• Joy

লাঞ্চ-বক্স (গল্পঃ জয়)

" আজকে শুধু ভাত, ডাল আর বেগুনভাজা দিলাম। এটাই খেয়ে নিয়ো। আর বিশেষ কিছু করলাম না।" লাঞ্চহ বক্স টা তে গরম খাবার ভরে টিফিন ক্যারিয়ার টা বন্ধ করতে করতে বলল কল্পনা। " আর শোন, পারলে বাটিগুলো একটু জল দিয়ে ধুয়ে রাখবে। অফিস থেকে রাতে ফিরে বাটিগুলো থেকে কেমন পচা গন্ধ বেরয়। বমি বমি পায়।" একটু কড়া আদেশের সুরে ঝাল মাখা গলায় বলে গেল কল্পনা অর্দেন্দুর দিকে না তাকিয়েই। অর্ধেন্দু চুপ করে শুনছিল। শুধু " আচ্ছা" বলে নিজের ব্যাগ টা একবার গুছিয়ে নিল।



আজকে তার অফিসে বড়বাবু আসছেন দিল্লি থেকে। কলকাতার রেজিওনাল হেড, অগ্নিপ্রভ, মানে ওর বস তাই বেশ কিছুদিন ধরে ব্যস্ত। বলা বাহুল্য, অর্ধেন্দুর কাজের চাপ বেড়ে গেছে কয়েকগুন। তাই বেগুন ভাজা নিয়ে ঘরে নাই বা নিম্নচাপ সৃষ্টি করা! পুরো একাউন্টিং এ-র কাজ ওর ওপর। সামনের সারা বছরের বিজনেস প্ল্যান হবে নাকি। অগ্নিপ্রভ বলে এসছে ইস্টার্ন রিজিওন নাকি ভালো করছেনা। দিল্লির হেডকোয়ার্টার থেকে চাপ চলছে বেশ কিছু মাস ধরে। কমার্স এ মাস্টার্স কম্পলিট করে এই কোম্পানিতে চাকরিটা পেয়েছিল। চার্টার্ড একাউট্যান্সিটা আর করা হয়ে ওঠেনি। কল্পনার সাথে বিয়েটা হয়ে যায়। একই কলেজে পড়া। একসাথে টিউশনি। একে অপরের বাড়ি যাতায়াত। প্রেম হল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। কিন্তু দুই বাড়ি বিয়ে দিয়ে দিল। কল্পনাও কিছু বলল না। বিয়ের পর কল্পনাও একটা চাকরি জুটিয়ে নিল। ভাল কথা বলতে পারত। একটা ট্র‍্যাভেল কোম্পানিতে সেল্সএর কাজ। ভালোই চলতে লাগলো। কল্পনা একটু সপ্রতিভ বরাবর। অর্ধেন্দু একটু ছাপোষা প্রকৃতির। কিন্তু এই কোম্পানিতে একাউন্টান্সি টা বেশ গুছিয়ে নিয়েছিল। খারাপ লাগতো না। বেশি তেমন কারুর সাথে কথা বলতে হয় না। অফিসের বস অগ্নিপ্রভ মনে হয় খুশি ওর কাজে। কিন্তু বলা যায় না। কখন কি হয়। এই প্রথমবার হেডকোয়ার্টার থেকে বড় বসেরা আসছেন। আকাশ কালো বলেই মনে হচ্ছে। প্রবল বর্ষনের সমভাবনা কি?


কল্পনা জলদি বেরিয়ে গেল। নাকি অফিসে অনেক কাজ। কলকাতার লোকজন খুব ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরী, দারজিলিং, দিঘা তো আছেই। এখন নাকি ব্যাংকক, দুবাই এ-র চল বেশি। কোরোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি মিলেছে অনেকদিন হলো। মানুষ আর ঘরে বসে থাকতে চাইছে না। কল্পনা যদি ভালো করে তবে নাকি দুবাই ঘোরার একটা মওকা পেতে পারে। বোনাস হিসেবে। অফিসের খরচায়। প্লাস জায়গাটাও নাকি ভালোভাবে জেনে রাখা দরকার সেলস টিম এর। যাকগে, খারাপ হবে না। এইসব ভাবতে ভাবতে দেরি হয়ে গেল অর্ধেন্দুর। এটাই একটা সমস্যা ওর। মাঝে মাঝেই ভাবনায় ডুবে যায়। খেয়াল থাকে না। অফিসেও ডেবিট- ক্রেডিট এ-র মধ্যে মাঝে মাঝেই মেঘ- কুয়াশা ঢুকে পড়ে। অর্ধেন্দু নিজেকে দেখতে পায় এক কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ি রাস্তায়।

