উনবিংশ শতাব্দীর অনার কিলিং - সতীদাহ (পর্ব - ৩)

রাজা বল্লাল সেন কৌলিন্যপ্রথাকে যেভাবে প্রশ্রয় দিয়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, তার ফলস্বরূপ হিন্দু বাঙালী সনাতন সমাজে প্রচলন বাড়ে বহুবিবাহের মতো লৌকিক প্রথার। এই প্রথায় এক পুরুষ বহু নারীর পাণিগ্রহণ করতেন। ফলে বলাই বাহুল্য সব স্ত্রীর জন্য এক স্বামীর পক্ষে সমান কর্তব্যবোধ পালন কখনোই সম্ভব হত না। তাই কোনো বঞ্চিত স্ত্রীর দ্বারা স্বামীকে গুপ্তহত্যা বা প্ররোচনার প্রভূত সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়াও যেত না। সেক্ষেত্রে প্রথম থেকেই স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে নব্যবিবাহিতা স্ত্রীর সহমরণে যাওয়ার ভয়টা কার্যকরী করা হত খুব পরিকল্পিত ভাবে। এভাবেই আধুনিক ভারতের প্রেক্ষাপটে ধীরে ধীরে বোনা হয়ে গিয়েছিল সতীদাহের বীজ। এর ফলস্বরূপই একদিন আট বছরের বাল্যবিধবাকেও হাত পা বেঁধে স্বামীর চিতায় ছুঁড়ে দিতে দুবার ভাবেনি ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালী সমাজ।

