• Admin

ছোটগল্প: সাগ্নিক (নয়ন বসু)

সাগ্নিক আমার কলেজের বন্ধু। কলেজের প্রথম দিন সৌভাগ্য কি দুর্ভাগ্যবশত আমার পাশে বসে। সেখান থেকেই সাগ্নিকের সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের সূত্রপাত।


বন্ধুত্ব বলতে গেলে বরং ভুল হবে। কারণ সাগ্নিককে কলেজের আর সবার মতো আমারও পোষাতনা। এককথায় বলতে গেলে আমার দেখা চূড়ান্ত হ্যাংলা, ন্যাকা এবং লাথখোর পাবলিক ছিলো সাগ্নিক। প্রতি হপ্তায় নতুন নতুন প্রেমে পড়া, প্রত্যেক ক্ষেত্রে নিয়মকরে রিজেক্টেড হওয়া, সবসময় এর ওর থেকে সিগারেট চাওয়া, ক্যান্টিনে ধারে খেয়ে পরে অন্য কারুর বিলের সঙ্গে এডজাস্ট করে নিতে বলা ইত্যাদি ইত্যাদি। এবং সবচেয়ে বড় হলো এসব করেও তার শরীরে বিন্দুমাত্র লজ্জা ছিলোনা। মানে এমনটাতো হয়েই থাকে এমন ভাবভঙ্গি। অথচ সাগ্নিক কিছুতে আমার পিছু ছাড়তনা। প্রতিদিন আমার পাশে এসে বসবে, আমার পয়সায় সিগারেট, চা চলবে। খিস্তি খেলে একগাল হাসিমুখে বলবে, তোকে আপন বলেই তো চাই বল!  আমার একটা সবচেয়ে বড় বদগুণ হলো আমি কাউকেই খুব কঠোরভাবে না বলতে পারিনা। তখনও পারতামনা, আজ এই মধ্যচল্লিশেও পারিনা। অথচ এই আমিই একদিন সাগ্নিককে ঝাঁটার বাড়ি মেরেছিলাম। সেদিন সকাল থেকেই মেজাজটা কোনো একটা কারণে ঠিক ছিলোনা। এক্সাক্ট কারণ মনে নেই। সেদিন যথারীতি সাগ্নিক এসে পাশে বসলো। দুটো ক্লাস হয়ে গেলো। তারপর বাংলা ক্লাসের সুধাদি ঢুকলেন। কমার্স নিয়ে পড়লেও আমার বাংলা আর ইংলিশ ক্লাস করতে সবচেয়ে ভালোলাগত। কারণ বাংলা নিয়ে পড়ার একটা সুক্ষ ইচ্ছে আমার চিরকাল ছিলো।  সেজন্যই হয়তো সুধাদি আমায় একটু নেকনজরে দেখতেন। এছাড়া সুধাদির খবর আমি এই কলেজে ভর্তি হচ্ছি শুনে স্কুলের সুবর্ণবাবুও দিয়েছিলেন। উনি আমাদের স্কুলের বাংলা টিচার ছিলেন। সুধাদির মেয়ে ছিল আমাদের সমবয়সী কি এক বছরের জুনিয়র। কলেজের কোনো একটা প্রোগ্রামে আলাপও করিয়ে দিয়েছিলেন। আমার একার সঙ্গে বলে নয়, সকলের সঙ্গেই। সেই সকলের মধ্যে সাগ্নিকও ছিলো। সেদিন কি মনে হতে সাগ্নিক সুধাদির ক্লাস হওয়া ইস্তক খ্যাপাতে লাগলো। কখনো দিদির নামে, কখনো তার মেয়ের নামে। অথচ দিদি কি দিদির মেয়ের সঙ্গে আমার আর সাগ্নিক দুজনেরই একই সম্পর্ক ছিলো। সাগ্নিকও সাহিত্য নিয়ে উৎসাহী ছিলো। কবিতা টবিতা লিখতো। কয়েকবার বারণ করলাম। থামার নাম করেনা। এভাবে বেশ কিছুক্ষণ চলার পর সটান ক্লাসের বাইরে বেরোলাম, একটা ঝাঁটা রাখা ছিলো, তুললাম। ভেতরে এসে ঝপাঝপ ঝাঁটার বাড়ি।  