গল্পঃ বাঞ্ছাকল্পতরু ( সৌরভ সূর্য মজুমদার)

[এক]

বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। অসীমবাবু যখন এসেছিলেন তখন ইলশে গুঁড়ি। ছাতা একটা সঙ্গে করে এনেছেন বটে, তবে এরকম বৃষ্টি হলে ছাতায় খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয়না তাঁর। ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৮টা ছুঁই-ছুঁই।

***

তিনতলার বারান্দার বাঁদিক থেকে তিন নাম্বার ঘরের সামনে এসে অসীমবাবু দরজার বাইরে নাম দেখলেন, ‘Mr. Pratap Sengupta’। দরজায় দুবার টোকা মেরে দেখলেন, কোনও সাড়া পেলেন না। দরজার হাতল একটু ঘোরাতেই দরজা খুলে গেল।

ঘরটা আকারে খুব বড় না হলেও বেশ পরিচ্ছন্ন। হালকা নীল আর সাদা রঙ করা দেওয়াল। ঘরের ডানদিকে একটা লোহার টেবিল রাখা, তার সবচেয়ে উপরের তাক-এ একটা কাচের গ্লাসের অর্ধেক গ্লাস জল ঢাকা রাখা আছে আর তার পাশে পড়ার জন্য বেশ কয়েকটি বই সারি করা। নীচের তাকে খালি সিরিঞ্জ আর ভায়াল-ই অধিকাংশ দখল করে আছে। অসীমবাবু টেবিলের পাশে হাতের ছাতা রাখলেন। অনতিদূরে একটা চাকা লাগানো টেবিল রাখা খাবার রেখে খাওয়ার জন্য আর বসার জন্য একটা চেয়ার। বাঁ দিকের দেওয়ালে একটা মাঝারি আকৃতির টেলিভিশন লাগানো, আপাতত বন্ধ। দরজার ঠিক উল্টো দিকে প্রকাণ্ড আকৃতির একটা কাচের জানালা, যা দিয়ে নীচের শহর এখন হাজার হাজার জোনাকির প্রাঙ্গনক্ষেত্র মনে হচ্ছে। ঘরের ডানদিকের দেওয়ালের প্রায় মাঝামাঝি একটা লোহার খাট রাখা, তাতে শুয়ে আছেন প্রতাপবাবু। আর সিলিং থেকে আসা ফ্লুওরোসেন্ট মিশমিশে সাদা আলো যেন আগলে রেখেছে ঘরটাকে।

অসীমবাবু কিছুটা ধীর পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন প্রতাপবাবুর দিকে। প্রতাপবাবুর অধিকাংশ শরীরই একটা সাদা চাদর দিয়ে ঢাকা, চাদরের বাইরে মুখ আর ডান-পা –এর একটু অংশ। এই মুখ অসীমবাবুর চিনতে বেশ অসুবিধা হচ্ছে, আগের সাথে কোনও মিল নেই এই মুখের। পাকা দাঁড়িতে যেন ঢুকে যাওয়া চোয়াল আর চিবুকের বড় একটা আঁচিল আড়াল করে রেখেছেন প্রতাপবাবু। চোখের তলায় কালি।

বেশ কিছুক্ষন ধরে দুরূহ এক ধাঁধার মত পুরনো প্রতাপবাবুর মুখের সাথে তাঁর সামনে শুয়ে থাকা প্রতাপবাবুর মুখের মিল খুঁজে গেলেন অসীমবাবু, তারপর কিছুটা ব্যর্থ ও হতাশ হয়ে পাশে রাখা চেয়ারটা টেনে নিয়ে বসলেন। প্রতাপবাবুর মুখের দিকে চেয়ে নিবিড় চিন্তায় মগ্ন হলেন। ঘোর কিছুটা কাটলে পাশে রাখা বইয়ের সারির উপরে রাখা বইটা তুলে নিলেন অসীমবাবু, ‘Arianna Stassinopoulos Huffington’- এর লেখা ‘Picasso’।

বইটা নিয়ে ঠিক কতক্ষন কেটে গেছে খেয়াল নেই অসীমবাবুর, দরজা খোলার আওয়াজে বই থেকে মুখ তুলে তাকালেন তিনি। একজন কর্মচারী এসেছেন খাবার নিয়ে। অসীমবাবুকে দেখে একটু থমকে দাঁড়ালেন, তারপর খাবারের টেবিলের উপর খাবার রেখে অসীমবাবুকে বললেন, ‘আপনি এখন থাকবেন কিছুক্ষণ?’ হাতঘড়ির দিকে তাকালেন অসীমবাবু, পৌনে আটটা। রাত বাড়লেও যানবাহন পেতে অসুবিধা হবেনা, আর বাড়ি ফেরার তেমন তাড়াও নেই তাঁর। ‘তা আছি। কিছু দরকার আছে?’- জিজ্ঞাসা করলেন অসীমবাবু। কর্মচারীটি ইতিমধ্যে তাঁর চাকা লাগানো গাড়ি নিয়ে দরজার কাছে কিছুটা এগিয়ে গিয়েছেন, ‘পারলে রাত ৯টার আগে ডেকে খাইয়ে দেবেন। এই খাবার বেশিক্ষণ রাখা ঠিক হবেনা।’- এই বলে তিনি চলে গেলেন। অসীমবাবু বইয়ের পাতায় বুকপকেট থেকে বার করা বাসের টিকিট ঢুকিয়ে বইটাকে বন্ধ করে টেবিলে রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে গেলেন জানালার দিকে।

বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। অসীমবাবু যখন এসেছিলেন তখন ইলশে গুঁড়ি। ছাতা একটা সঙ্গে করে এনেছেন বটে, তবে এরকম বৃষ্টি হলে ছাতায় খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয়না তাঁর। ঘড়ির কাঁটা প্রায় ৮টা ছুঁই-ছুঁই।

হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দে বজ্রপাত হল, আকাশচেরা আলো তীব্র প্রতিবাদ জানাল তার। তারপর আবার সব শান্ত। চোখ থেকে চশমা খুলে জামার খুঁটে মুছলেন অসীমবাবু। পুরনো বন্ধুর সাথে খালি হাতে দেখা করতে আসার জন্য আত্মদংশন হল তাঁর, কিন্তু নিয়ে আসারও কিছু ছিলনা আর।

- ‘কে?’

ঘুরে তাকালেন অসীমবাবু। প্রতাপবাবু কিছুটা আচ্ছন্ন অবস্থায় উঠে বালিশের পাশে কিছুক্ষণ হাতড়ে চশমাটা হাতে নিয়ে চাদরের কোণা দিয়ে চশমার কাচ পরিষ্কার করে চোখে পড়লেন। এতক্ষণে প্রতাপবাবুর পরিধানের আভাস পেলেন অসীমবাবু। আকাশী নীল রঙের জামা ও পায়জামা।

অসীমবাবু এগিয়ে গেলেন, ‘উঠতে হবেনা, শুয়ে থাকো।’ প্রতাপবাবু চকিত বিচলিত হলেন অসীমবাবুকে দেখে, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘সারাদিন শুয়েই কাটছে, একটু বসলে এমন কিছু ক্ষতি হবেনা। তা তুমিই বা দাঁড়িয়ে আছ কেন? বসো!’ একটু থেমে আবার বললেন, ‘এলে কখন?’ অসীমবাবু চেয়ারটা টেনে বসতে বসতে বললেন, ‘এসেছি কিছুক্ষণ আগে, তুমি ঘুমাচ্ছিলে তাই ডাকিনি আর।’

আবার সব শান্ত, কেউ কথা বললেন না কিছুক্ষণ। ‘হাসপাতাল না হলে আতিথেয়তা করতাম, কিন্তু এখানে আমি নিরুপায়। নীচে চা পাওয়া যায়, চাইলে খেয়ে আসতে পার।’ ,বলে উঠলেন প্রতাপবাবু। অসীমবাবু অন্যমনস্ক হয়ে ভাবছিলেন কিছু, প্রতাপবাবুর কথায় উত্তর দিলেন, ‘না, চায়ের নেশা নেই আর। ওসব নিয়ে তোমায় ভাবতে হবেনা।’- এই বলে দীর্ঘশ্বাস নিলেন তিনি।

বাইরের বৃষ্টির আওয়াজ ঘরের মধ্যে এসে থেমেছে, ভিতরে সব শান্ত। প্রতাপবাবু মাথা নিচু করে ভাবছিলেন কিছু, মাথা তুলে প্রশ্ন করলেন অসীমবাবুকে, ‘এদিকে কি কোন কাজে এসেছিলে?’ অসীমবাবু চেয়ে থাকলেন প্রতাপবাবুর দিকে, তারপর মাথা নামিয়ে উত্তর দিলেন, ‘না, তোমার সাথেই দেখা করতে এলাম।’ ‘ওহ!’- অস্ফুট স্বরে বললেন প্রতাপবাবু।

- ‘আমি কি এসে তোমার ক্ষতি করলাম?’

- ‘যদি ক্ষতিপূরণ না দিতে এসে থাক তবে কোন ক্ষতি নেই।

আবার বিকট শব্দে আকাশ গর্জে উঠল। ‘ও, তোমার রাতের খাবার দিয়ে গিয়েছে, খেয়ে নেবে এখন?’ ,জিজ্ঞাসা করলেন অসীমবাবু। প্রতাপবাবু হেলার দৃষ্টিতে তাকালেন একবার টেবিলে রাখা খাবারের দিকে, তারপর আবার মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, ‘খাব না। খিদে নেই।’ অসীমবাবু জিজ্ঞাসা করলেন, ‘দুপুরে খেয়েছিলে?’ বিদ্রুপের ম্লান হাসি ফুটে উঠল প্রতাপবাবুর ঠোঁটে, অসীমবাবুর চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘না।’ চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন অসীমবাবু।

সময়ও যেন ঘরটাতে এসে থমকে গেছে, থমকে গেছে অনেক বছর আগে। সেই স্মৃতিতে দুটো তুলনামূলক প্রাগৈতিহাসিক ভাস্কর্য নিপুণভাবে অংশগ্রহণ করছে। বাইরের জগত যেন আলাদা অনেক, কাচের জানালার চেয়েও অনেক, অনেক বেশী পুরু তাদের ব্যবধান, অনেক বেশী অস্বচ্ছ। গোল পৃথিবীকে সমান্তরাল চালনা করার মত জটিলতা এই ঘরে নেই। কিন্তু আবার এই ঘরের যেন সবই সমান্তরাল, কিছুই মেলেনা কোনোকিছুর সাথে।

