থ সতীদাহর সংখ্যা ২৭৫ জন। শ্রীরামপুর মিশন প্রেস থেকে সাপ্তাহিকী মুখপত্র সমাচার দর্পণ নিয়ম করে প্রকাশ করত সতীদাহর খবর।




( চলবে)

289 views0 comments

Recent Posts

See All

রবিবারের সন্ধে। পরিবারের সকলের মুখে হাসি। গল্পগাছা আর আড্ডাবাজি। সাথে যদি থাকে মুচমুচে সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর এই স্ন্যাকস তাহলে জমজমাট হয়ে যায় প্রতিটি মুহূর্ত। ঘরে অনেকদিন মিইয়ে পড়ে থাকা বালিতে ভাজা কিছ