ক্লাসে কোনো স্যার কি ম্যাডাম না থাকায় এমনিতেও চেল্লামেল্লি হচ্ছিলো। সাগ্নিক ঝাঁটার বাড়ি খাওয়াতে সেটা চতুর্গুণ বেড়ে গেল। সাগ্নিক, কি হচ্ছে, কি হচ্ছে, করিসনা কিন্তু বলে হাত দিয়ে আটকাতে যাচ্ছে আর আমি তার ওপরেই ঝাঁটা মারছি। খানিকক্ষণ পর কোনো কথা না বলে ক্লাসের বাইরে যথাস্থানে ঝাঁটাটা রেখে এলাম। ঢুকে দেখি সাগ্নিক ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ক্লাস থেকে। আমার কোনো ভাবান্তর হলোনা। ক্লাসের কয়েকজন এসে খিল্লি করে গেল, বেশ করেছিস, মালটার এমনই হওয়া উচিত এসব বলে। মেয়েরাও বেশ খিলখিল করে হাসাহাসি করছে। আমার সত্যি বলতে কিছুই মনে হয়নি তখন। না রাগ না দুঃখ না অভিমান না কষ্ট না হিরোগিরি না কিছু। তারপর টিফিনের পর একটা ক্লাস বাং করে ক্যান্টিনে চা সিগারেট খাচ্ছি, দেখি সাগ্নিক কোথা থেকে এসে পাশে বসলো। খুব নিচু গলায় প্রায় ফিসফিস করে বললো, দেখ কাজটা কিন্তু ঠিক হলোনা। তুই বাইরে আমায় মারতে পারতিস। কিন্তু ক্লাসে সকলের সামনে এমন করলি, এটা ঠিক হলো? তুইই বল! আমি খিস্তি দিতে যাচ্ছিলাম। তারপর কি মনে হতে বললাম, এসব ঢপের কথাবার্তা আর বলিসনা।  সাগ্নিক সঙ্গে সঙ্গে পুরো উল্টে গেল। একগাল হেসে বলে, চল মাফ করে দিলাম তোকে, এবার একটা সিগারেট দে! সেদিন কলেজের পর আমরা একসঙ্গে কফি হাউস গেছি। তেইশ টাকা বিল হয়েছিলো। স্পষ্ট মনে আছে আমার থেকে কুড়িটাকা আদায় করেছিল সাগ্নিক। এরপর ঝাঁটাপেটা আর কোনোদিন খায়নি সাগ্নিক। কিন্তু উঠতে বসতে অনেক ছোটবড় কথা বলেছি ওকে। অনেক মানে অনেক। আর শুধু আমি নয়, আমার কলেজের চেনা পরিচিত অনেকে, হয়তো সবাই বলেছে।  ফেস্টে একজন নাম না জানা গায়িকা এসেছেন, কিশোরকণ্ঠী। সবাইকে হাত তুলে নাচতে বললেন। কেউ নাচছেনা, হঠাৎ দেখি আমার পাশে বসা সাগ্নিক হাত পা ছুঁড়ে নাচছে।  এক বন্ধুর মেসে কলেজ কেটে মদ খাওয়া হবে। কেউ সাগ্নিককে ডাকেনি। আমি তো নইই। হাড়ে হাড়ে জানি একটা পয়সাও ঠেকাবেনা। আমায় অতিষ্ঠ করে আমার সঙ্গে চলে গেছে। আর আমার বাপ বাপান্ত হয়েছে।  আর আঁতলামির কথা ছেড়েই দিলাম। একদিন কলেজ স্কোয়ারে বসে আছি দুজনে। হঠাৎ হেঁড়ে গলায় গেয়ে উঠলো, বিস্ময়ে তাই জাগে! জাগে আমার প্রাণ! আমি পাশ থেকে দাঁতে দাঁত চেপে বলছি, কি হচ্ছেটা কি, লোকে দেখছে! কে শোনে কার কথা! আমাদের কলেজে খুব সম্ভবতঃ এমন কোনো মেয়ে ছিলোনা যার প্রেমে সাগ্নিক পড়েনি। তারপর রাতদুপুরে ফোন, মেয়েটা আমায় বুঝলোনা নারে! তবে আজ এই বয়সে এসে খুব দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি, কোনোদিন কোনো মেয়েকে ছোট করে কিছু বলেনি সাগ্নিক। যেটা খুব কমন