‘সিগারেটের নেশা আছে এখনও?’- প্রশ্ন করলেন প্রতাপবাবু। আনমনা অসীমবাবু স্মিত হেসে উত্তর দিলেন, “রে’ বাবু যেটাকে ‘বুদ্ধির গোড়ায় ধোঁয়া দেওয়া’- বলতেন, সেটাকে ছাড়ার আস্পর্‌দা যে হয়নি সেটা না, কিন্তু সাহসে কুলিয়ে উঠতে পারিনি কখনো।’ প্রতাপবাবুর ঠোঁটের কোণায় হালকা হাসি ফুটল, বললেন, ‘বেশ বললে।’

- ‘হাসলে কেন? সত্যজিতবাবুর কথা বললাম বলে?’

- ‘না, ওনাকে নিয়ে তোমার পাগলামিটা এখনও যায়নি দেখে। ,এই বলে হাসলেন প্রতাপবাবু।

- ‘ভাগ্যিস আছে। কিছু একটা আঁকড়ে ধরতে পেরেছিলাম, সম্বল ছিল।

কথাটা শুনে বেশ কিছুক্ষণ ভাবলেন প্রতাপবাবু কি বলবেন এর উত্তরে। যখন কিছু বলতে গেলেন মুখ থেকে কোন শব্দ বেরোল না, শুধু ঠোঁট নড়ল।

‘তোমার রাগ হয় কখনও আমার উপর?’- প্রতাপবাবুর উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলেন অসীমবাবু। প্রতাপবাবু সহসা তাকালেন অসীমবাবুর দিকে, কিছু একটা বলতে গিয়েও থামলেন, তারপর বললেন, ‘প্রচণ্ড!’ বাইরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন প্রতাপবাবু, আরও বললেন, ‘তুমি আমার কাছ থেকে সব কেড়ে নিয়েছ, সব। অনেকদিন ভেবেছি তোমার সাথে সামনাসামনি দেখা হলে কি বলব, কিরকম ব্যবহার করব। সব ঘেঁটে দিলে তুমি এসে।’

‘ভালোবাসা তোমার কাছে স--ব কবে থেকে হল?’- ঠোঁটের কোণায় বিদ্রুপের হাসি ফুটে উঠল অসীমবাবুর। প্রতাপবাবুর মুখ সিলিঙের সাদা আলোয় টকটকে লাল, দাঁতে দাঁত চেপে প্রশ্ন করলেন, ‘আমার কাছে টাকা সব, এটাই শুনতে চাও তো?’ অসীমবাবু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘তুমি যেটা করেছ সেটা ন্যায্য ছিলনা।’

- ‘তুমি ন্যায্যতা বিচার কর এখন? কিসের রেস্পেক্‌টে? সব দোষ কারুর উপর চাপিয়ে দেওয়াটা খুব সহজ, ঠিক যেমনটা আমি করে এসেছি এত বছর। তুমিই বা কোথায় ছিলে তখন? কোথায় ছিল তোমার ন্যায্যতা?

অসীমবাবু উত্তর দিলেন না, তাকিয়ে রইলেন প্রতাপবাবুর মুখের দিকে। এই প্রশ্ন তাঁকে অবাক করেনা। এইসব প্রশ্নই তাঁকে রোজ তাড়না করে। সত্যিই তো, কোথায় ছিলেন তখন তিনি? নিজের কাছে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর তিনি পাননি এখন সেসব প্রশ্নের উত্তর কিভাবে দেবেন! চুপ করে থাকলেন অসীমবাবু।

‘তোমার চেতনাবোধ আজ এতদিন পর ফিরেছে বলে আত্মসংশয় আর আত্মদংশনের শিকার হয়েছ। কিন্তু আমার সেসব হতে পারেনা কেন? একটা এমন ভুল করেছি যেটা আমি আমার জীবন দিয়েও শুধরাতে পারবনা বলে? ভুল তোমার হয়নি কখনও নাকি আজ সেটা ভুল বলে গ্রাহ্যও করনা?’ ,বলে উঠলেন প্রতাপবাবু। ‘কিন্তু কি জান তো, এত বছর ধরে তোমায় দোষ দিয়েও শান্তি পেলাম না, বুঝতে পারলাম না কিসে পরিবর্তন হল। রোজই ভাবি পরের দিন থেকে হবেনা আর এত কষ্ট, পরের দিন আমি ঘুমাতে পারব অন্তত শান্তিতে, একটা দিন। কিন্তু সেগুড়ে বালি! তোমার এই ‘ন্যায্যতা’ আমায় শেষ করেছে দিনের পর দিন, মেরুদণ্ডহীন বানিয়ে ছেড়েছে।’