ব্যাগটা ভালোভাবে হাতে ধরে বেরিয়ে পড়লো রাস্তায়। লাঞ্চ-বক্স টা কাধে ঝোলানো। আজকে যেন গুমোট বেশি। বাস-এ সিট পাওয়া দুরের কথা। পোদ্দার কোর্ট এর অফিস পাড়ায় নামতে পাক্কা ৫০ মিনিট। অফিসে ঢুকে নিজের জায়গায় চলে গেল অর্ধেন্দু অভ্যেসমত। বাকিরাও এসে গেছে। বসের চেম্বারে বেশ কিছু লোকজন। কাচের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। সেলস এ-র বানীব্রত কে দেখা যাচ্ছে। মুখ নিচু করে বসে। সবাই কেমন ঝিমিয়ে। ওদিকে আর তাকালো না অর্ধেন্দু। ক্যম্পুটারের সিপিউ টা অন করে ডেস্কটপ টা অন করলো। ওর চেনা জায়গা এ-ই ডেস্কটপ। ভাল স্ক্রিন ওয়ালপেপার লাগান থাকে। পাহাড়ের কুয়াশা ভরা একটা ছবি থাকে। ওর পার্সওয়ার্ড দিয়ে লগইন করল অফিসের ডেস্কটপে। সব ফোল্ডার গুল খুব সাজানো গোছানো থাকে। বস যখন কোনো রিপোর্ট চাইবে সব রেডি করা থাকে। একবার ইমেইল ইনবক্সে গেল। সব থেকে ওপরে একটা আনরেড ইমেইল দেখা যাচ্ছে। হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট থেকে। হেড কোয়ার্টার থেকে নোটিশ। তুলে দেওয়া হচ্ছে কোলকাতা রিজিওনাল অফিস। খুব সংক্ষিপ্ত ইমেইল। আজ-ই অফিসের শেষ দিন। আর ২ ঘন্টার মধ্যে ব্লক করে দেওয়া হবে ইমেইল অ্যাক্সেস। আর লগইন করতে পারবে না। লগইন ব্লক করে দেওয়া হবে কম্পুটারেরও। ইমেইল এটাও বলা আছে যে হেড কোয়ার্টার এ-র হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট পুরো সহায়তা করবে সবাইকে নতুন কোন চাকরি পেতে অন্য কোন সংস্থানে। কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইল অর্ধেন্দু। ভাল করে দেখে নিতে চাইল ডেস্কটপ এ লাগানো ছবিটা। একটা লোক হেটে চলেছে কুয়াশা ভরা পাহাড়ি রাস্তায়। নিজেকে দেখত অর্ধেন্দু ও-ই লোকটার জায়াগায়। আজকে লোকটাকে কেমন অন্যরকম লাগচ্ছে। একদমই ওর চেহারার সাথে মিল ছিল না। আগে কেন বুঝতে পারেনি কে জানে। গুরুপদ আসে নি চা দিতে। কাউকে দেখা পাওয়া যায় না। বিপ্লব এ-র পাত্তা নেই। বিপ্লব ছেলে টা সবে কলেজ থেকে পাস করে ঢুকেছিল। কি যেন একটা কাজ করত ঠিক জানে না অর্ধেন্দু। বোঝার চেস্টাও করেনি কোনদিন। শুধু লাঞ্চের সময় আসতো। অর্ধেন্দুর লাঞ্চ-বক্স টা নিয়ে নিত। খাবার গুলো পুরো খেয়ে নিত। ওর নাকি ঘরের খাবার খেতে ভালো লাগে। আর অর্ধেন্দু বেরিয়ে পড়তো অফিস পাড়ার রাস্তায়। কোনদিন টোস্ট- ওমলেট, কোনদিন এগরোল। চিকেন থালিও খেত মাঝে মাঝে। এটা একটা রুটিনের মত চলছিল গত এক-দুবছর। কল্পনা জানতে পারেনি। অর্ধেন্দু-ও জানতে পারেনি কি কি খাবার থাকত লাঞ্চ বক্সে। আর কেমন খেতে লাগত। কল্পনা বাড়ি ফিরে জিগেস করত কখনো কখনো। উত্তরের একাওউন্টিং টা কোন রকমে সামলে নিত।