ট্রেন্ড। প্রেমে ব্যর্থ হলেই ছেলেরা করে থাকে। সাগ্নিক বড়জোর, বুঝলোনা, সময়ই দিলোনা ওই অবধি। বাজে মেয়ে,পড়াশোনায় ভালো হলে কি বাবার পয়সা থাকলে অন্যরকম হতো এসব কথা কোনোদিন সাগ্নিকের মুখ থেকে আমি শুনিনি। বাকি অনেকের মুখ থেকেই শুনেছি। বহু অসম্ভব রকম জনপ্রিয় ছেলের মুখ থেকেও শুনেছি। আমি মাঝে মাঝে বলতাম, এতো খিস্তি খাস, লজ্জা লাগেনা তোর? কেন এমন আদেখলাপনা করিস সবসময়? সাগ্নিক এটা সেটা বলে কথা ঘুরিয়ে দিতো। তবে কোনোদিন এমন হয়নি যে সাগ্নিক আমার পয়সায় সিগারেট খায়নি। কলেজজীবনে সাগ্নিক আমায় কি কলেজের অন্য কাউকেও খাইছে এমন অপবাদও কেউ দিতে পারবেনা। অথচ সাগ্নিকের বাড়ি একবার গেছিলাম। বড়লোক নয়। কিন্তু গরিব একেবারেই নয়। দোতলা পরিষ্কার সাজানো গোছান বাড়ি। ওর বাবার কবিতা নাকি কোনো একটা লিটল ম্যাগাজিনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার পাশেই বেরিয়েছিল। সেদিন দেখিয়েছিল। ওর বাবা মা দুজনের সঙ্গেই আলাপ হলো। নিতান্ত ঘরোয়া স্বাভাবিক, আর পাঁচটা বাড়ির মতোই। একদিন সকাল থেকে মাথা খেয়েই যাচ্ছে, আমাদের জেনারেশনের বন্ধুত্ত্বগুলো সব মেকি। সব লোকদেখান ইত্যাদি ইত্যাদি।  হয়তো আগেরদিন কোনো মেয়ের কাছে গাল খেয়েছে। আমি প্রথমে সিরিয়াসলি নিইনি। কিন্তু একটা সময় পর মানুষের বিরক্তি আসতে বাধ্য। ঝাঁঝিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তো অন্যের পয়সায় চা সিগারেট খাওয়া ছাড়া আর কি কি করতে হয় বন্ধুর জন্য? সাগ্নিক একটু হকচকিয়ে গেল। বোধহয় মনে মনে ঝাঁটাপেটার সিনটা মনে পড়েছিল। তারপর স্বভাবসিদ্ধ জ্ঞান দেওয়ার মতো গলায় বলে, সবকিছু একসঙ্গে করতে হয়। যেমন তুই লাল জামা পরে এলে আমিও লাল জামা পরে আসবো। তুই এই ব্রান্ডের সিগারেট খেলে আমিও এই ব্রান্ডের সিগারেট খাবো। আমার কোনো বই পড়ে ভালো লাগলে তোকেও জোর করে পড়াবো। তুই ক্লাস বাং করলে আমিও করবো। তুই মন দিয়ে পড়াশোনা করলে আমিও পড়বো। তুই খারাপ থাকলে আমারও খারাপ লাগবে, তুই ভালো থাকলে আমারও ভালো লাগবে। সাগ্নিক যখনই কোনো কথা বলতো, হাত পা নেড়ে বলতো। গোটা শরীর দিয়ে কথা বলা যাকে বলে। হাত পা মুখ নেড়ে, চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে এক দেখার মতো দৃশ্য। আমি শুনে সেদিন বলেছিলাম, এসব বলে হয়না। হওয়ার হলে আপনিই হয়। আমার মাঝে মাঝে সন্দেহ হতো, সাগ্নিক হোমোসেক্সচুয়াল কিনা। তখন এই কনসেপ্টটা আস্তে আস্তে মার্কেটে আসছে। কিন্তু আবভাবে কোনোদিন মনে হয়নি। বরং একদিন রেড লাইটেড এরিয়ায় এডভেঞ্চার করতে যাবে বলে হেবি ঝাড় খেয়েছিল।  