• Admin

গল্প: "পটলদার তক্তপোশ" (সাধন চন্দ্র সৎপথী)

টিনের চালে ফট্ফট্ শব্দে ঘুম ভেঙে গেল তনুর ।  চোখ বন্ধ রেখেই  বোঝার চেষ্টা করল -শব্দটা কিসের ? এখনও তো ভোর হয়নি মনে হচ্ছে । তাই এখন কোনো পাখির চালে বসার কথা নয় । অবশ্য রাতচোরা পাখিরা বিশ্রাম করার জন্য মাঝে মাঝে যে চালে বসে না.--এমন নয় ; তবে তাতে বিশেষ একটা শব্দ হয় না । মোরগ বা কোনো বড়ো পাখি টিনের চালে হাঁটাহাঁটি করলে এই রকম শব্দ হয় ।            এবার  খোলা জানালার দিকে তাকিয়ে তনু দেখল ---অনুমান ঠিকই , ভোরের আলো এখনও ফুটে উঠেনি---অন্ধকারই আছে । তাহলে শব্দটা কী বৃষ্টি পড়ার ? তনুর ভাবনার উত্তর দেবার জন্যই যেন টিনের চালে ঝমঝম্  শব্দ উঠল। তার মানে --বৃষ্টি পড়ছে ! ঝমঝম্ শব্দটা হঠাৎ একবার থামল ---আবার সঙ্গে সঙ্গেই দ্বিগুণ জোরে শুরু হল ।  খোলা জানালা দিয়ে গুঁড়িগুঁড়ি জল উড়ে এসে ঘরে ঢুকছে। ঠাণ্ডা বাতাসও আসছে । তনু এবার পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হল --বৃষ্টিই পড়ছে ।    আনন্দে তনুর মন নেচে উঠল । ক'দিন ধরেই বৃষ্টির জন্য অধীর হয়ে উঠেছিল সবাই । চাতকের মতো বারবার তাকাচ্ছিল আকাশের দিকে। লোকের কথায়.হতাশা ঝরে পড়ছিল --" এ বছর ভালো বৃষ্টি বোধহয় হবে না ; আষাঢ়ের  প্রথম সপ্তাহটাও পেরিয়ে গেল ---অথচ মেঘের দেখা নেই ।.আকাশ দেখে মনে --আষাঢ় নয় , বৈশাখ - জ্যৈষ্ঠ মাস চলছে । এরকম মেঘ শূন্য.আকাশ এই সময়ে দেখিনি কোনো বছর । বৃষ্টি না হলে কী যে হবে ?" বৃষ্টির কামনায় অনেক গাঁয়েই নাম-সংকীর্তন শুরু হয়েছিল । "ভোগ উৎসর্গ করার সময় বৃষ্টি হবেই "---এমন অভ্রান্ত বিশ্বাসও ভ্রান্তিতে পরিণত হয়েছিল । তনুও হতাশ হয়ে পড়ছিল । এই সময় বৃষ্টিটা একান্ত দরকার যে তাঁরও । বৃষ্টি না হলে অনেক ক্ষতি হয়ে যাবে । পরে বৃষ্টি হলেও সেই ক্ষতি আর পূরণ হবে না । আর হতাশা থেকেই ধারণা দৃঢ় হচ্ছিল --" এবছর ভালো বৃষ্টি হবে না । "   সবার ধারণাকে মিথ্যা প্রমান করতেই যেন আজ বৃষ্টি এল ।.টিনের চালের উপর একটানা ঝমঝম শব্দই বলে দিচ্ছে --মুষলধারায় বৃষ্টি হচ্ছে ।         তনু আর শুয়ে থাকতে পারল না --জানালার কাছে এসে দাঁড়াল । পাল্লাটা আড়কপাটি করে বাইরের দিয়ে তাকিয়ে রইল ।          আকাশ মেঘে ঢাকা , তার উপর বৃষ্টি পড়ছে বলেই ভোরের ফিকে অন্ধকার আবার গাঢ় হয়ে উঠেছে । মনে হচ্ছে --সকাল হতে এখনও অনেক দেরি ।  টিনের চালে , গাছের পাতায় একটানা ঝমঝম শব্দ বেজেই চলেছে । ঠাণ্ডা বাতাস তনুর চোখে-মুখে যেন স্নেহের স্পর্শ বুলিয়ে দিচ্ছে । চোখে আবার ঘুম নেমে আসছে ; তবু তনু জোর করে চোখ মেলে তাকিয়ে রইল। বৃষ্টির ফোঁটাগুলিকে দেখার চেষ্টা করল ; কিন্তু অন্ধকার থাকায় সেই চেষ্টা সফল হল না ।         