"সারপ্রাইজ গিফ্ট"


(১)

রাতের রাউন্ডটা শেষ করে ডক্টর্স রুমে গিয়ে বসে অরুষাগ্নি ৷ কিছুদিন আগেই ও এই সরকারি মেডিক্যাল কলেজ -হাসপাতালে পেডিয়াট্রিসিয়ান হিসেবে জয়েন করেছে .....সেদিক থেকে ও একান্তই নবাগত ৷ তবে এই অল্প ক'দিনেই সৌম্যকান্তি তরুণ চিকিৎসকটি সকলের কাছে বেশ পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন ৷ রূপে কার্ত্তিকেয়,গুণে ধ্বন্বন্তরির ন্যায় হলেও ওর সুমিষ্ট ব্যবহার সকলকে সবচেয়ে বেশী আকর্ষণ করে ৷ আগুণের ন্যায় প্রভাময় হয়েও যেন কোনো তেজ নেই....একেবারে সার্থকনামা!

রাত বারোটা বাজতে এখনও বেশ কিছুটা সময় বাকি আছে....একটু পরেই সোশ্যাল মিডিয়াতে জন্মদিনের শুভেচ্ছার ঢেউ আছড়ে পড়বে ৷ প্রথম প্রথম এসব খুব ভালোই লাগতো ওর ....কিন্তু এখন যেন সবই নিষ্প্রাণ বলে মনে হয় ৷ সেজন্যই চুপি চুপি ডিউটি সেরে নির্জন ডক্টর্স রুমের চেয়ারটিতে এসে বসেছে নিজের মতো করেই 'বার্থ-ডে'টা পালন করবে বলে ৷ অন্ততঃ আজকের দিনের জন্য সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিমতা থেকে ও বেরিয়ে আসতে চায় ৷ ভার্চুয়াল জগতের প্রতি ক্রমশ বীতস্পৃহ হয়ে উঠছিল ও.... ওর মনে হয়,আজকাল 'সোশ্যাল মিডিয়া' আছে তাই এতসব সম্পর্ক, এতসব শুভেচ্ছার ছড়াছড়ি.... অন্যথায় এসব কারুর মনেই থাকে না ! তাই সর্বাগ্রে ফেসবুক থেকে নিজের জন্ম তারিখটি 'পাবলিক' থেকে 'ওনলি মি' করে দিল ৷ তারপর ছোটো বড়ো মোমবাতি গুলো দিয়ে সুন্দর করে টেবিলটি সাজালো ৷ যদিও হস্পিটাল চত্বরে সচরাচর লোডশেডিং হয় না....তবুও ঝড়-বৃষ্টির রাতে কখন কি হবে বলা যায় না....তাই ক'দিন আগে বেশ কয়েকটা মোমবাতি কিনে রেখেছিল ৷ আজ ওগুলোর সদ্ব্যবহার হবে ৷ বাইরের ঝমঝম বৃষ্টি,মেঘের গুরু-গম্ভীর গর্জন,রুমের মধ্যে মোমবাতির আবছা আলো ....সব মিলিয়ে এক মায়াময় পরিবেশের সৃষ্টি করেছে ৷ সাতাশ বছর আগের সেই মায়াবী রাত যেন আবার ফিরে এসেছে....এমনই এক দুর্যোগের রাতই নাকি ওর প্রাণ বাঁচিয়েছিল! তখনও ওদের গ্রামে কারেণ্ট আসেনি....এরকম মোমবাতি কিংবা কেরোসিন লণ্ঠনই ছিল সেদিনের ভরসা ৷ এতবছর পর এমন একটি দিনের সত্যিই সমাপতন ঘটলো! এই স্নিগ্ধ মোমবাতির আলো মাঝে মাঝে মনে করিয়ে দিচ্ছে, যেন তার জীবন থেকে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাওয়া কাউকে ডেকে আনার জন্য আজ প্ল্যানচেট-এ বসেছে ও ৷ কখনওবা মনে হচ্ছে,এরা সেই মিছিলের মোমবাতি.....নির্ভয়াদের প্রতীক ৷ যেন ওরা মুখাগ্নির মাধ্যমে আজ মুখশুদ্ধি করছে আর গলিত মোম বমনের মাধ্যমে নিঃশব্দে সমাজের প্রতি ক্ষোভ উগরে দিচ্ছে ৷