‘কষ্ট হয়না আমায় দেখে? ভাবছ শেষ করে দেবে সব? সেই আশাতেও অনেক বছর দিন কাটিয়েছি, মনের গহীনে বেঁচে থাকার ওইটুকু আশার আলো। শেষ হবে সব একদিন, একদিন সব শেষ হতেই হবে। কিন্তু নিজের হাতে তো আর সব শেষ করে ফেরার হতে পারিনা কাপুরুষের মত! আর এই দিনগুলোই আমায় শিখিয়েছে কষ্টের চেয়ে কাছের কোন বন্ধু নেই, সে তোমায় কখনও ছেড়ে যায়না, মিথ্যে প্রতিশ্রুতি দেয়না। শুধু তোমার সাথে থেকে তার অস্তিত্ব জানায় প্রতিমুহূর্তে যতক্ষণ না তুমি তোমার সিকিভাগ প্রাপ্য আদায় করে নিচ্ছ তার থেকে। আর এসবের পরে যখন তুমি বুঝবে সে তোমার সর্বকালের বন্ধু, ততদিনে তুমি ঘৃণা কর তাকে। কিন্তু তবুও সে তার সবটুকু দিয়ে তোমায় ভালবেসে যাবে আর তুমি পালানোর পথ খুঁজবে।’

‘ভালোবাসা সবসময়ই এরকম ছিল, আমরা ভালোবাসা থেকে ছুটে বেড়াই যতক্ষণ না রেহাই পাচ্ছি। আর ভালবাসাও কষ্টের মত আঁকড়ে থাকেনা, বরং ছেড়ে দিয়ে তার ভাগটুকুও কষ্টের কাছে সমর্পণ করে দেয়।’

অসীমবাবু শুনছিলেন এতক্ষণ, প্রতাপবাবুর কথা শেষ হলে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়লেন তিনি। ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন জানালার দিকে, একটা হাত কাচের উপর রেখে বাইরের জগত অনুভব করলেন, তারপর বললেন, ‘নীচের শহরটাকে দেখেছ? চেনাই যায়না আর! রোজ এই শহর নতুন রঙে রাঙা হচ্ছে, আমরা ভাবছি শহর পাল্টাচ্ছে, আধুনিকা হচ্ছে, এই শহরের সাথে ‘আমাদের কলকাতা’- র মিল খুব কমই পড়ে আছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে শহরের প্রত্যেকটা আনাচে-কানাচে জড়ানো স্মৃতিগুলো নতুন হয়না, বরং পুরাতনীটাই জোরালো হয়ে ফিরে আসে প্রত্যেকবার। তখন এই নতুন রঙে শহরকে নতুন মনে হয়না, মনে হয় অনেক পুরনো বন্ধু এসেছে নতুনভাবে কিছু উপহার দিতে অথবা তার দেওয়া পুরনো উপহার নিয়ে উপহাস করতে।’

‘আর এতকিছু যখন মনের কোণায় প্রচণ্ড ঘূর্ণি হয়, তখন নিজেকে সবচেয়ে নিঃস্ব আর অসহায় লাগে। সারাজীবন নিয়ে গেলাম সবার থেকে, অথচ আমার দেওয়ার মত কিছু নেই, কিচ্ছু না!’

আবার ঘর শান্ত হল। সিলিঙের মায়াবী আলো আরও মায়াবী হতে থাকল। নিপুণ ভাস্কর্যগুলো তাদের সুনিপুণতার পরিচয় যেন কোথাও একটা দিতে ব্যর্থ হল।

‘তোমায় একটা অনুরোধ করব, রাখবে?’ , সবিনয়ে বলে উঠলেন প্রতাপবাবু।

অসীমবাবু ঘুরে দাঁড়ালেন প্রতাপবাবুর দিকে, বললেন, ‘বল।’

প্রতাপবাবু খানিকটা ইতস্তত করে বললেন, ‘আমায় একটু একা থাকতে দাও, একটু সময় দাও ধাতস্ত হতে।‘

অসীমবাবু নির্বিবাদে মাথা নেড়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। একবার পিছন ঘুরে দেখলেন প্রতাপবাবু মাথা নিচু করে আছেন, তারপর দরজা খুলে বেরিয়ে গেলেন। বৃষ্টি কমে গিয়েছে এতক্ষণে, ছাতাটার কথা মনেও থাকল না তাঁর; টেবিলের উপরে রাখা বইটি তুলে নিলেন প্রতাপবাবু, বই থেকে বাসের টিকিটটা নিয়ে পকেটে পুরে পড়া শুরু করলেন।

[দুই]

- ‘হ্যালো… হ্যাঁ শুনতে পাচ্ছ?’

- ‘হ্যাঁ বল।‘

- ‘তোমার সাথে খুব জরুরি কথা আছে, এখন বলব?’

- ‘না মিনু, ব্যস্ত আছি এখন। তুমি টেলিফোনের কাছে থাকো, আমি বেরিয়ে ফোন করছি তোমায়।‘

- ‘কোরো কিন্তু, খুব দরকার। আর একটু তাড়াতাড়ি কোরো। আর বলছি, শোন না, খেয়ে…’

- ‘আমি বেরিয়ে ফোন করছি মিনু, কাজের প্রচণ্ড চাপ। রাখলাম।‘

ফোন কেটে গেলে মিনতি রিসিভারটা ফোনের উপর রাখল। আজ তার প্রচণ্ড আনন্দ হচ্ছে, এত আনন্দ যে মনে মনে ঠিক করল প্রতাপকে এরকমভাবে ফোন কেটে দেওয়ার জন্য তাকে বকবেও না সে।

এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সে আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল নেই তার। আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে দেখল মিনতি, পরনে লাল ছাপার শাড়িটা ঠিক করল আপনমনে। চেহারার ঔজ্জ্বল্যতা বেড়েছে তার। একটু মোটা হয়েছে কি? আয়নার পাশে আটকান টিপের মধ্যে থেকে একটা নিয়ে কপালে দিয়ে আপনমনে লজ্জা পেয়ে হেসে উঠল সে।

বারবার ঘড়ির দিকে চোখ যাচ্ছে মিনতির। পাঁচটা অনেকক্ষণ বেজে গিয়েছে, তাও ফোন আসছেনা প্রতাপের। আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে তার খাটের পাশে রাখা নকশা করা কাঠের বাক্সটা নিয়ে বসল খাটের এক কোণায়। বাক্স থেকে একটা চিঠি বার করে পড়া শুরু করেছে, এমন সময় টেলিফোন বেজে উঠল। হাতের চিঠি খাটের উপর রেখে কোল থেকে বাক্স নামিয়ে মিনতি ছুটল টেলিফোনের দিকে, রিসিভার তুলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

- ‘হ্যালো।‘

- ‘একি! তুমি হাঁপাচ্ছ কেন? কি হয়েছে?’

- ‘আমি ঠিকই আছি, তুমি কোথায় এখন?’

- ‘অফিসের উল্টোদিকের একটা STD বুথে এসেছি, তুমি বললে তো খুব দরকার!’

- ‘হ্যাঁ হ্যাঁ। খুউ--ব দরকার।‘

- ‘বল।‘

- ‘আমি মা হতে চলেছি।‘

ফোনের ওপার থেকে বেশ কিছুক্ষণ কোন আওয়াজ না পেয়ে মিনতি আবার বলে উঠল,

- ‘কি গো! শুনতে পাচ্ছ?’

- ‘তুমি সিওর?’

- ‘হ্যাঁ, ডাক্তার দে- র কাছে গেছিলাম আজ।‘

- ‘আচ্ছা।‘

- ‘তুমি খুশি হওনি?’

- ‘না না। সেরকম ব্যপার না।‘

- ‘তাহলে?’

- ‘আমি চাকরিসূত্রে বাইরে বাইরে থাকি মিনু তোমায়ই সময় দিতে পারিনা তেমন, একা পারবে সব সামলাতে?’

- ‘বাঃ! তুমি কি সারাজীবনের মত বাইরে গেছ নাকি! তুমি যখন ফিরবে কত আনন্দ হবে বলত! আর সারাদিন তো একাই থাকি, বাচ্চা থাকলে সময়ও কেটে যাবে।‘

‘আর যখন তুমি ফিরবে, আমরা একসাথে থাকব সারাদিন। কত ঘুরব একসাথে! বল ভাল হবেনা?’

- ‘হ্যাঁ হবে… তুমি খুশি?’

- ‘হ্যাঁ হ্যাঁ! খুব খুশি আমি! তুমি শুধু তাড়াতাড়ি চলে এস, কতদিন দেখিনি তোমায়! তোমার ওই সাদা জামাটার বোতাম ছিঁড়ে গিয়েছিল বলেছিলে, লাগিয়েছ? নাকি বেখেয়ালিপনায় সেটাই পড়ে ঘুরছ? অন্তত সেই অজুহাতেও তো একবার আসতে পার!’

প্রতাপ পরনের সাদা জামাটার ছেঁড়া বোতামের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল,

- ‘যাব মিনু, কাজের চাপ প্রচণ্ড। আমারও ভাল লাগেনা আর, দমবন্ধ হয়ে আসছে যেন!’

- ‘অফিসে বলে দাও হেড অফিসের ডাক পড়েছে, না আসলে তাণ্ডব সৃষ্টি করবে।‘

- ‘হাহা! সেই বলে চাকরিটা খোয়াই আরকি! তোমার শরীর ঠিকাছে তো?’

- ‘হ্যাঁ ঠিকই আছে, মাথাটা ঘুরছিল সকালের দিকে একটু ওটা এমন কিছু ব্যপার না।‘

- ‘খাওয়া-দাওয়া ঠিক করে কর এই কয়েকটা দিন, নজর দাও শরীরের উপর একটু।‘

- ‘তুমি ফিরে এস একটিবার, দেখবে সব ঠিক হয়ে গেছে।‘

- ‘থাক, আর মিষ্টি মিষ্টি কথা বলতে হবেনা! আমি চেষ্টা করছি তাড়াতাড়ি ছুটি নেওয়ার, এখন রাখি?’

- ‘আচ্ছা রাখ, আর সাবধানে ফির। দেরি করোনা, খেয়ে শুয়ে পড় তাড়াতাড়ি।‘

- ‘আচ্ছা। খেয়াল রেখ নিজের। রাখলাম।

- ‘আচ্ছা।

মিনতি ফোনটা ধরে থাকল যতক্ষণ না ওপার থেকে টেলিফোন কাটছে, তারপর ফোনটা আস্তে আস্তে রিসিভারের উপর রেখে আবার খাটের কোণায় বসে বিছানার উপর পড়ে থাকা চিঠিটা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করল।

***

প্রিয়তম,

প্রায় এক বছর হতে যায় তোমাকে দেখিনি। তোমার ছেলে হবে শুনেও একবারও দেখতে আসতে ইচ্ছা করেনি? আমি নাহয় পুরনো হয়ে গিয়েছি এখন। যাকগে!