দুই ঘন্টা কেটে গেছে। অফিসের সব কাগজপত্র মিটিয়ে বেরিয়ে এসেছে অর্ধেন্দু। বস্ অগ্নিপ্রভ আজ অপ্রতিভ ছিল। কথা হয়নি। একবার চোখাচোখি হয়েছিল। একটা মলিন ম্লান হাসি ধরার চেস্টা করেছিল অগ্নিপ্রভ। কিন্তু চোখ নামিয়ে নেয়। আর কারো সাথে কোন কথা হয়নি। অফিস পাড়ার রাস্তায় একবার গেল অর্ধেন্দু। কিন্তু কোথাও দাড়ালো না। ভাবলো একবার গড়ের মাঠের দিকে যাওয়া গেলে ভালো লাগবে। নিজের মন মেজাজ ঠিক কিরকম বুঝে উঠতে পারলো না। এসব বোঝার কোনদিন চেস্টা করে না। ও জানে, মনের অনুভুতি বোঝা খুব কঠিন একটা ব্যাপার। এর থেকে ডেবিট- ক্রেডিট অনেক সহজ মনে হত ওর। কল্পনাকেও বুঝতে পারে না। চেস্টাও করে না। জীবনের হিসেবটা কেমন জানি গোলমেলে। কোম্পানির ব্যালান্স শিট টা বেশ সোজাসুজি ব্যাপার। দিল্লির হেড কোয়ার্টার এ-র ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্ট থেকে ওকে আলাদা করে অনেক রিপোর্ট চায়। গত ছ-মাস ধরে ও দিয়ে এসেছে। ওর বস্ অগ্নিপ্রভ জানে না। ওরাও কোনদিন ইমেইল -এ ওর বস্ কে রাখে নি। এটা নিয়ে ও কোনদিন ভাবেই নি। দিল্লির হেড কোয়ার্টার কল্পনার দুবাই এর মত। ও ভাবত কোনদিন ডাক পড়লে যাওয়ার সুজোগ হতে পারে। অফিসের খরচায়। দিল্লির কুতুব মিনার টা দেখার খুব ইচ্ছে।

অর্ধেন্দু চলে এল গড়ের মাঠের এক ধারে। ফোর্ট উইল্লিয়াম এ-র দিকটায়। এদিকে খালি খালি। ঘাসের ওপর বসে পাশে রাখল লাঞ্চ বক্স টা। আজকে এ-ই খাবার টাই খাবে। রাস্তার খাবার কেন কে জানে খেতে ইচ্ছে করল না। এক দু বছরে এই প্রথম ও খাবে নিজের লাঞ্চ বক্সের খাবার। অনেকটাই ঠান্ডা হয়ে গেছে। তাও খেতে শুরু করে দিল। ভাত, ডাল আর বেগুন ভাজা। অপুর্ব খেতে লাগল! ভাবতে পারেনি অর্ধেন্দু ওর এতোটা ভাল লগবে। রাতের ডিনার আর রবিবারের খাবার দাবার একজন কাজের মাসি রান্না করে দেয় ওদের বাড়িতে। সেরকম ভাবে কল্পনার হাতের রান্না খাওয়া কখনো হয়ে ওঠেনি। শুধু অফিসের লাঞ্চ দুজনের জন্য কল্পনা রান্না করতো। এক সাবাড়ে শেষ করে দিল খাবার টা। জলের বোতোলটা খুলতে যায় হাত ধোওয়ার জন্য।

" এটাও খেয়ে দেখ অর্ধেন্দু। পায়েস টা। " চমকে পাশে তাকাল। গলা টা তো চেনা! পাশে কখন এসে বসেছে ওর বস্ অগ্নিপ্রভ। মুখে সেই চেনা হাসি।

" ওহ্! কখন এলেন স্যর! বুঝতে পারিনি!" - একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে বলল অর্ধেন্দু।

" এই তো জাস্ট এলাম। দূর থেকে তোমায় দেখতে পেলাম। একা বসে লাঞ্চ করছ। ভাবলাম জয়েন করি। অফিসে তেমন একসাথে লাঞ্চ করা হয়ে ওঠেনি। আজকে না হয় গড়ের মাঠে হয়ে গেল। " ম্লান হাসি হেসে বলল অগ্নিপ্রভ।

