• Joy

লাঞ্চ-বক্স (গল্পঃ জয়)

" আজকে শুধু ভাত, ডাল আর বেগুনভাজা দিলাম। এটাই খেয়ে নিয়ো। আর বিশেষ কিছু করলাম না।" লাঞ্চহ বক্স টা তে গরম খাবার ভরে টিফিন ক্যারিয়ার টা বন্ধ করতে করতে বলল কল্পনা। " আর শোন, পারলে বাটিগুলো একটু জল দিয়ে ধুয়ে রাখবে। অফিস থেকে রাতে ফিরে বাটিগুলো থেকে কেমন পচা গন্ধ বেরয়। বমি বমি পায়।" একটু কড়া আদেশের সুরে ঝাল মাখা গলায় বলে গেল কল্পনা অর্দেন্দুর দিকে না তাকিয়েই। অর্ধেন্দু চুপ করে শুনছিল। শুধু " আচ্ছা" বলে নিজের ব্যাগ টা একবার গুছিয়ে নিল।



আজকে তার অফিসে বড়বাবু আসছেন দিল্লি থেকে। কলকাতার রেজিওনাল হেড, অগ্নিপ্রভ, মানে ওর বস তাই বেশ কিছুদিন ধরে ব্যস্ত। বলা বাহুল্য, অর্ধেন্দুর কাজের চাপ বেড়ে গেছে কয়েকগুন। তাই বেগুন ভাজা নিয়ে ঘরে নাই বা নিম্নচাপ সৃষ্টি করা! পুরো একাউন্টিং এ-র কাজ ওর ওপর। সামনের সারা বছরের বিজনেস প্ল্যান হবে নাকি। অগ্নিপ্রভ বলে এসছে ইস্টার্ন রিজিওন নাকি ভালো করছেনা। দিল্লির হেডকোয়ার্টার থেকে চাপ চলছে বেশ কিছু মাস ধরে। কমার্স এ মাস্টার্স কম্পলিট করে এই কোম্পানিতে চাকরিটা পেয়েছিল। চার্টার্ড একাউট্যান্সিটা আর করা হয়ে ওঠেনি। কল্পনার সাথে বিয়েটা হয়ে যায়। একই কলেজে পড়া। একসাথে টিউশনি। একে অপরের বাড়ি যাতায়াত। প্রেম হল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। কিন্তু দুই বাড়ি বিয়ে দিয়ে দিল। কল্পনাও কিছু বলল না। বিয়ের পর কল্পনাও একটা চাকরি জুটিয়ে নিল। ভাল কথা বলতে পারত। একটা ট্র‍্যাভেল কোম্পানিতে সেল্সএর কাজ। ভালোই চলতে লাগলো। কল্পনা একটু সপ্রতিভ বরাবর। অর্ধেন্দু একটু ছাপোষা প্রকৃতির। কিন্তু এই কোম্পানিতে একাউন্টান্সি টা বেশ গুছিয়ে নিয়েছিল। খারাপ লাগতো না। বেশি তেমন কারুর সাথে কথা বলতে হয় না। অফিসের বস অগ্নিপ্রভ মনে হয় খুশি ওর কাজে। কিন্তু বলা যায় না। কখন কি হয়। এই প্রথমবার হেডকোয়ার্টার থেকে বড় বসেরা আসছেন। আকাশ কালো বলেই মনে হচ্ছে। প্রবল বর্ষনের সমভাবনা কি?


কল্পনা জলদি বেরিয়ে গেল। নাকি অফিসে অনেক কাজ। কলকাতার লোকজন খুব ঘুরে বেড়াচ্ছে। পুরী, দারজিলিং, দিঘা তো আছেই। এখন নাকি ব্যাংকক, দুবাই এ-র চল বেশি। কোরোনা ভাইরাস থেকে মুক্তি মিলেছে অনেকদিন হলো। মানুষ আর ঘরে বসে থাকতে চাইছে না। কল্পনা যদি ভালো করে তবে নাকি দুবাই ঘোরার একটা মওকা পেতে পারে। বোনাস হিসেবে। অফিসের খরচায়। প্লাস জায়গাটাও নাকি ভালোভাবে জেনে রাখা দরকার সেলস টিম এর। যাকগে, খারাপ হবে না। এইসব ভাবতে ভাবতে দেরি হয়ে গেল অর্ধেন্দুর। এটাই একটা সমস্যা ওর। মাঝে মাঝেই ভাবনায় ডুবে যায়। খেয়াল থাকে না। অফিসেও ডেবিট- ক্রেডিট এ-র মধ্যে মাঝে মাঝেই মেঘ- কুয়াশা ঢুকে পড়ে। অর্ধেন্দু নিজেকে দেখতে পায় এক কুয়াশা ঘেরা পাহাড়ি রাস্তায়।