পরশু ডাক্তার দে- র কাছে গিয়েছিলাম আবার, উনি পরের মাসের ষোল তারিখ ডেট দিয়েছেন। সেদিন তোমায় দেখতে না পেলে তুমি আমার মরা মুখ দেখবে!

ফোন ও করোনা আজকাল ঠিক করে, চিঠিও দু-চার কথায় লিখে ছেড়ে দাও, আমি সারাদিন ওইই পড়ি। আবার জিজ্ঞাসা করলে বলবে ‘কাজের চাপ’! তোমার কাজের চাপ যেন শেষই হয়না। বউদের নাম তোমাদের মত লোকেদের জন্য খারাপ হয়, অভিযোগ জানালেই বউ দজ্জাল!

কাল শম্পা এসেছিল দেখতে, বারবার তোমার কথা বলছিল আর আমার মন খারাপ হচ্ছিল তত তোমার কথা ভেবে। রাতে তোমার ওই আগ্রার ছবিটা দেখছিলাম। আগে তাও বলতে কখন খাচ্ছ, শুতে যাচ্ছ, অফিসে যাচ্ছ। এখন কোনকিছুই বলতে চাওনা! আমি যখন কথা বলতে যাই কোন না কোন অজুহাতে ফোনটা রেখে দাও। ভাল লাগেনা আর এভাবে!

মা রোজ আমায় জিজ্ঞাসা করেন, ‘খোকা কবে আসবে?’ ,মায়ের সাথে কথা বোল একবার ফোন করে। সারাদিন আমি ছাড়া আর কথা বলারই বা কে আছে! এখন তাও আমার শরীরের খেয়াল রেখে পাশের ঘরে বসে বই পড়েন আর খুব আস্তে রেডিও চালান। কতবার বলেছি আমার সাথে এসে গল্প করতে, প্রত্যেকবারই আমায় বিশ্রাম নিতে বলে দমিয়ে দিয়েছেন। তুমি বোল না একবার! তুমি বেশী জোরাজুরি করলে ফেলতে পারবেন না।

একটা কথা বলছি, হাসবেনা। বাচ্চাটা না এখন থেকেই আমার কথা শোনে জানো! আগের দিন পেটে লাথি মারল দু-বার, আমি বললাম, ‘মায়ের সাথে এরকম করতে নেই বাবু।‘ ,ওমা! তারপর কিচ্ছু করল না আর।

ভাল হবে, জানো? আমরা একসাথে থাকব, অনেক সুখে থাকব আমরা। আমি ভগবানের কাছে রোজ প্রার্থনা করি তোমার পরের পোস্টিং যেন এখানে হয়। ভাল লাগেনা এতদিন তোমায় ছাড়া থাকতে। একা লাগেনা ঠিক, সময় কেটে যায় কিছু না কিছু করে, কিন্তু তোমায় ছাড়া ফাঁকা ফাঁকা লাগে বড্ড। কত-দিন ভেবেছি তোমায় ছাড়া থাকার অভ্যেস হয়ে যাবে, কিন্তু হয়না। সকালটা কেটে যায় কোনভাবে, রাতে মন খারাপ লাগে খুব। বুকের ভিতরটা গুমরে ওঠে, কান্না পায়।

তুমি কি কোন গুপ্ত প্রণয়ী পেয়েছ? তোমাকে তো দেখিনা এত ব্যাকুল হতে আমার সাথে কথা বলার জন্য! ভালবাসনা আর।

যাই হোক, অযথা রাগ করেও লাভ নেই তোমার উপর, সেটাও বেশিক্ষণ করে থাকতে পারিনা। নিজের একটা ছবি পাঠিয়ে আর সশরীরে এসে আমায় উপকৃ…

হাত থেকে কলমটা বিছানার উপর পড়ে গেল মিনতির, পেটে অসহ্য ব্যথা শুরু হয়েছে। কোনরকমে খাট থেকে উঠবার চেষ্টা করল একবার, পারলনা। আবার মনের জোর সঞ্চার করে উঠে দাঁড়াল। মাথা ঘুরে পড়ে যাচ্ছিল, কিন্তু টেবিল ধরে নিজেকে সামলে নিল। কি মনে হতে একবার বিছানার দিকে তাকাল মিনতি, রক্তে ভিজে আছে বিছানা। মাটির দিকে তাকিয়ে দেখল শাড়ি থেকে চুঁয়ে চুঁয়ে মাটিতে রক্ত পড়ছে। চোখ ঝাপসা হয়ে এল মিনতির। চোখের সামনে একটা বিন্দু টিমটিম করে জ্বলতে লাগল। আলোটা বড় হতে লাগল আস্তে আস্তে। মিনতি ভয় পেল প্রচণ্ড, পেটের ব্যথা বাড়তে লাগল আরও।

চাপা আর্তনাদে মিনতি ডাকতে লাগল, ‘মা’ ,কিন্তু গলার স্বর পাশের ঘর অবধি পৌঁছল না। টলতে টলতে সে দরজার দিকে এগিয়ে চলল। সে ডেকে চলল, ‘মা’। চোখ বন্ধ হয়ে এল তার। হঠাৎ এক আশ্চর্য স্বস্তি ঘিরে ধরল তাকে, মাটিতে লুটিয়ে পড়ল মিনতি।

[তিন]