কলেজের শেষদিন অবধিও সাগ্নিক আমার সঙ্গে ছায়ার মতো লেগে ছিল। আর আমার কোনোদিনের জন্য ওর প্রতি কোনো বন্ধুত্ব কি ভালোবাসা কিছুই আসেনি। করুণা একটা ছিলো বলা যায়। কেউ বেচারাকে সহ্য করতে পারেনা, সবজায়গায় খিস্তি খায়,একটা প্রেমও টিকলনা এজন্য। প্রেম করার সাহস সত্যি বলতে আমারও ছিলোনা। ছিলোনা বলেই কম কথা বলতাম মেয়েদের সঙ্গে। এমন একটা ভাব করতাম যেন ওসবে আমার ইন্টারেস্ট নেই। আমি মদ খাবো, শক্তি চট্টোপাধ্যায় আওড়াবো, কলেজ ম্যাগাজিনে প্রেমের গল্প লিখবো ওই অবধি। তারপর রেজাল্ট বেরোলো। আমি আর সাগ্নিক দুজনেই ধেড়িয়েছিলাম। সাগ্নিক আরো বেশি ধেড়িয়েছিলো। সত্যি বলতে সেটা না হলে আমার প্রেস্টিজে তুমুল লাগতো। তারপর যা হয়। তখনও মোবাইলের জমানা শুরু হয়নি। কলেজ শেষ, যোগাযোগও শেষ। বাড়ির ল্যান্ড লাইনে সাগ্নিক বার কয়েক ফোন করেছিল যতদূর মনে পড়ছে। কিন্তু আমি করেছি বলে মনে পড়েনা।  তারপর খুব স্বাভাবিক গতিতে সব এগিয়েছে। আমি হালকা ফুলকা একটা চাকরি জুটিয়েছি। কলেজের যারা পড়াশোনায় ভালো, কেউ সিএ হয়েছে, কেউ এমবিএ হয়েছে, কারুর নিজস্ব ব্যবসা। যেসব ইউনিয়নের দাদাদের হেবি রেলা ছিলো, তাদের একজন দুজনকে আজকাল খবরের কাগজ, চ্যানেলে দেখি মাঝে মাঝে। একজন দুজন ছাড়া আর কারুর সঙ্গেই যোগাযোগ নেই। সাগ্নিকের সঙ্গে তো নেইই। আসলে আজকাল এই মধ্য চল্লিশে নিজেরই বড় একা লাগে। এটাও বুঝি, আমার আশেপাশে অনেকেরই লাগে। কেউ বলে, কেউ লজ্জা পায় বলতে। কেউ কিছু না বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব এক্টিভ থাকে দেখি। এখন কেউ বলবেনা চল একরঙের জামা পরি, এক ব্রান্ডের সিগারেট খাই কি আমার এই সিনেমাটা ভালো লাগলে তাকেও জোর করে দেখাবো। হয়না, এসব হয়না। হলে হয়তো ভালোও লাগতোনা। কিন্তু এটা খুব সত্যি, একটা বয়সের পর বন্ধু আর হয়না। পরিচিত, ওই অবধিই। সেদিন ফেসবুকে হঠাৎ কি মনে হতে একবার সার্চ করলাম সাগ্নিক দাস বলে। পেয়েও গেলাম। সেই লাথখোরের মতো চেহারা, মুখে সবজান্তার মতো একটা হাসি, চোখে নীল রঙের একটা সানগ্লাস যেটা একদম মানাচ্ছেনা। দেখলাম আমেদাবাদ থেকে কিছু একটা কোর্স করেছে। তারপর কিছু নেই। বছর বছর লোকে জন্মদিনে উইশ করে গেছে শুধু সেই পোস্ট। কোনো কমন ফ্রেন্ডও নেই। কয়েকবার ইতস্ততঃ করে একটা রিকোয়েস্ট পাঠিয়েই দিলাম। দেখি যদি একসেপ্ট করে।।


-----


Author: Nayan Basu, Kolkata

669 views

Subscribe to Our Newsletter

  • White Facebook Icon

© 2023 Powered by Maiti Infomedia Pvt Ltd.