গল্পঃ অখিল বিমানে ( লেখকঃ নয়ন বসু)

দময়ন্তী সেনগুপ্ত একজন সিঙ্গেল মাদার। তিনি আর ওনার পাঁচ বছরের ছেলে শুভ্র, এই নিয়ে ছোট্ট সংসার। স্বামী প্রশান্তর সঙ্গে প্রেম করে বিয়ে হয়েছিলো বছর আষ্টেক আগে। তারপর তিন বছরের মাথায় ডিভোর্স। শুভ্র তখন দেড় বছরের। তিনি পেশায় একটি প্রাইভেট অফিসের রিসেপশনিস্ট। বয়স মেরেকেটে বত্রিশ তেত্রিশের আশেপাশে হবে। চোখে সামান্য পাওয়ার আছে। কিন্তু চশমা পরতে ভালো লাগে বলে কন্ট্যাক্ট লেন্স নেননি। ওনার ধারণা চশমা ওনাকে একটা ব্যক্তিত্ব দেয়।



দময়ন্তী সেনগুপ্তর দিন শুরু হয় ঠিক সকাল সাড়ে ছটায়। উঠতে কোনোদিনই ইচ্ছে করেনা ওনার। বিয়ের আগে কোনোদিন আটটার আগে ঘুম ভাঙতোনা। মা সবসময় বলতো, শশুরবাড়ি গেলে মজা বুঝবি।  আটটা থেকে শুভ্রর স্কুল। দুটো পাড়া পরেই। উঠে আগেরদিন ফ্রিজে রাখা ভাত, ডাল, তরকারি বের করেন। দাঁত মাজতে মাজতে আয়নার নিজেকে দেখেন। এখনো মুখে ব্রনো বেরোচ্ছে। একটু বাদে নিজেই হেসে ফেলেন। এই বয়সে দেখতে কেমন লাগলো কি এসে যায় তাতে!  তারপর ভাবেন অফিসের পারমিতা সেদিন একটা ক্রিমের কথা বলছিলো। একবার ট্রাই করে দেখলে হয়। আয়নায় কোনো কোনো দিন নিজেকে দেখেন। যেদিন পাঁচ দশ মিনিট আলিস্যি করে উঠতে দেরি হয়ে যায়, সেদিন নিজেকে দেখার সময়ও থাকেনা। ভাবেন বনের হরিণীও জল খেতে এসে নদীর জলে নিজের মুখ দেখে। ফোঁস ফোঁস করে নিশ্বাস নেওয়ার সময় নদীর জল তিরতির করে কেঁপে কেঁপে ওঠে। হরিণীর মুখও তিরতির করে কেঁপে ওঠে। উনি বনের হরিণীর চেয়েও অধম! তারপর ফ্রিজের দরজা খুলতেই ভ্যাক করে বাসী খাবারের একটা গন্ধ এসে নাকে লাগে। ঢাকা দিয়ে রাখেন খাবার, তারপরেও বেরোয়। হরিণীর মুখটা আরেকবার মনে পড়ে যায়। ধীরে ধীরে একটি বনের হরিণী সবুজ কচি মুথাঘাসের মধ্যে মুখ ডুবিয়ে দিচ্ছে। সাবলীল গ্রীবা নেমে আসছে মাটির কাছাকাছি।  তারপর তিনি শুভ্রকে ডাকতে যান। শুভ্রও ওনার মতো ঘুমকাতুরে। প্রতিদিন সকালে দেখেন কুঁকড়ে মু‌ঁকড়ে শুয়ে আছে ছেলেটা। অবিকল একটা আদুরে খরগোশের মতো দেখতে লাগে শুভ্রকে। ডাকতে মায়া লাগে। প্রতিদিন হেঁড়ে গলায় ডাকার আগে তিনি শুভ্রর মাথায় আলতো করে একবার হাত বুলিয়ে দেন। তারপরই শুরু হয়, কিরে ওঠ বাবা, দেখ কটা বাজে! দেরি হয়ে যাবে তো এবার! খাকিক্ষণ পর, গার্জেন কল হলে আমি কিন্তু যেতে পারবোনা। এবার না উঠলে পিঠে পড়বে!