সিঁড়ি দিয়ে তিনতলায় উঠতে উঠতে অসীমবাবু ভাবছিলেন কি বলবেন তিনি আর, বলারই বা কি আছে! প্রতাপবাবুর মানভঞ্জন করা বা তাঁকে শান্ত করার ক্ষমতা অসীমবাবুর নেই, সে পথ তিনি নিজেই খুঁজে পাননি আজ পর্যন্ত।

এইসব আকাশ-পাতাল ভাবতে ভাবতে কখন যে অসীমবাবু তিনতলায় চলে এসেছেন তাঁর খেয়াল নেই। বারান্দায় দেখলেন প্রতাপবাবুর ঘরের সামনে একজন নার্স দাঁড়িয়ে বোর্ডের উপর একটা কাগজ রেখে কিছু লিখছেন। অসীমবাবু এগিয়ে গেলেন বাঁদিক থেকে তিন নম্বর ঘরের দিকে। দরজার হাতল ঘোরাতেই পাশ থেকে মেয়েলী কণ্ঠে প্রশ্ন এল, ‘আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?’ অসীমবাবু ঘুরে তাকালেন নার্সের দিকে, বললেন, ‘হ্যাঁ, আমার বন্ধু আছেন এই ঘরে, প্রতাপ সেনগুপ্ত।‘ নার্স তাকালেন অসীমবাবুর দিকে, ‘ওহ!’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘খারাপ খবর। উনি আধ ঘণ্টা আগে মারা গেছেন।‘ প্রথমটা কিছু বুঝতে পারলেন না অসিমবাবু, বাক্রুদ্ধ হয়ে রইলেন। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘খবর পাঠিয়েছেন কাউকে?’ নার্স নিজের কাজ করতে করতে বললেন, ‘হ্যাঁ, স্ত্রী আর ছেলেকে খবর দেওয়া হয়েছে, ওনারা এসে পড়বেন যেকোনো মুহূর্তে।‘ কেউ যেন তুলে নিয়ে আছড়ে ফেলল অসিমবাবুকে, আপনমনেই বলে উঠলেন, ‘মিনু আসছে!’

কিছুক্ষণ যেন অসিমবাবুর কোন সাড় ছিলনা। নার্স আবার প্রশ্ন করলেন, ‘আপনি ঠিক আছেন?’ অসীমবাবু একবার অসাড় চোখে নার্সের দিকে তাকিয়ে উত্তর দিলেন, ‘হ্যাঁ।‘ নার্স অসীমবাবুর মুখ দেখে মনের ভাব খানিকটা আন্দাজ করে বললেন, ‘আপনি ওই চেয়ারে বসে অপেক্ষা করুন ওনার স্ত্রী-ছেলে আসা অবধি।‘ ,বলে পাশে রাখা একটা খালি চেয়ারের দিকে আঙ্গুল দেখালেন। অসীমবাবু নার্সের কথা শুনে মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ারের সামনে গিয়ে পরের পদক্ষেপের ব্যপারে বিবেচনা করলেন কিছুক্ষণ, তারপর ধপ্‌ করে বসে পড়লেন চেয়ারে। সবকিছু কিরকম তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে তাঁর মাথার মধ্যে, ঘোলাটে হয়ে আসছে দৃষ্টি। অসীমবাবু তাকিয়ে থাকলেন, ঘাড় ঘুরিয়ে আশেপাশের জগত দেখলেন। কানে ক্ষীণ প্রাণোচ্ছল আওয়াজ এল, ‘বাবা, মেয়ে হয়েছে।‘ ,অসীমবাবু তাকিয়ে থাকলেন। সামনে দিয়ে দুজন যুবক একটা বড় ভাঙ্গা আয়না বয়ে নিয়ে গেল, অসীমবাবু তাতে নিজের মুখ দেখলেন একবার। গাল ঢুকে গেছে তাঁর, চোখের তলায় কালি। বয়সের ভারে দাড়ি পেকেছে আর চিবুকে দাড়ির তলা থেকে বড় একটা আঁচিল উঁকি মারছে। চারিদিকের সবকিছু নিবিষ্ট মনে পর্যবেক্ষণ করলেন যতক্ষণ না চোখ বুজে এল তাঁর, হয়ত আরও অনেক-অনেককিছু দেখার ছিল, কিন্তু তার জন্য তাঁর মনে অনুতাপ নেই, তিনি ক্লান্ত। চোখ বুজে তাঁর শরীর চেয়ারের উপর এলিয়ে দিলেন অসীমবাবু।

***

আস্তে আস্তে চোখ খুলে তাকাল মিনতি। অন্ধকার ঘর, জানালার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারল ভোর হবে এবার। এই ঘরে কোন ঘড়ি নেই। এই বুদ্ধি অবশ্য মিনতিরই। তার স্বামী বাইরে বাইরে থাকে, ফিরলেও খুব বেশী হলে একমাসের জন্য, তাও প্রত্যেক বছর ফেরেনা। এই কারণে মিনতির হুকুমানুসারে ঘর থেকে ঘড়ি খুলে নেওয়া হয়েছে। স্ত্রী- এর সাথে কাটান সময়ের হিসেব করা যাবেনা, তার স্বামী আবার খুব হিসেবী মানুষ!