চোখ ফিরিয়ে ঘরের ভিতরের দিকে তাকাল । কিন্তু সেখানেও ঘন অন্ধকার । তনু জানে ঐ অন্ধকারেই ডুবে একটা চওড়া তক্তপোশে শুয়ে ঘুমিয়ে আছে তাঁর স্ত্রী টুনি এবং পাঁচ বছরের ছেলে টুনটুন । পাশের ঘরে মা-বাবাও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন । তনুর মনে হল --সে যেন এই সংসারের প্রহরী ---তাই সকলে নিশ্চিন্তে ঘুমালেও সে জেগে আছে ।           হঠাৎ আলোর ঝিলিকে বাইরের অন্ধকার দূর হয়ে গেল পলকের জন্য । সেই ঝিলিকের কিছুটা অংশ আধখোলা জানালা দিয়ে ঘরে ঢুকে টুনি ও টুনটুনের মুখটাকে আলোকিত করে তুলল । পলকের মধ্যেই তনু দেখল --কী গভীর নিশ্চিন্ত ভাব দু'জনের মুখে !      গাঢ় অন্ধকার আবার ছুটে এসে ঢেকে ফেলল মুখ দুটিকে ।  সঙ্গে সঙ্গে কানফাটানো তীব্র আওয়াজ টিনের চালকে কাঁপিয়ে দিল । আবার বৃষ্টি নামল মুষলধারায় । আর মাঝে-মাঝেই বাজ পড়তে লাগল । জানালার কাছ থেকে সরে এসে তনু নিজের বিছানায় বসল । বিছানা বলতে --সরু তক্তপোশের উপর একটা কাঁথা পাতা ---আর একটা বালিশ ।             তনুর মনে পড়ল --এই সরু তক্তপোশটা কিনেছিল পটলদার কাছ থেকে । পটলদার ছিল চায়ের দোকান । খদ্দেরদের বসার জন্য বাঁশের বেঞ্চের বদলে সরু তক্তপোশ করিয়ে ছিল কয়েকটা । দু'সারিতে বসতে পারত খদ্দেররা ।                      তখন আর পাঁচজনের মতো তনুও সকাল-সন্ধ্যায় আড্ডা দিত পটলদার দোকানে । পটলদার তখন চলছিল ভালোই । কিন্তু মাস ছয়ের মধ্যেই গাঁয়ে আরও দুটো চা দোকান হয়েছিল । পটলদার খাতার বাকি শোধ না করেই অনেক খদ্দের সেখানে ভিড় জমিয়েছিল ।      আরও বছর খানেক টিমটিম করে চলার পর পটলদার দোকানটা উঠে যেতে বাধ্য হয়েছিল । মালপত্র যা ছিল কমদামে বা জলের দরে বিক্রি করে দিয়ে পটলদাও নিরুদ্দিষ্টের খাতায় নাম লিখিয়েছিল ।              অনেক দিন পরে পটলদার মুখটা মনে পড়তেই  তনুর মন খারাপ হয়ে গেল ।.পটলদা নিরুদ্দিষ্ট হলেও  পটলদার তক্কপোশটা আজও আছে। বেশ যত্ন করে তক্তপোশটা করিয়েছিল পটলদা ---তাই এখনও ভালো ভাবেই টিঁকে আছে । এই তক্তপোশটার জন্যই নিজের ফেলে আসা সেই দিনগুলির কথা ভুলে যায়নি তনু । আর মনে পড়ে পটলদার কথা ।. বৃষ্টির ঝমঝম শব্দের মধ্যে তনু যেন শুনতে পেল পটলদার বহুবার বলা কথা ---"বুঝলি তনু , কাজই হল ধর্ম ---ভালো ভাবে কাজ করে গেলে ভালো ফল অবশ্যই পাবি । মন দিয়ে কাজ করলে কোনো কুচিন্তা মাথায় আসবে না।  আর তোর উন্নতিও কেউ আটকাতে পারবে না । "         তনুর ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল ; মনে মনে বলল --"পটলদা , তুমি তো কাজের মধ্যেই ডুবে ছিলে ---সারাদিন তোমার ধ্যান-জ্ঞান ছিল ঐ চা-দোকান । আর সৎ ভাবেই তো চলছিলে  । তাহলে পাততাড়ি গুটিয়ে তোমাকে চলে যেতে হল কেন ? আসলে কী জানো ,পটলদা , নিজে সৎ থাকলেই উন্নতি করা যায় না ; তার জন্য চাই বুদ্ধি ---যেটা তোমার কমই ছিল ।