একটা সাদা ধবধবে আদুরে খরগোশের মতোই শুভ্র চোখ পিটপিট করে উঠে পড়ে। উঠেই বাথরুম। তিনি ঠান্ডা ভাত আর নিউট্রেলার তরকারিটা বের করেন। শুভ্র নিউট্রেলাটা ভালোবাসে। মাছটা রাতে বের করবেন। এতো সকালে তাড়াহুড়োর মধ্যে কাঁটা বাছাটা ভয়ের ব্যাপার। মাইক্রোওভেনে দুমিনিট ভাতটা বসিয়ে মোবাইলটা অন করেন।  খবরের কাগজ নেওয়া অনেকদিনই বন্ধ করে দিয়েছেন। ই সাবস্ক্রিপশন আছে। আগে ফেসবুকের আইকনটা দেখেন। মাথার ওপর এক, দুই কিছু থাকলে আগে ওটা খোলেন। না থাকলে খবরের কাগজের হেডলাইন পড়েন। এরমধ্যেই টিং করে একটা আওয়াজ আসে। ভাত বের করে নিউট্রেলাটা ঢোকান। ততক্ষণে চোখ রগড়াতে রগড়াতে শুভ্র এসে বসে গেছে টেবিলে। ছোটবেলায় বাগস বানি বলে একটা কার্টুন হতো। বদমাইশ একটা খরগোশ, তার হাতে একটা গাজর। শুভ্রকে বাগস বানির মতো দেখতে লাগছে অনেকটা। কিন্তু শুভ্র গাজরটা একদম খেতে চায়না। কতবার বলেছেন, ভিটামিন এ, চোখ ভালো হবে। কে শোনে কার কথা! তাড়াতাড়ি খাইয়ে দাইয়ে চান করাতে ঢোকেন শুভ্রকে। এই একটা জিনিস ছেলেটা ভালোবাসে। ছপাস ছপাস করে বালতির জলে চাপড় মারবে আর দময়ন্তীর নাইটি ভিজে যাবে। উনি বড় বড় চোখ করে তাকাতে গিয়ে একসময় নিজেই হেসে ফেলবেন।  মাথা মুছিয়ে স্কুলের ইউনিফর্ম পরাবেন। ব্যাগ আগের রাতে গোছানো থাকে। নিজে একটা সালোয়ার গায়ে চড়িয়ে নেন। তারপর ছেলের হাত ধরে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। ফ্ল্যাটের চাবি দেওয়ার সময় একটা খলবল চকাস চকাস আওয়াজ হয়। এই আওয়াজটা কানে গেলে দময়ন্তী সেনগুপ্ত বুঝতে পারেন, এবার আজকের দিনটা শুরু হলো! ফ্ল্যাটের দারোয়ান ছনুলাল এই সময়টা ঘুমোয়। সবাই জানে, সবাই দেখে। কিন্তু কেউ খুব একটা মাথা ঘামায়না। ঘুমন্ত বয়স্ক ছনুলালকে দেখলে দময়ন্তী সেনগুপ্তর চাচা চৌধুরীর কথা মনে পড়ে যায়। ছোটবেলায় খুব নেশা ছিলো। চাচা চৌধুরীর মতোই সাদা পুরুষ্টু গোঁফ ছনুলালের।  এমন সময় নিজেকে সাবু বলে মনে হয় দময়ন্তী সেনগুপ্তর। বিরাট, স্বয়ম। আর সাবু রেগে গেলে দূরে কোথাও কোনো নাম না জানা আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়তো। তিনি মা খরগোশের মতো কান খাড়া করে থাকেন। কিছুই শুনতে পাননা। কিন্তু বুঝতে পারেন এই সকালবেলা কুরুক্ষেত্রের প্রান্তর থেকে বহুদূরে, বহু বহুদূরে কোথাও সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছে! ছেলেকে স্কুলে দিয়ে দাঁড়ানোর সময় থাকেনা। অনেক মা দাঁড়িয়ে থাকে, আড্ডা মারে। ওনার সেই লাক্সারি নেই। তিনি দেখতে থাকেন একঝাঁক রঙিন মাছের ঝাঁকের মধ্যে সাদা জামা নীল প্যান্ট শুভ্র গাঢ় সবুজ একটা মাছের মতো কলকল করতে করতে মিশে গেলো।  দময়ন্তী সেনগুপ্তর মামার বাড়ি ছিলো গ্রামে। পুকুর ছিলো। ছোটবেলায় মাছ ধরতে বসতেন মামার সঙ্গে। মামা খালি বলতো, বড় মাছ ঘাই মারছে। ঘাই মারা কি তিনি সেদিন বুঝতেননা। আজও সঠিক বোঝেননা। কিন্তু নিজেকে বড় মাছ লাগে তখন। ঘাই মারছে সেই মাছ। গুব গুব একটা আওয়াজ আসছে।  