কোম্পানি বাহাদুরের সময়ে প্রথম থেকেই বড়লাটদের নজরে ছিল এই বর্বর প্রথা। কিন্তু ধর্মে হাত দিয়ে সরাসরি দেশীয় প্রজাদের খেপিয়ে তুলে নিজেদের ঔপনিবেশিক ক্ষতি করার মতো দুঃসাহস দেখাতে পারেন নি প্রথম দিককার কেউই। নতুন বাণিজ্য, নতুন উপনিবেশ আর অচেনা জনগণ। এহেন অবস্থায় সতীদাহর মতো ধর্মীয় স্পর্শকাতর বিষয়ে হাত দিলে একেবারে সরাসরি সিপাহী বিদ্রোহেরও একটা আভাস থেকে যায়। প্রথম দিকে লর্ড ওয়েলেসলী এই প্রথাকে একেবারে সাধারণ নরহত্যা আখ্যা দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করবার জন্য অগ্রসর হন। এই উদ্দেশ্যে তিনি তৎকালীন সর্বোচ্চ বিচারালয় নিজামত আদালতের বিচারপতিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কিন্তু আদালতের বেতনভুক পণ্ডিত ঘনশ্যাম শর্মা এই লোকাচারের কিছুটা পক্ষেই মতদান করেন। তাঁর মতে, কোনো নারীকে জোর করে বা মাদকসেবন করিয়ে সতী হতে বাধ্য করা যেমন শাস্ত্রসম্মত নয়, তেমনি কেউ যদি নিজ পুত্র বা কন্যার দায়িত্ব প্রতিনিধির হাতে তুলে দিয়ে স্বেচ্ছায় সতী হন, তা কখনো শাস্ত্রবিরুদ্ধও নয়। দেশের জনগণের একটা বড় অংশ সতীদাহর পক্ষে থাকায় সে যাত্রায় আইনের কিছু সংশোধনী লিপিবদ্ধ হলেও এই প্রথা পুরোপুরি লোপ করা সম্ভব হয় নি৷ বরং বিপরীতে নিজামত আদালতের বিচারপতিরা গভর্নমেন্টকে এই প্রথা সরাসরি বন্ধ করে দিলে নতুন সাম্রাজ্যে কোম্পানির রাজনৈতিক ও সামাজিক দুর্ভোগের কথা স্মরণ করায়। ফলস্বরূপ ১৮১৩ সালে লর্ড মিন্টো নিজামতের সতীদাহ বিষয়ক সংশোধনী সার্কুলার বিধিবদ্ধ করেন। কিন্তু প্রথার বিরুদ্ধে কোনো আইন না আসায় রমরমিয়ে চলতে থাকে সতীদাহর নাম করে প্রকাশ্যে নারীহত্যা। ১৮১৯ সালে শিক্ষিত বাঙালী হিন্দু সম্প্রদায় লর্ড হেস্টিংসের কাছে সতীদাহ রদের পক্ষে একটি লিখিত দাবীপত্র পেশ করেন। কিন্তু তাতে সাক্ষর ছিল যৎসামান্যই। এই সামান্য দেশীয় সমর্থন যে আইনের জন্য যথেষ্ট নয় তা বিলক্ষণ টের পান লাটবাহাদুর। তিনি অনুভব করেন অন্তত বিলিতি পূর্ণ সহানুভূতি পাশে থাকলেও এই প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই তুলনামূলকভাবে সহজ হবে। সেই মনস্কামনায় ১৮২৩ সালে তিনি নিজের দেশে গিয়ে বিভিন্ন সভাসমিতির আয়োজন পর্যন্ত করেন ও ব্রিটেনে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৮২৩ সালে বেডফোর্ডে, ১৮২৫ সালে এডিনবরার কাছে ক্রেলে সতীদাহ বিষয়ক সভা আয়োজিত হয়। এই সমস্ত সভা থেকে প্রথম বিলেতের মাটিতে ভারতের সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে সর্বসম্মতিক্রমে আওয়াজ ওঠে। এই পৈশাচিক প্রথা বন্ধ করবার জন্য লিখিত আবেদনপত্র যায় ব্রিটিশ পার্লামেন্টেও। ইতিমধ্যে ভারতে বড়লাটের চেয়ারে বসেন লর্ড আমহার্স্ট। তাঁর সময়ে সতীদাহ বিষয়ক রাজ আইনে আবার সংশোধনী বিধিবদ্ধ হয়। কিন্তু দেশের মধ্যে আইন শৃঙ্খলা অবনতির ভয়ের কথা বলে তিনি বিলেতের কোর্ট অফ ডিরেক্টারসকে চিঠি দেন ও এই প্রথা রদ করবার বিষয়ে তাঁর অপারগতা ব্যাখ্যা করেন। এরপরই ১৮২৮ খ্রীস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল পদে বসেন লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সাহেব। তাঁর সময় সতীদাহ প্রথা রদের স্বর্ণযুগ। কারণ পদে বসেই তিনি প্রথম নজর দেন সতীদাহ বিষয়ক আইনের দিকে। এদিকে কলকাতায় শিক্ষিত সমাজের নেতৃত্বে ততদিনে গড়ে উঠেছে জনমত। নিরীহ মেয়েদের জোর করে পুড়িয়ে মারার প্রতিবাদে জনমত সংগ্রহ করতে ছুটে বেড়াচ্ছেন খানাকুলের ব্রাহ্মণ রামমোহন। কলকাতার মানুষ মুখে মুখে ছড়া কাটছে তাঁকে ও তাঁর কাজকর্ম নিয়ে। যেমন -

'সুরাই মেলের কুল,

বেটার বাড়ি খানাকুল,

বেটা সর্বনাশের মূল,

ওঁ তৎসৎ বলে বেটা বানিয়েছে ইস্কুল;

ও সে জেতের দফা করলে রফা

মজালে তিন কুল।’