ব্যাগটা ভালোভাবে হাতে ধরে বেরিয়ে পড়লো রাস্তায়। লাঞ্চ-বক্স টা কাধে ঝোলানো। আজকে যেন গুমোট বেশি। বাস-এ সিট পাওয়া দুরের কথা। পোদ্দার কোর্ট এর অফিস পাড়ায় নামতে পাক্কা ৫০ মিনিট। অফিসে ঢুকে নিজের জায়গায় চলে গেল অর্ধেন্দু অভ্যেসমত। বাকিরাও এসে গেছে। বসের চেম্বারে বেশ কিছু লোকজন। কাচের দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। সেলস এ-র বানীব্রত কে দেখা যাচ্ছে। মুখ নিচু করে বসে। সবাই কেমন ঝিমিয়ে। ওদিকে আর তাকালো না অর্ধেন্দু। ক্যম্পুটারের সিপিউ টা অন করে ডেস্কটপ টা অন করলো। ওর চেনা জায়গা এ-ই ডেস্কটপ। ভাল স্ক্রিন ওয়ালপেপার লাগান থাকে। পাহাড়ের কুয়াশা ভরা একটা ছবি থাকে। ওর পার্সওয়ার্ড দিয়ে লগইন করল অফিসের ডেস্কটপে। সব ফোল্ডার গুল খুব সাজানো গোছানো থাকে। বস যখন কোনো রিপোর্ট চাইবে সব রেডি করা থাকে। একবার ইমেইল ইনবক্সে গেল। সব থেকে ওপরে একটা আনরেড ইমেইল দেখা যাচ্ছে। হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট থেকে। হেড কোয়ার্টার থেকে নোটিশ। তুলে দেওয়া হচ্ছে কোলকাতা রিজিওনাল অফিস। খুব সংক্ষিপ্ত ইমেইল। আজ-ই অফিসের শেষ দিন। আর ২ ঘন্টার মধ্যে ব্লক করে দেওয়া হবে ইমেইল অ্যাক্সেস। আর লগইন করতে পারবে না। লগইন ব্লক করে দেওয়া হবে কম্পুটারেরও। ইমেইল এটাও বলা আছে যে হেড কোয়ার্টার এ-র হিউম্যান রিসোর্স ডিপার্টমেন্ট পুরো সহায়তা করবে সবাইকে নতুন কোন চাকরি পেতে অন্য কোন সংস্থানে। কিছুক্ষন চুপ করে বসে রইল অর্ধেন্দু। ভাল করে দেখে নিতে চাইল ডেস্কটপ এ লাগানো ছবিটা। একটা লোক হেটে চলেছে কুয়াশা ভরা পাহাড়ি রাস্তায়। নিজেকে দেখত অর্ধেন্দু ও-ই লোকটার জায়াগায়। আজকে লোকটাকে কেমন অন্যরকম লাগচ্ছে। একদমই ওর চেহারার সাথে মিল ছিল না। আগে কেন বুঝতে পারেনি কে জানে। গুরুপদ আসে নি চা দিতে। কাউকে দেখা পাওয়া যায় না। বিপ্লব এ-র পাত্তা নেই। বিপ্লব ছেলে টা সবে কলেজ থেকে পাস করে ঢুকেছিল। কি যেন একটা কাজ করত ঠিক জানে না অর্ধেন্দু। বোঝার চেস্টাও করেনি কোনদিন। শুধু লাঞ্চের সময় আসতো। অর্ধেন্দুর লাঞ্চ-বক্স টা নিয়ে নিত। খাবার গুলো পুরো খেয়ে নিত। ওর নাকি ঘরের খাবার খেতে ভালো লাগে। আর অর্ধেন্দু বেরিয়ে পড়তো অফিস পাড়ার রাস্তায়। কোনদিন টোস্ট- ওমলেট, কোনদিন এগরোল। চিকেন থালিও খেত মাঝে মাঝে। এটা একটা রুটিনের মত চলছিল গত এক-দুবছর। কল্পনা জানতে পারেনি। অর্ধেন্দু-ও জানতে পারেনি কি কি খাবার থাকত লাঞ্চ বক্সে। আর কেমন খেতে লাগত। কল্পনা বাড়ি ফিরে জিগেস করত কখনো কখনো। উত্তরের একাওউন্টিং টা কোন রকমে সামলে নিত।

দুই ঘন্টা কেটে গেছে। অফিসের সব কাগজপত্র মিটিয়ে বেরিয়ে এসেছে অর্ধেন্দু। বস্ অগ্নিপ্রভ আজ অপ্রতিভ ছিল। কথা হয়নি। একবার চোখাচোখি হয়েছিল। একটা মলিন ম্লান হাসি ধরার চেস্টা করেছিল অগ্নিপ্রভ। কিন্তু চোখ নামিয়ে নেয়। আর কারো সাথে কোন কথা হয়নি। অফিস পাড়ার রাস্তায় একবার গেল অর্ধেন্দু। কিন্তু কোথাও দাড়ালো না। ভাবলো একবার গড়ের মাঠের দিকে যাওয়া গেলে ভালো লাগবে। নিজের মন মেজাজ ঠিক কিরকম বুঝে উঠতে পারলো না। এসব বোঝার কোনদিন চেস্টা করে না। ও জানে, মনের অনুভুতি বোঝা খুব কঠিন একটা ব্যাপার। এর থেকে ডেবিট- ক্রেডিট অনেক সহজ মনে হত ওর। কল্পনাকেও বুঝতে পারে না। চেস্টাও করে না। জীবনের হিসেবটা কেমন জানি গোলমেলে। কোম্পানির ব্যালান্স শিট টা বেশ সোজাসুজি ব্যাপার। দিল্লির হেড কোয়ার্টার এ-র ফিন্যান্স ডিপার্টমেন্ট থেকে ওকে আলাদা করে অনেক রিপোর্ট চায়। গত ছ-মাস ধরে ও দিয়ে এসেছে। ওর বস্ অগ্নিপ্রভ জানে না। ওরাও কোনদিন ইমেইল -এ ওর বস্ কে রাখে নি। এটা নিয়ে ও কোনদিন ভাবেই নি। দিল্লির হেড কোয়ার্টার কল্পনার দুবাই এর মত। ও ভাবত কোনদিন ডাক পড়লে যাওয়ার সুজোগ হতে পারে। অফিসের খরচায়। দিল্লির কুতুব মিনার টা দেখার খুব ইচ্ছে।

অর্ধেন্দু চলে এল গড়ের মাঠের এ