শুভ্রর রঙিন মাছেদের মিছিলে মিলিয়ে যাওয়ার দৃশ্যটা মরুভূমিতে বৃষ্টির মতো উপভোগ করেন তিনি। জলের সবকটা অনু পরমাণু ইলেকট্রন প্রোটন কোয়ার্ক সব শুষে নেন দুটো চোখ দিয়ে। এরপর তিনি শশব্যস্ত খরগোশের মতো পায়েলের মাকে খোঁজেন। অন্য সেকশনে কি হবে খবর নেন। বিনতা মিস ওদের সেকশনে এক্সট্রা কিসব পড়াচ্ছে! প্রবালের মাও বলে এরকম করলে শুভ্র আর প্রবালের ক্লাসটিচারকে বলতে হবে ওদেরও এইসব করাতে।  ঘড়িতে সোয়া আটটা বাজলো। কারখানার ভোঁ বাজার মতো একটা অনুভূতি হয় ওনার। এবার ছুটতে হবে। প্রাইভেট অফিস। লেট করা চলবেনা। তিনটে লেট মানে একদিনের মাইনে। এই বাজারে অনেকটাকা।  ফেরার পথে টুক করে বাজারে ঢুকে কলাটা মূলোটা কিনে নেন। অফিস থেকে ফেরার সময় কিনতে গেলে বেশিরভাগ সময় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। শার্লক হোমসের মতো সরু চোখে খুঁজতে থাকেন টাটকা উচ্ছে বেগুন পটল ঝিঙে।  বাজার করা আসলে একটা শিল্প। প্রশান্ত থাকতে অন্য অনেককিছুর মতোই এই শিল্পটা থেকেও তিনি বঞ্চিত ছিলেন। প্রথমে ভেবেছিলেন বাজার করতে অতি বিশ্রী লাগবে। প্রথম কয়েকদিন লেগেওছিলো। তারপর বেশ ভালো লাগতে শুরু করে। দরদাম করে পঁয়ত্রিশের কুমড়ো তিরিশে নেওয়ার মধ্যে একটা অন্যরকম তৃপ্তি আছে। আপেল একদিন একশোটাকা কেজি থেকে শুরু করে আশি অবধি নামাতে পেরেছিলেন।  এসব করার পর নিজেকে অলিম্পিকের গোল্ড মেডেলিস্ট মনে হয় ওনার। ওই তিনটে পেডেস্ট্রিয়াল ফার্স্ট সেকেন্ড আর থার্ড। তিনি ফার্স্টের জায়গায় দাঁড়িয়ে হাসিমুখে পদক পরছেন অমিতাভ বচ্চনের হাত থেকে। গম্ভীর গলায় তিনি বলছেন, দেবীও অউর সজ্জনও, আজ কি খেলকা পহেলা বিজেতা.. সবচেয়ে মনোযোগ লাগে মাছের বাজারে। সবাই দিদি দিদি বলে ডাকবে আর বরফের পোনা গচানোর তাল করবে। এবছর ইলিশ ভালো উঠেছে। এক একটা ইলিশ দেখলে প্রেমে পড়ে যেতে ইচ্ছে করে। চকচক করছে গা টা। বাল্বের হলুদ আলো পড়েও বিচ্ছুরণ হচ্ছে!  দিদি, কম করে দেব! নিয়ে যান। ইংলিশ অনার্স দময়ন্তী সেনগুপ্ত মুহূর্তের মধ্যে টোডরমল হয়ে যান। মাইনে পেতে এখনো বারোদিন বাকি। শুভ্রর স্কুলের ফিস, বাসন্তীর মাইনে, কেবলের বিল, নেটের খরচ আছে। খোকা ইলিশ খাওয়া না খাওয়া এক ব্যাপার।  বাড়ি এসেই টোডরমল চান করতে ঢোকেন। সারা গায়ে সাবান মাখতে মাখতে কোনো কোনো দিন একটা বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ে যায়। ছোটবেলার বিজ্ঞাপন। একটা মেয়ে ঝর্ণার জলে চান করছে। এখনকার বিজ্ঞাপনগুলো সব দেখায় মার্বেলের বাথটবে হিরোইন চান করছে। কিন্তু দময়ন্তী সেনগুপ্ত ঝর্ণা চান। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখেন রুক্ষ চুলগুলো ভিজে ভিজে ঝর্ণার মতো বুকের ওপর এসে পড়ছে। তিনি ঝরঝর শব্দ শুনতে পান ঝর্নার। তারপর ঝপাস ঝপাস আওয়াজ। পাথরে এসে ধাক্কা খাচ্ছে ঝর্ণার জল!  এক সেকেন্ডের জন্য হলেও নিজেকে ঐশ্বরিয়া রাই ভাবতে ইচ্ছে করে তখন। কোন একটা সিনেমায় এই ঝর্ণায় একটা গান ছিলো। অভিষেক বচ্চনও ছিলো। ভিলেনের মতো। যেন টেনে নিয়ে যাবে মেয়েটাকে ঝর্ণার ওপর দিয়ে।  