মিনতি আস্তে আস্তে অসীমের দিকে পাশ ফিরে শুয়ে অসীমের বুকের উপর হাত রাখল, মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল একভাবে। ক্লান্ত অসীম, মাঝরাতের পর এসেছে সে। নাকের নীচে পুরু গোঁফের ফাঁকে বেশ কয়েকটা পাকা চুল ধরা পড়ল মিনতির চোখে, কলপ করে দিতে হবে, সকালে তেমন কাজ নেই তার। মা এই বয়সে এসেও কর্মক্ষমতা হারাননি, বরং সাহায্য করতে গেলে ধমকে দেন।

বিয়ের পর প্রথম প্রথম কিচ্ছু করতে হয়নি মিনতিকে। মা বলেছিলেন, ‘তুমি পরাশুনা জানা শিক্ষিতা মেয়ে, তুমি বাড়ির কাজ কেন করতে যাবে! তুমি বরং চাকরির চেষ্টা কর, আজকাল কত মেয়েই তো করছে! বুবুন-ও এখানে থাকেনা, বাড়িতে সারাদিন থাকলে একা একা লাগবে তোমার।‘ তারপর অনেক জোরাজুরি করায় মিনতি রান্নায় অংশগ্রহণ করতে পারে এখন। তাও সে-ই বা এমন কি কাজ! বাড়িতে থাকে বলতে তো শুধু দুজন মানুষ, তাতে আবার রান্নার ঝক্কি কি! এখন তাও মা-ও নেই, বারানসি গিয়েছেন তীর্থে, মাসখানেক পর ফিরবেন বলে গিয়েছেন।

অসীম ঘুমের মধ্যেই পাশ ফিরল মিনতির দিকে, মিনতি অসীমের বুকে হাত রেখে আঁকিবুঁকি কাটতে লাগল। এরকমভাবে থেকে গেলে কত ভালই না হত! সে যদি পারত পৃথিবীর সমস্ত ঘড়ি একসাথে বন্ধ করে দিতে, কি ভালই না হত!

অসীম একবার নড়ে উঠল, চোখ মেলে তাকাল অল্প, মিনতিকে দেখে মুচকি হেসে আবার চোখ বন্ধ করল। মিনতি চালাকি ধরতে পেরে ঠিক করল এত সহজে অসীম পার পাবেনা। মিনতি ডাকল, ‘এই।‘ কোন সাড়া না পেয়ে দ্বিতীয়বার সে কিছুটা উঁচু স্বরে ডাকল, ‘এই!’ এবার পালানোর উপায় না দেখে অসীম ক্ষীণকণ্ঠে সাড়া দিল, ‘হুম।‘ ‘দুপুরে সিনেমা না দেখতে গেলেই নয়?’ , প্রশ্ন করল মিনতি। অসীম বলল, ‘সে না গেলেও হয়। যাবেনা কেন? শরীর খারাপ?’ মিনতি বলল, ‘না।‘ ‘তাহলে?’ ,প্রশ্ন করল অসীম। মিনতি লজ্জা পেয়ে বলল, ‘বাইরে যাবনা, এখানেই থাকব একসাথে সারাদিন, ভাল হবে বেশ।‘

অসীমের ঠোঁটে হাসি ফুটল। সে চোখ খুলে মিনতির দিকে তাকাল, তারপর তার মাথা হাতের উপর ভর দিয়ে মিনতিকে বলল, ‘বটে! আমার সাথে থাকা ‘সত্যজিত রায়’- এর সিনেমা দেখার চেয়ে বেশী ইম্পরট্যান্ট! ‘আপনাকে তো কাল্‌টিভেট করতে হচ্ছে মশাই!’’ মিনতি একবার ‘ধ্যাত!’ বলে অসীমের বুকে মুখ লুকাল। মিনতির নিঃশ্বাস পড়তে লাগল অসীমের বুকে, অসীম চোখ বুজল। মিনতি ওভাবেই শুয়ে প্রশ্ন করল অসীমকে,

- ‘অভিসারে যাবে?’

হেসে উঠল অসীম। বলল,

- ‘তোমার স্বামী রাগ করবে। আর বিবাহ পরবর্তী জীবনে অভিসারে যাওয়া যায় বুঝি?’

- ‘যায়, কেন যাবেনা! তুমি কিচ্ছু জানো না। একদিন আমি যাব তোমার অভিসারে।‘

মিনতির দীর্ঘশ্বাস পড়ল অসীমের বুকে। অসীম দু-হাত দিয়ে মিনতির মাথা আগলে নিল বুকে, তারপর বলল, ‘এখন আর জেগনা, শুয়ে পড়। কাল কোত্থাও যাবনা। তোমার কাজ হয়ে গেলে সারাদিন থাকব তোমার সাথে, তোমার হুকুম তামিল করা ছাড়া কাল আর কোনও কাজ নেই আমার।‘ মিনতি হাসল, বলল, ‘ঠিকাছে।‘ এই বলে সে অসীমের বুকে চোখ বুজল। অসীম দীর্ঘশ্বাস ফেলে দু-হাত দিয়ে আগলে নিল মিনতিকে, তারপর আবার চোখ বন্ধ করল সে।


সমাপ্ত ।


লেখকঃ সৌরভ সূর্য মজুমদার


121 views

Subscribe to Our Newsletter

  • White Facebook Icon

© 2023 Powered by Maiti Infomedia Pvt Ltd.