ধূসর স্মৃতির পাতায় কত কথাই আজ ভেসে উঠছে ....এমনটা তো হওয়ার কথা ছিল না! তবে কি হিজড়ার কথাটা সত্যি হলো!? লোকে বলে, হিজড়ারা যা বলে তা নাকি ফলে যায়...তাই ওদেরকে উত্যক্ত করতে নেই। কিন্তু ওর যুক্তিবাদী মন এসব গুজবে কান দেয় না। তাছাড়া ও তো কাউকে উত্যক্ত করেনি কখনও...বরং সেবার এক বৃহন্নলা অরুষাগ্নিকে আগ বাড়িয়ে দু'টো কটূকথা শুনিয়ে দিয়েছিল।

ওরা দু'জন ভিক্টোরিয়া ঘুরতে গিয়েছিলো সেবছর...রাস্তা আটকে দাঁড়ালো একদল বৃহন্নলা। মাথাপিছু একশো করে দিতে হবে! যাহোক,অরুষাগ্নির দেওয়া টাকায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি ওরা... অকস্মাৎ ধেয়ে আসলো বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো এক মর্মভেদী কথা ,

"পুরোটা দিলি না তো ! ব্রেক-আপ হয়ে যাক তোদের।"


"যা ছিলো দিয়ে দিলেই তো পারতে",ছলছল চোখে বলে উঠলো অদ্রিকা।

–তারপর?বাড়ি ফিরতে না? হাতে টাকাও তো নেই বেশি।

–কিন্তু ঐ হৃদয়বিদারক কথাটা তো আর শুনতে হতো না!

–শোনো,আমাদের কোনো দোষ নেই এতে...আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দিয়েছি । তাই ওসব অভিশাপ আমাদের লাগবে না। তাছাড়া যা চাইবে তা দিতেই হবে...এমনটি কে বলেছে!

রিলেশনশিপে যাওয়ার পর ওদের এটাই ছিলো প্রথমবার একসাথে ঘুরতে যাওয়া।

তাই এসব সান্ত্বনা সত্ত্বেও এই একটা কথা পুরো দিনটা নষ্ট করতেই যথেষ্ট ছিলো।

আজ এত বছর পর হঠাৎ এই ঘটনাটা কেন মনে এলো ওর! আসলে বেশ কিছুদিন হলো ওদের সম্পর্কে একটু একটু করে যেন চিড় ধরতে শুরু করেছে!

এই তো ক'দিন আগেই যে মেয়েটা সারাক্ষণ হোয়াটসঅ্যাপ কিংবা ট্রু-কলারে ওর লাস্ট সিন চেক করতো...এখন কল তো দূর অস্ত আজ তার প্রোফাইল পিকচারটাও দেখতে পায়না অরুষাগ্নি।

অদ্রিকার আচরণের এ হেন আকস্মিক পরিবর্তনের কোনো কারণ এখনো পর্যন্ত ও খুঁজে পায়নি।

তবে কি সব প্রতিশ্রুতিই টাইম-বাউন্ড!


(২)

আজ গোলুর কথাটা খুব মনে পড়ছে।আদর করে সবাই গোলু বলে ডাকলেও ওর ভালো নাম ছিলো শান্তা....অরুষাগ্নির দেওয়া এই নামটিই অ্যাডমিশন টিকিটে ব্যবহৃত হতো। বিগত ছ'মাস ধরে যাকে না দেখে একদিনও থাকতে পারতো না ও...সেও চোখের আড়াল হয়েছে!

কয়েকদিন আগেই অন্নপ্রাশনের পর ওকে বিদায় জানিয়েছেন হস্পিটাল কর্তৃপক্ষ । ছ'মাসের বেশি কোনো illegitimate child-কে রাখার নিয়ম নেই যে এখানে! 'এক্সক্লুসিভ ব্রেস্ট ফিডিং' এর জন্য ছ'মাস এ ধরনের বাচ্চাকে দিদিমণিদের তত্ত্বাবধানে হস্পিটালের SNCU-তে রাখা হয়...তারপর একটা বিশেষ দিন দেখে কোনো হোমে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ওয়ার্ডে এরকম অনেক বাচ্চা থাকলেও গোলুর প্রতি ওর আলাদা একটা টান ছিল। ও যেদিন এই হস্পিটালে জয়েন করেছিলো, সেদিন গোলুরও আগমন ঘটেছিল এখানে। আদিবাসী রমণীরা নাকি জঙ্গলে কাঠ কুড়াতে গিয়ে নবজাত শিশুটিকে পেয়েছিল...তারপর তারা ওকে এখানে দিয়ে গিয়েছিল।

যাহোক,এসব নিষ্ঠুর ঘটনা এ যুগের আমদানি নয়...প্রাচীন ভারতের ইতিহাসেও কামোন্মত্ত যুবক-যুবতীর ক্ষণিকের কামনা জাত এমন সন্তানদের অসংখ্য উদাহরণ আছে । শকুন্তলা,কর্ণ, কৃপ,কৃপি,শান্তা,স