মাথায় জল ঢালতে ঢালতে দময়ন্তী সেনগুপ্ত চোখ পিটপিট করেন। মহানগরের মাধবীর কথা মনে পড়ে যায়। আয়নার কাঁচগুলো ঝাপসা হয়ে যেতে থাকে আস্তে আস্তে। মাধবী মুখার্জী চোখে আই লাইনার লাগান, ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। লিপস্টিকটা লাল, প্রেপি রেড লেখা আছে। কিন্তু ওনার ডার্ক লিপস্টিক বেশি পছন্দ। র‍্যাসবেরি গোছের। কিন্তু ভয় লাগে পরতে। একে ডিভোর্সি, তায় এক বাচ্ছার মা। নিজের অস্বস্তি লাগে। তায় আবার কে কি বলবে! এরপর শিরস্ত্রান পরে ঝাঁসির রাণী যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন। হেমন্তের অরণ্যের ফাঁক দিয়ে গলে তিনি বাস স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ান। ভোরের নরম রোদ কেটে গিয়ে তখন ঝাঁঝাঁ করছে চতুর্দিক। চোখে চশমা, পরণে কোম্পানির নিজস্ব পোশাক। ওনার মতোই কিছু যোদ্ধা শিরস্ত্রান পরে চতুর্দিকে দাঁড়িয়ে আছে। বাস এলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে সবাই।  এইসময়ের মানুষগুলোকে দেখলে অন্যরকম লাগে। শেয়ালের মতো। মুখগুলো সরু ছুঁচোল হয়ে আছে, চোখগুলো কুতকুত করছে। মাথাটা সামান্য ঝুঁকে আছে সামনের দিকে। দময়ন্তী সেনগুপ্তকেও নিশ্চয়ই এরকম লাগে দেখতে।  ঠিক এই সময়টা আবার বড্ড ক্লান্তও লাগে। অন্য অনেক সময়েও লাগে। কিন্তু এই সময়টা বেশি লাগে। তিনি জানেন একটু পরেই একটা যুদ্ধ শুরু হবে। সেখানে নারী পুরুষ একাকার। ধস্তাধস্তি, ঘামের উৎকট গন্ধ, সিট নিয়ে মারামারি, লেডিস সিট অবধি পৌঁছতেই একযুগ সময় পার হয়ে যাবে। এবং ঠিক তক্ষুনি সামনের হোর্ডিংএ ওনার প্রতিদিন চোখে পড়বে মাদার টেরেসার একটা ছবি। লেখা থাকবে, The fruit of faith is love! যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার আগে ঘেন্না ভরে নিতে হয়, আক্রোশে ফেটে পড়তে হয় হে মহাপৃথিবী! আর একবার বুকের ভেতর যুদ্ধ ঢুকিয়ে ফেলতে পারলে আর চিন্তা নেই। তারপর পাথর আপনাআপনি গড়িয়ে চলে সবকিছু চূর্ণ করতে করতে, আল্টিমেটলি নিজে বিচূর্ন হতে। অফিসে গিয়ে সুবর্ণলতা প্রথমে বসের ঘরে যাবে। তারপর সেদিনের মিটিংয়ের শিডিউল নিয়ে নিজের চেয়ারে এসে বসবেন। আড়চোখে দেখবেন শিউলি আজ কি রঙের লিপস্টিক পরে এসেছে। মেয়েটা সদ্য কলেজ পাস করে চাকরিতে ঢুকেছে। দেখতে শুনতে বেশ। কিন্তু বড্ড বেশি হাসে, আর শব্দ করে হাসে। মেয়েদের এতো আওয়াজ করে হাসা উচিত নয়। একটা ছেলে আসে মাঝে মাঝে অফিস থেকে নিতে।  একদিন শিউলি আলাপ করিয়ে দিয়েছিলো বন্ধু বলে। প্রতীক ছেলেটার নাম। কলেজের সিনিয়র। প্রতীক হেসে দিদি বলে নমস্কার করেছে। ছেলেটার চাউনিটা ভালো নয়। নাকি ওনার মনের ভুল? দময়ন্তী নিজে ঠিক শিওর নন। ওনার মনের ভুলও হতে পারে। কিন্তু মাঝে মাঝে তিনি শিউলিকে মজার ছলে জিজ্ঞেস করেন, প্রতীকের কি খবর? শিউলি বলে, দিদি ও তো তোমার ওপর পুরো ফিদা! খালি তোমার কথা বলছিলো আগেরদিন। আমি আর আনবোনা ওকে এখানে! বলে শিউলি একগাল হাসবে মুখ টিপে। দময়ন্তী সেনগুপ্ত ধ্যাৎ বলে চুপ করিয়ে দেন শিউলিকে। ওনার গাল লাল হতে থাকে। বাথরুমে যাওয়ার নাম করে একবার আয়নায় নিজেকে দেখে আসেন। শিউলি মিথ্যে বলছে, তিনি জানেন। ওনাকে দেখতে আগের মতো আর নেই। চিন্তায় ক্লান্তিতে তিনি জর্জরিত। চোখের তলায় হালকা কালি পড়েছে, গালে ব্রনো। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। দাঁত দিয়ে তিনি ঠোঁটটা চেপে ধরেন একবার। কে জানে, শিউলি বানিয়ে বলছে কিনা! ওনারা চারপাঁচজন বন্ধু একসঙ্গে মিলে টিফিন করেন। লিপিকার বর সদ্য প্রমোশন পেয়েছে, বাবলির মেয়ে ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছে এইসব। সোহিনীদির ওয়াটসআপের ডিপিতে ওর সঙ্গে ওর বরের জড়িয়ে ধরে তোলা একটা ছবি। হোৎকা মতন দেখতে সোহিনীদির বরটাকে। কিন্তু মানুষটা দিলখোলা। একবার দুবার এসেছিলো অফিসে। পম্পি খবর দেয় শিউলির সঙ্গে প্রতীকের নাকি ঝামেলা হয়েছে। লিপিকা বলে ওই মেয়ের সঙ্গে কেউ বেশিদিন টিকতে পারবেনা। আরে নিজের একটা পারসোনালিটি রাখতে হয়! সবসময় হ্যাহ্যা হিহি। দময়ন্তী সেনগুপ্ত প্রতিবাদ করেন। হাসে তো ভালো কথা! ছেলেরা জোরে হাসলে ঠিক আছে আর মেয়েরা জোরে হাসলে পারসোনালিটির অভাব? এটা কিন্তু ঠিক নয় লিপিকা! তোর না ছোটটা মেয়ে? নিজেকে একটা সময় পর পথের পাঁচালির দুর্গা মনে হয় ওনার। শিউলির হাত ধরে তিনি ছুটছেন একটা মাঠের মধ্যে দিয়ে। পেছন থেকে ছৌনাচের মুখোশ পরা একটা লোক ঝমঝম করতে করতে ধরতে আসছে। একপাশে পুকুর, আরেকদিকে কাশবন। ছুটতে ছুটতে ওনারা পেরিয়ে যাচ্ছেন রেললাইন, কুঁড়েঘর, সিঁথির মোড়ের সার্কাসের তাঁবু, বাজারের ফলের দোকান, শুভ্রর স্কুল। একটা সময় পর তিনি আর শিউলি একটা হাঁপাতে হাঁপাতে একটা পুকুরে চবাং করে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারপরেই দেখতে পান শিউলি কিছু পরে নেই! শিউলির ফিগার দেখে ওনার হিংসে হতে থাকে। আগের বস ছিলেন শৈলেনবাবু, বয়স্ক লোক। এখন যিনি এসেছেন তিনি অনেক ইয়ং। চল্লিশ বিয়াল্লিশ হবে। সোহিনীদি ফিসফিস করে বলে, বিয়ে হয়নিরে এখনো। দেখতে শুনতে খারাপ নয়। তোকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেও রে। ধুর তুমি যে কি বলো সোহিনীদি! ঠোঁটটা আরেকবার চেপে ধরে দময়ন্তী সেনগুপ্ত। অফিসের কাজ সামান্যই। ঘড়ি দেখেন তিনি। বারোটা বাজলে বাসন্তী শুভ্রকে স্কুল থেকে আনতে যাবে। বারবার বলে দেন দেখা হলে মিসকল দিতে। মেয়েটা দিনে দিনে বেয়াড়া হয়ে যাচ্ছে! শুভ্রকে বাড়ি গিয়ে খাবার গরম করে দেবে। বিকেলে মুড়ি দেবে। সন্ধ্যেবেলা তিনি বাড়ি ফিরলে বাসন্তী যাবে।  লিপিকা অফিসের বন্ধুদের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ খারাপ কথা বলে। খারাপ বলতে সেক্স লাইফ নিয়ে। মাঝে মাঝে কান লাল হয়ে যায় ওনার। কিন্তু ভালোও লাগে শুনতে।  একটা ডটপেনের ঢাকা দিয়ে দাঁত খুঁচোন দময়ন্তী সেনগুপ্ত। ওনার ধারণা ওনাকে তখন মেঘে ঢাকা তারার সুপ্রিয়া দেবীর মতো লাগে। নীতার মতন। কপালের ওপর এসে পড়া চুলগুলো সরান আলগোছে। আবার একটা চিঠি করতে দিয়েছে বস। এটা ওনার কাজ নয়। তাও বারবার এইকাজটা করেন বস। প্রাইভেট অফিস, কিছু বলাও যায়না! ফেসবুকটা খুলে দেখেন মাঝেমধ্যে। এ ওখানে বেড়াতে গেলো, ও ওখানে সিনেমা দেখছে, এর রক্ত দরকার, ওর ছেলের অপরেশনের জন্য পয়সা লাগবে। কোনো নোটিফিকেশন নেই। সাড়ে তিনটে বাজে। তার মানে শুভ্র এখন ঘুমোচ্ছে। নীতা চিঠি করে বসের ঘরে দিয়ে