   তনু জানে -বুদ্ধি কম বা বেশি যা-ই থাক না কেন একসময় পটলদাই ছিল তাঁর আদর্শ., পরামর্শদাতা । সৎ ভাবে কাজে ডুবে থাকার কথা পটলদার কাছে দু'বেলাই শুনতে হতো। পটলদা বলত --"এবার একটা কাজ-কর্ম জোগাড় করতেই হবে তোকে ---বড়ো হয়েছিস , বিয়ে-টিয়ে করে সংসারি হতে হবে ।"

ঘরে এসেও পটলদার কথাই যেন শুনতে পেয়েছিল । বাবাকে বলা মায়ের চাপা স্বরের কথা কানে এসেছিল  --"ছেলে বড়ো হয়েছে --এবার বিয়ের কথা ভাবো । নাহলে ঐ অমুকের ছেলের মতো নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেবে । তখন আঙুল কামড়ানো ছাড়া কিছুই করার থাকবে না ।" তনুর মনের মধ্যে ফাগুনের দখিনা বাতাস বইতে শুরু করেছিল । পরিচিত -অপরিচিত কোনো না কোনো যুবতীর মুখ দিন-রাত্রির স্বপ্নে ঘোরাঘুরি করছিল । আত্মীয় বা পরিচিতদের মাধ্যমে দু'-একটা খোঁজ-খবর আসছিলও।.কিন্তু সকলের মুখে একটাই প্রশ্ন ছিল --" ছেলে কী কাজ করে ? রোজগার কেমন করে ? " আর এই প্রশ্নেই মুখের চেহারাটা পাল্টে যেত মা-বাবার ---মাথা নীচু করে ঝিম মেরে বসে থাকত । তনুর মনে শীতল উত্তুরে হাওয়া বইতে শুরু করত । তারপর লোক-জন চলে গেলেই মায়ের রাগ ফেটে পড়ত গালি-গালাজ হয়ে । নেশা করে রাতে ঘরে এসে বাবা অকথা -কুকথা বলে গায়ের ঝাল মেটাত ; বেকার , নিষ্কর্মা ছেলেকে ঘর ছেড়ে চলে যেতে বলত । গালি-গালাজ , বকাবকি একসময় আক্ষেপে পরিণত হতো ---তারপর নাক ডাকার শব্দ শোনা যেত । তনু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করত --কাল সকালেই যে কোনো একটা কাজে লেগে যেতেই হবে । এই হেনস্তা আর সহ্য হয় না ।         সারারাত মাথার মধ্যে ভাবনা ঘুরে বেড়াত ---কী কাজ করা যায় ? কাজ তো অনেক কিছুই করা যায় । কিন্তু পছন্দ মতো  কাজ কই ? কারো বাড়িতে জন-মজুর খাটার ইচ্ছা নেই --কেননা ওতে কোনোদিনই উন্নতির সম্ভাবনা নেই ।     কাজের ভাবনার মাঝেই ভেসে উঠত সুন্দর কোনো মুখের ছবি । তবে এটাও বুঝতে পেরেছিল যে --ভালো কাজ না পেলে সুন্দর কোনো মুখ তাঁর ঘরে আসবে না । ভালো রোজগার আর সুন্দর মুখ --যেন গভীর সম্পর্কে যুক্ত । একটা না পেলে অন্যটা পাওয়া যাবে না । ভাবতে ভাবতে কখন যে চোখে ঘুম এসে যেত ---বুঝতেই পারত না । যখন ঘুম ভাঙত. তখন বেলা অনেক ; মায়ের কথা মতো --"দশটা বাজে । " শুরু হতো মায়ের বকবকানি --" এতক্ষণে ঘুম ভাঙল তোর ! বুড়ো মানুষটা কোন্ ভোরে উঠে কাজে বেরিয়েছে । তোর মনে কী দয়া-মায়া নাই ? কাজ-কর্ম করে বুডো বাপের একটু সুরাহা করতে পারিস না ?  "

    বিরক্তিতে মনটা নিম-তিতা হয়ে উঠত । চোখে-মুখে জল দিয়ে , জামাটা কোনো রকমে গলিয়ে চলে আসত পটলদার চা-দোকানে । এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা হাতে ধরিয়ে দিয়ে পটলদা বলত --"অনেক টাকা বাকি হয়েছে রে , তনু ----টাকা না দিলে আর চা খাওয়াতে পারব না । " মিষ্টি চা - টা সঙ্গে সঙ্গে তিতা হয়ে য