" আর তো কোনদিন সুজোগ হবে না স্যর। অফিস তো বন্ধ হয়ে গেল। " এই কথা বলে চুপ হয়ে গেল। দুজনেই চুপ করে রইল কিছুক্ষন। গাছের ছায়ার তলাতেও গুমোট ভাবটা যেন বেড়ে গেল। ও-ই দূরে ভিক্টোরিয়া এ-র দিকে কিছু ঘোড়া ঘাস খাচ্ছে। কিছু ছেলে পুলে এ-ই গরমেই ফুটবল খেলে চলেছে। পাশের রাস্তা দিয়ে একটা টাংগাওয়ালা ঘটঘট আর ঘন্টার টুংটাং শব্দ তুলে চলে গেল। আবার কিছুক্ষনের নিরবতা।

" আরে পায়েস টা ঠান্ডা হয়ে যাবে তো! খেয়ে নাও। " - অগ্নিপ্রভ তাগাদা দিল নরম সুরে।

" ম্যাডাম বানিয়েছেন কি স্যর?" এক চামচ মুখে তুলে এক গাল হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করল অর্ধেন্দু।

হাসল অগ্নিপ্রভ। কিছু বলল না। একটা ট্রাম আসছে ঘটাং ঘটাং শব্দ করে। সেদিকে তাকাল ও। খুব বেশি বয়স হবে না অগ্নিপ্রভর। একই বয়সি। এক নামকরা ইউনিভার্সিটি থেকে ম্যানেজমেন্ট পড়েছে। গত দু- তিনবছর এই কোম্পানির ইস্টার্ন রিজিওন এ-র বিজনেস সামলাচ্ছে। অর্ধেন্দু শুনেছে, অন্য অনেক জায়গা থেকে, হেড কোয়ার্টার থেকেও সুজোগ ছিল। কিন্তু কোন পার্সন্যাল কারনে বাইরে যেতে চাইনি। অনেক হার্ডওয়ার্ক করতে হয়েছে এ-ই কলকাতা অফিস কে বড় করতে। কিন্তু ধরে রাখাটাই কঠিন হয়ে দারাচ্ছিল।

" তুমি আমাকে একবার বলতে পারতে যে হেড কোয়ার্টার তোমার থেকে আলাদা করে রিপোর্ট নিয়ে যাচ্ছিল। আমি হয়ত বাধা দিতাম না। " এদিকে না তাকিয়েই অগ্নিপ্রভ বলে উঠল।

" না মানে আমি ঠিক বুঝলাম না স্যর!" থতমত খেয়ে বলল অর্ধেন্দু। পায়েস টাও শেষ হয়ে এসেছিল। রেখে দিল পাশে বাটি টা।

" আমিও ঠিক বুঝতে পারিনি। বানীব্রত যে সব ভুয়ো কাস্টমার দেখিয়ে সেলস দেখিয়ে যাচ্ছিল - আমি সেটা ধরতে পেরে গেছিলাম। বুঝলে অর্ধেন্দু - আমাদের বিজনেস টা খাতায় কলমে হচ্ছিল। আসলে কিছুই বিজনেস হয়নি, বাড়া তো দুরের কথা! সবাই বলেছিল ইস্টার্ন রিজিওন খুব টাফ হবে। বিজনেসের চাহিদা এখানে কম। আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলাম। "

এতোটা কথা বলে একটু বিরতি নিল অগ্নিপ্রভ। পকেট থেকে একটা সিগারেট প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট ধরাল। কি মনে করে অর্ধেন্দুর দিকে চেয়ে একটু হেসে জিজ্ঞেস করল " চলবে একটা? রোজ-ই তো এগরোলের পর খাও একটা দেখেছি!"

" না না স্যর! কি যে বলেন!" জিভ কেটে বলল অর্ধেন্দু। " এ-ই ভাত পায়েসের পর দরকার নেই। আপনি-ই খান। আপনি বলছিলেন কি যেন "। কথা ঘোরানোর চেস্টা করল অর্ধেন্দু। অগ্নিপ্রভ আবার ভাবনায় ডুবে গেল।

" অফিসের কেউ জানে না। আমার স্ত্রী তনিমা একটা নিজের ব্যাবসা খুলেছিল। ট্রাভেল এজেন্সী। কোরোনার পরে ভালই চলছিল জান। আমি বেশিরভাগ লগ্নি করি। বেতনের টাকা জমিয়ে আর কি। ওর ব্যাবসা করার প্রবল ইচ্ছে দেখেছিলাম। "ট্যান'স ট্রাভেলস এন্ড কো." নামে। তনিমার ডাকনাম ছিল " ট্যান"! " একটু মৃদু হাসল আবার অগ্নিপ্রভ।