আসে। বলে আসে আজ একটু আগে বেরোবে। কোনো দরকার নেই। এমনিই বললো। মঞ্জুর হয় কিনা দেখে নেওয়া যাবে। মঞ্জুর হয়ে গেলো। নিজের ডেস্কে ফিরে নীতার মনে হলো অনেকদিন দাদার কোনো খবর নেওয়া হয়নি। দাদা ওর থেকে তিন বছরের বড়। দাদার মেয়ে রুক্মিণী এখন ওয়ানে পড়ে। খুব মিষ্টি। ঠিক ওর মায়ের মতো। প্রমীলা ওর মায়ের নাম। সবাই বেশ আছে। সেও বেশ আছে। ওর থেকে খারাপ কতোলোক আছে! তাদের তুলনায় সে তো স্বর্গে আছে! এই উপলব্ধিটা ওনার আসে অফিস ছুটির ঘন্টাখানেক আগে থেকে। তখন নিজেকে হালকা মেঘের মতো মনে হয়। মেঘের মাথা থেকে তিনি সবকিছু দেখছেন। অনেক নীচে কোলকাতা শহর, তার বাড়ি গাড়ি অফিস মাঠ ধোঁয়া হাড়গোর মাংস। নিজেকে তখন মেঘরাজ লাগে দময়ন্তী সেনগুপ্তর। হালকা মেঘের শরীর তিনি ভাসিয়ে দেন কোলকাতা শহরের মাথায়। শহরের আকাশে মেঘের ঘুড়ির মতো উড়তে থাকেন তিনি। ওই ওখানে গঙ্গা, ওটা ময়দান, ওইতো ভিক্টরিয়া দেখা যাচ্ছে! ঐখানে বাড়ি দেখা যাচ্ছে, ছাদে লাল একটা শাড়ি আর দুটো সায়া ঝুলছে। এই শাড়িটা বিয়েতে কাজলীমাসি দিয়েছিলো। একটু পর শুভ্রর স্কুল দেখা যাচ্ছে। একটা ঢং ঢং ঘন্টার আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে যেন! হয়তো এক্ষুণি সেই লালনীল মাছেদের দল ছড়িয়ে পড়বে দিকে দিকে। তারপর দমদমে প্লেন ল্যান্ড করার সময় যেমন আস্তে আস্তে বাড়িগুলো ছোট থেকে বড় হতে থাকে, ওনারও অবিকল সেরকম হয়। অবশেষে সাড়ে পাঁচটা নাগাদ মেঘরাজ বাসস্ট্যান্ডে এসে ল্যান্ড করেন। ততক্ষণে তিনি অনেকটা মর্ত্যের কাছাকাছি নেমে এসেছেন। সারাদিন পর ভিড় বাস দেখলেই কান্না পেতে থাকে ওনার। সুপারম্যান হলে বেশ হতো, সুপারম্যানের খুব মজা। ভিড় বাস মেট্রোতে উঠতে হয়না।  বাসে মাঝে মাঝে সব ঠিক থাকে। মাঝে মাঝে আবার কুমীরের মতো কিছু লোক থাকে। সুন্দরবনে তিনি দেখেছিলেন একবার। কাদায় মাখামাখি হয়ে নদীর তীরে রোদ পোয়াচ্ছে। দেখলেই ঘেন্না আসে। অথবা আরশোলার মতো। ছোটবেলায় তিনি খুব ভয় পেতেন। গায়ে এসে বসলেই তিড়িং বিড়িং করে লাফাতে থাকতেন। বাবা মেরে দিতো তারপর। বাবা এখন কি করছে? রুক্মিণীর সঙ্গে খেলছে হবে। বাইপাসটা করার পর থেকে দাদা একদম বেরোতে দেয়না। তারপর থেকে ওই নাতনি আর শুভ্র গেলে শুভ্র। এই নিয়েই আছে লোকটা। হঠাৎই কোনো কারণ ছাড়া দময়ন্তী সেনগুপ্তর কান্না পেয়ে যায়। কেন এটা হয় কে জানে!  যখন কান্না পায় তখন মনে হয় পৃথিবীর সব লোক মরে যাক। মনে হয় একটা লাল মাঠের মধ্যে তিনি একলা দাঁড়িয়ে আছেন। মাটি ফেটেফুটে গেছে। লাল টকটকে মাটির ওপর কালো কালো ফুটিফাটার দাগ।উনি যেখানে বসে কাঁদছেন, তার ঠিক পেছনেই একটা কঙ্কালসার গাছ। কোনো পাতা নেই, সুখনো খটখটে। আকাশটাও লাল। কোনো মেঘ নেই। তখন কারুর কথা মনে থাকেনা, বাবার কথাও নয়, ওই আরশোলার মতো লোকগুলোর কথাও নয়। মনে হয় শুধু তিনি মন খুলে কাঁদবেন এবং আস্তে আস্তে এই লাল পৃথিবীর ফুটিফাটাগুলো বড় হতে হতে তাকে টেনে নেবে মাটির ভেতরে। ভিড় বাস থেকে মোটামুটিভাবে তিনি সাড়ে ছটা নাগাদ নামেন। নেমেই দেখতে পান লেখা আছে,  The fruit of faith is love. যেদিন বাবার কথা মনে পড়ে, সেদিন আরো বেশি মন খারাপ লাগে দময়ন্তী সেনগুপ্তর। হেমন্ত মুখার্জি আর শ্রাবন্তী মজুমদারের ওই গানটার কথা মনে পড়ে যায়। আয় খুকু আয়। বাবা মেয়েকে ডাকছে, তাও সেটা দুঃখের গান। মেয়ে হয়ে জন্মানোটাই দুঃখের। মাঝে মাঝে মনে হয় ওনার।  