কিন্তু এসবে বিন্দুমাত্র হেলদোল নেই তাঁর। ১৮১০ সালের ৮ই এপ্রিল বৌদি অলকমঞ্জরী দেবীর সহমরণের পর নাওয়া খাওয়া ফেলে তাঁর ঝাঁপিয়ে পড়া এই কুপ্রথার বিরুদ্ধে। রামমোহন রায়, কালীনাথ রায়চৌধুরী, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, মথুরানাথ মল্লিক, রাজকৃষ্ণ সিংহ, দ্বারকানাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে তখন তৈরি হয় আত্মীয়সভা। চারদিক থেকে সতীদাহ বিরোধী মত যত জোরদার হতে শুরু করে, ঠিক তেমনভাবেই উল্টোদিকে রাজা রাধাকান্ত দেব, মতিলাল শীল, রামকমল সেন, ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়দের নেতৃত্বে সতীদাহর সমর্থনে এককাট্টা হয় বাঙালীর আর একটি অংশ। সমাচার চন্দ্রিকা পত্রিকায় নিয়মিত সতীদাহর সমর্থনে লিখতে থাকেন এঁরা। এদিকে সংবাদ কৌমুদী পত্রিকায় রক্ষণশীলদের বিরোধিতা করে কলম ধরেন রামমোহন। ১৮২৯ সালে সমাচার দর্পণ, সমাচার চন্দ্রিকা সহ একাধিক সংবাদপত্রে পরপর প্রকাশ হয় সতীদাহ বিষয়ক বাদানুবাদের কলাম। অন্যদিকে দুই পক্ষের তরফেই সারা বাংলা জুড়ে শুরু হয় সই সংগ্রহ। এরপর প্রায় ৩০০ জন বিশিষ্ট মানুষের সইসম্বলিত আবেদনপত্র বড়লাটের হাতে তুলে দেন রামমোহন। সবশেষে সতীদাহর পক্ষে রক্ষণশীলদের হাজার প্রচেষ্টা ব্যর্থ প্রমাণ করে লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ১৮২৯ সালের ৪ঠা ডিসেম্বর সতীদাহ প্রথাকে আইন করে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। আইন পাশের পরপরই ১৮৩০ সালের ১৭ই জানুয়ারি রক্ষণশীলরা এক হয়ে তৈরি করেন ধর্মসভা। সতীদাহ রদ আইনের তীব্র বিরোধীতাই ছিল এই সভার মূল উদ্দেশ্য। অন্যদিকে ঐ বছরেরই ১৬ই জানুয়ারি রামমোহন রায় কলকাতা টাউন হলে এক ঐতিহাসিক সভার আয়োজন করে লর্ড বেন্টিঙ্ককে অভিনন্দনপত্র প্রদান করেন।

থেমে থাকেননি ধর্মসভার কান্ডারীরাও। সতীদাহ প্রথা রদ সংক্রান্ত আইনের বিরুদ্ধে লন্ডনে প্রিভি কাউন্সিলে পর্যন্ত অ্যাপিল করেন তাঁরা। এদিকে আইনের পক্ষে সওয়াল করবার জন্য রাজা রামমোহন রায়ের সামনে এসে যায় বিলেত যাত্রার সুবর্ণ সুযোগ। দিল্লীর মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর তাঁকে রাজা উপাধি দিয়ে বিলেতের জাহাজে উঠতে সমস্ত সহায়তা করেন। সমস্ত পক্ষের সকল আবেদন পর্যালোচনা করে ১৮৩২ সালে প্রিভি কাউন্সিলও লর্ড বেন্টিঙ্কের আইনকে সবুজ সংকেত দিয়ে ভারতবর্ষের মাটিতে সতীদাহ প্রথা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর ধীরে ধীরে ভারতে কোম্পানি শাসিত সমস্ত প্রেসিডেন্সীতেই সতীদাহ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। লক্ষ লক্ষ অলকমঞ্জরীদের প্রাণের বিনিময়ে ভারতীয় নারীদের হাতে স্থায়ী হয় অন্তত বেঁচে থাকবার স্বাধীকারটুকু।

9 views0 comments

Recent Posts

See All

রবিবারের সন্ধে। পরিবারের সকলের মুখে হাসি। গল্পগাছা আর আড্ডাবাজি। সাথে যদি থাকে মুচমুচে সুস্বাদু স্বাস্থ্যকর এই স্ন্যাকস তাহলে জমজমাট হয়ে যায় প্রতিটি মুহূর্ত। ঘরে অনেকদিন মিইয়ে পড়ে থাকা বালিতে ভাজা কিছ