"আমাদের অফিসের ট্রাভেলস এ-র কিছু কাজ করেছিল ওরা। তাই আমি অফিসে কাউকে তেমন বলিনি। জানি ব্যাপারটা গোলমেলে। কিন্তু ঠিক খরচেই বিল করত। এ-র টাকাটা হেড কোয়ার্টার থেকে আসত আর ওরাই এ-র আকাউন্টিং করত। কোন আজে বাজে বিল করানো হয়নি। বরং খুব সস্তায় আমাদের অফিসের ট্রাভেল মেনেজ হত। "

অর্ধেন্দু অবাক চোখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

" কি কোম্পানিটার নাম চেনা চেনা ঠেকছে!?" একটু মস্করার সুরে জিজ্ঞেস করল অগ্নিপ্রভ।

" হাহ্! মানে - এটা ম্যাডামের কোম্পানি?!" অর্ধেন্দু বিস্বয়ে চেয়ে রইল। আর কি বলবে বুঝতে পারল না।

" আমরা জানতাম - তোমার স্ত্রী কল্পনা তনিমার কোম্পানিতে চাকরি করত।" - বলল অগ্নিপ্রভ।

" করতো মানে? মানে করে তো। আজকেই তো গেল। " থতমত ভাবটা আর-ও চেপে বসল অর্ধেন্দু কে।

" তনিমার ট্রাভেল কোম্পানিটা বন্ধ হয়ে গেছে মাস তিনেক হল। আমরা আর চালাতে পারিনি। দশজন মত কর্মী ছিল। সবাইকে ছাটাই করা হয়। কিছু জনকে রেখে দেওয়া হয়। কল্পনা তাদের মধ্যে একজন। " - অগ্নিপ্রভ বলে চলল।

" মানে কি বলছেন কি? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছিনা! কল্পনা তো আমাকে কিছুই বলে নি! " - একটু যেন রেগে উঠল অর্ধেন্দু। ওর গা হাত পা একটু ঠান্ডা হয়ে আসছে। চারপাশের রাস্তা ঘাট, ঘোড়ার গাড়ি, ফুটবল মাঠ - সব কোথাও উধাও!

" আমি জানতাম এটা হবে। শুধু পুরী, দিঘা বা দারজিলিং এ ঘোরার প্যাকেজ সেল করে কোন লাভ তেমন হচ্ছিল না। এখান থেকে বাইরে সাউথ ইস্ট এশিয়া এ-র দেশ যেমন ব্যাংকক বা মিডল ইস্ট এ-র দুবাই এ-র কাস্টমার খুব কম। যারা আছে তারা অন্য বড় ট্রাভেল এজেন্সির কাছে যায় কারন খুব ভাল সুবিধা পায়। আমরা কম্পিটিটিভ থাকতে পারলাম না! " - একটা দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে বলল অগ্নিপ্রভ!

" আর এদিকে আমাদের টাও গেল। যাবে জানতাম। শুধু দিন গুনছিলাম। "

" কিন্তু রোজ যে কল্পনা বেরিয়ে যায়?! " - অর্ধেন্দুর গলায় অবিস্বাস!

এবার হাসল অগ্নিপ্রভ। একটু গুছিয়ে বসল। মুখমুখি হল অর্ধেন্দুর। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে একটু অন্য সুরে জিজ্ঞেস করলঃ " কেমন লাগল পায়েস টা? "

" বেশ ভালই! " ভ্যাবাচাকা ভাবটা কাটে নি অর্ধেন্দুর।

" যদি বলি এ-ই পায়েসটা কল্পনার রান্না করা?" - অগ্নিপ্রভ এবার রহস্য করে বলল একটু মুচকি হেসে!

" কি বলছেন কি?! কল্পনার রান্না আপনার কাছে কি করে?! মানে কি হচ্ছে টা কি ব্যাপার টা?! " - একটু উন্মাদগ্রস্ত এবার অর্ধেন্দু!