এরপর তিনি হাঁটতে থাকেন। এক এক করে তিনি পার হয়ে যান শিবুর চায়ের দোকান, আগরওয়ালাদের চপের দোকান, মহিমস্যারের কোচিন সেন্টার, অতীনদের জেরক্স, হরিদার রোলের দোকান, ছোটবেলায় বানানো পুতুলের বাড়ি, প্রথম খেলনাবাটি, চটের স্কুলব্যাগ, স্কুল ইউনিফর্ম, প্রথম ক্রাশ, প্রথম পাওয়া প্রেমপত্র, বন্ধুর মোবাইলে প্রথম লুকিয়ে নীল ছবি, কলেজ ফেস্টে জল ভেবে খাওয়া ভদকা, বাবা, মা, দাদা বৌদি রুক্মিণী, আরশোলা, লাল পিঁপড়ে, ফুলশয্যা, কোর্ট কাছারি আরও কত কি!  সহস্র লক্ষ জন্ম পার হয়ে সুজাতা এসে দাঁড়ালো ঈশ্বরের সামনে। একবাটি পায়েস নিয়ে।  দময়ন্তী সেনগুপ্ত বাড়ি ফিরেই চেঁচাতে থাকেন, বাবু কোথায় গেলি, এই দেখ কি এনেছি তোর জন্য! শুভ্র ছুটে এসে ওনার হাত থেকে ছোট্ট ক্যাডবেরির প্যাকেটটা ছিনিয়ে নেবে। তারপর খিলখিল করে বলতে থাকবে, দেবোনা, দেবোনা। মুখ দিয়ে নিঃশ্বাস নেবে তখন শুভ্র। উলতস উলতস করে একটা আওয়াজ আসবে। আর বড় বড় গোল গোল চোখ করে রাংতামোড়া পায়েসটা মুখের সামনে দোলাতে দোলাতে শুভ্র বলতে থাকবে, কাউকে দেবোনা, কাউকে না! বাসন্তী মোবাইলে খুটুর খুটুর করছিল। দময়ন্তী সেমগুপ্তকে দেখে বলে, দিদি খাবার সব ফ্রিজে তুলে দিয়েছি। আর দিদি, পুজো আসছে, এবার কিন্তু একটা সিল্কের শাড়ি নেবো!  দময়ন্তী সেনগুপ্ত মাঝে মাঝে মার্গারেট থ্যাচার হয়ে যান। কঠিন গলায় বলেন, গতমাসে তিনদিন ছেলেটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিলো স্কুলের পর। মিসকল দেওয়ার কথা তো তোমার কোনোদিনই মনে থাকেনা। আর এখন পুজোর শাড়ি! বাসন্তী গজগজ করতে করতে বেরিয়ে যায়। থ্যাচার ম্যাডাম বাথরুমে ঢোকেন। বাথরুমে গিয়ে সব ছেড়ে ডিমের মতো ফেটে যান দময়ন্তী সেনগুপ্ত। শিউলি যেরকম ডার্ক লিপস্টিক পরেছিল আজ, সেরকম একটা লিপস্টিক চাই ওনার। মেয়েটা বড্ড জোরে হাসে। উনি আয়নার দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করেন। ঘরঘর একটা শব্দ ছাড়া কিছুই বেরোলনা। আয়নাটা নোংরা হয়েছে। পেছনে কি কেউ দাঁড়িয়ে? দময়ন্তী সেনগুপ্ত গভীরভাবে আয়নার দিকে তাকান।  তারপর তিনি শাওয়ার চালিয়ে দেন। চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকেন খানিকক্ষণ। বাথরুমের দরজার তলার দিকে একটা আরশোলা। কিছু করছেনা, চুপ করে বসে আছে খালি। ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে তিনি একটা মুড়ির বাটি নিয়ে বসবেন। চানাচুর কি বাদাম ছড়িয়ে দেবেন ওপরে। শুভ্রকে ম্যাগি করে দেবেন কি পাউরুটি সেঁকে দেবেন। কোনো কোনোদিন সঙ্গে একটা মামলেট। এরপর তিনি পড়াতে বসবেন শুভ্রকে।  শুভ্র বদমাইসি করলে বকা দেবেন। শুভ্র বলবে ফিফটি প্লাস থার্টি হলো এইটটি। তিনি শুনতে পাবেন টিসিএস, ইনফোসিস, নীলরতন, মেডিকেল, বড় গাড়ি, বড় ফ্ল্যাট, আন্দামান, আল্পস, পূর্ণিমা, জোয়ার, ভরা কোটাল, ওই দেখ দময়ন্তী ম্যাডামের ছেলে এইসব।  বাবাকে কয়েকদিন ফোন করা হয়নি। পুজো আসছে, বাবার জন্য একটা ভালো পাঞ্জাবি কিনতে হবে। প্রতীককেও পাঞ্জাবি পরলে খুব সুন্দর দেখতে লাগবে। শুভ্রর জন্য একটা দামি খেলনা বন্দুক কিনবেন। লেজার লাগানো। অনেকদিন ধরে বায়না করছে ছেলেটা। নিজের জন্য একটা লিপস্টিক। ডার্ক কি পরবেন তিনি? নিজেই ডিসাইড করতে পারেননা।  অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যাওয়া হয়নি। শুভ্র হঠাৎ করেই বলে ওঠে, মা পুজোয় মামার বাড়ি যাবে? দময়ন্তী সেনগুপ্ত মিষ্টি হেসে বলেন, যাবো। রাতে তিনি শুভ্রকে কাঁটা বেছে মাছ দেবেন। শুভ্র বসে ইউ টিউবে ভিডিও দেখবে, তিনি একটা একটা করে গরস মুখে তুলে দেবেন। ছেলেকে খাওয়াবার সময় তিনি মোবাইল নেননা। একবার এইকরে খাওয়াতে গিয়ে গলায় কাঁটা ফুটে গেছিলো। তারপর তিনি নিজে খেতে বসবেন। অলীক আলোয় দেখবেন শুভ্র ওনার পাশে বসে ইউ টিউবে শিনচ্যান দেখছে। নিজের মনে হেসে উঠছে। এক এক সময় উত্তেজিত হয়ে দুহাত শক্ত করে মুঠো করে নিচ্ছে, দাঁতে দাঁত চিপছে। তিনি ভাত ডাল তরকারি মাখবেন, মাছ নেবেন। অফিসের ঈশানি সেদিন একটা নতুন রেসিপি বলছিলো মাছের। ওটা একদিন ট্রাই করতে হবে। রাতে শুতে শুভ্র খুব একটা প্রবলেম করেনা। সাদা খরগোশের মতো শুভ্র গুটিসুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়বে। লিপিকার কান লাল গরম করা গল্পগুলো মনে পড়বে ওনার। উনি এখনও ঠিক করে উঠতে পারেননি ডার্ক শেড লিপস্টিক নেবেন কি নেবেননা।  মোবাইলটা হাতে নেন তিনি। কোনো নোটিফিকেশন নেই। কোনো মেসেজ নেই। অনেকদিন প্রোফাইল পিক চেঞ্জ করা হয়নি। তুলেই বা কে দেবে! অন্ধকারে তিনি সেলফি মোডটা অন করেন। আবছা আবছা দেখতে লাগে নিজেকে। নাইটির বুকটা টেনে একটু খোলামেলা করে দেন। অন্ধকারে কিচ্ছু বোঝা যাচ্ছেনা। খচমচ শব্দ হলো একটা। শুভ্র উঠে পড়লো নাকি? উনি তাড়াতাড়ি মোবাইলটা নামিয়ে রাখেন। না, পাশ ফিরে শুলো ছেলেটা। মামার বাড়ি যাবে বলছিলো ছেলেটা। আসলে কথা বলার লোক পায়না তো! ওখানে তবু দাদা বৌদি আছে, দাদুকে পায়, রুক্মিণী আছে।  দময়ন্তী সেনগুপ্ত মোবাইলের নেটটা অফ করে সাড়ে ছটায় এলার্ম দিলেন। ঘুমঘুম পাচ্ছে এবার।  শুভ্রর মামারবাড়িটা পাহাড়ে হলে খুব ভালো হতো। বেশ সাদা বরফে ঢাকা পাহাড়! সকালে সূর্যের আলো পড়ে সোনার মতো লাগবে পাহাড়ের চুড়োগুলো। ঝকঝকে নীল আকাশ হবে একটা। মহালয়া আর কতদিন পরে? পরের সপ্তাহে মনে হচ্ছে। অফিস কি ছুটি ছিলো গতবছর? মনে আসছেনা এখন। চোখের ওপর মোম বুলিয়ে দিচ্ছে যেন কেউ। দময়ন্তী সেনগুপ্ত স্বপ্ন দেখলেন সাদা পাহাড়ের মাথায় একটা বেদী করা আছে। সেখানে শিউলি বসে আছে। সাদা একটা শাড়ি, মাথায় বেলফুলের মালা। তিনি আর শিউলি ছাড়া আর কেউ কোথাও নেই। শিউলি অবিকল কৃষ্ণা দাশগুপ্তের গলায় গাইছে, অখিল বিমানে তব জয়গানে যে সামরব / বাজে সেই সুরে সোনার নূপুরে কি সে নব।  দময়ন্তী সেনগুপ্ত ঘুমের মধ্যেই শিউরে উঠলেন।।


1,412 views

Subscribe to Our Newsletter

  • White Facebook Icon

© 2023 Powered by Maiti Infomedia Pvt Ltd.