" হা হা হা।"।বেশ জোরে হেসে হাত জোড় করে বলল অগ্নিপ্রভ- " না না অন্যরকম দিকে ভেব না। সেরকম এক্কেবারেই না। - শোন তোমাকে ডিটেলস এ-ই বলি -"

অগ্নিপ্রভ বলতে লাগল খোলসা করে --

" আমার স্ত্রী তনিমা একদিন ওদের অফিসে কল্পনার বানান লাঞ্চ খায়। ওরা সবাই একসাথে লাঞ্চ করত। কল্পনার বানান খাবার সবার খুব ভাল লাগত। তনিমার-ও খুব ভাল লাগে। তারপর থেকে রোজ কল্পনা খাবার বানিয়ে নিয়ে যেত অফিসে তনিমার জন্য। আমি শুনি ব্যাপারটা বাড়িতে তনিমার মুখেই। আমি দেখলাম তুমিও লাঞ্চ বক্স নিয়ে আস। কিন্তু তুমি কোনদিন খাও না। বিপ্লব আসলে আমার পরিচিত। আমার রেফারেন্স-এ ওর এখানে চাকরিটা হয়। তাই ওকেই বলি তোমার লাঞ্চ বক্স টা আমার জন্য রাখতে। তোমাকে সরাসরি বলার ঠিক সময় হয়ে ওঠেনি। বলা বাহুল্য আমার-ও খুব ভাল লাগে। কল্পনাও এ-ই ব্যাপারটা জেনে আমার জন্য বানাতে শুরু করে। ও জানে তুমি খাও না কিন্তু আমি খাই বিপ্লবের মাধ্যমে! হা হা" হেসে উঠলো অগ্নিপ্রভ। একটু দম নিল। আবার শুরু করলঃ

" যখন ট্রাভেল কোম্পানি চলল না তখন তনিমা ঠিক করে যে ও কর্পোরেট লাঞ্চ সার্ভিস শুরু করবে। মেইন শেফ হবে কল্পনা। আমরা ইন্টেরনেটের মাধ্যমে অর্ডার নিয়ে এ-ই নতুন বিজনেস চালাতে পারব বলে বিশ্বাস। পুরন অফিস্টা রেনোভেট করে পুরো আধুনিক কিচেন বানানো হয়। কল্পনা পুরো রান্নার ব্যাপারটা সামলায় আরো ৫-৬ কে নিয়ে।

আজকে তনিমার জন্মদিন। ওর খেতে ইচ্ছে হয়েছিল প্লেইন ভাত, ডাল, বেগুন ভাজা। তারপর অফিসের কিচেনে কল্পনা বানায় পায়েস। এই পায়েস আজকে " "ট্যানপনা কিচেন" এ-র কর্পোরেট লাঞ্চ মেনু এর স্পেশ্যাল। ডেলিভেরি বয় ঠিক ১টায় দিয়ে যায় আমার অফিসে। "

" ট্যানপনা?!" জিজ্ঞেস করে অর্ধেন্দু।

" তনিমা এন্ড কল্পনা - অনেকটা চারাপনা স্টাইলের না? তনিমা আর কল্পনা দুজনেই এ-ই নতুন কোম্পানির ডিরেক্টর। " বলে হাসতে থাকে অগ্নিপ্রভ।

কিছু কথা বলতে পারে না অর্ধেন্দু! চুপ করে বসে থাকে।

" চলো ওঠ দেখি। অনেক কাজ আছে আমাদের। আমাদের যেতে হবে!" - তাগাদা দিয়ে উঠে পড়ে অগ্নিপ্রভ।

" কোথায়? কিসের কাজ?!" - ফ্যালফ্যাল ভাব কাটে না অর্ধেন্দুর।

" আরে। একবার ট্যানপনা কিচেনে ঢু মারতে হবে। আমার যে বিজনেস ডেভেলপমেন্টের কাজ। আর তুমি যে পুরো ফিন্যান্স আর একউন্টিং টা সামলাবে চিফ ফাইনান্সিয়াল অফিসার হয়ে! -- চল চল ও-ই ট্রাম টা ধরতে হবে! "


দুজনে হাটতে থাকে ট্রাম লাইন ধরে। বিকেল গড়িয়ে এসেছে। কুয়াশার মত চারিদিক সাদা চাদর যেন বিছিয়ে রয়েছে। সেই কুয়াশা চিরে এগিয়ে আসছে একটা ট্রাম। সাথে ঘটাং ঘটাং শব্দ!




------------------ সমাপ্ত -------------------////


জয়

133 views0 comments